রাজ্যের খবর

স্বাধীনতার ৭৯ বছর পর ঘুচল অন্ধকার! তারকেশ্বরের গ্রামে প্রথমবার পৌঁছল বিদ্যুতের আলো

প্রতিশ্রুতি রাখলেন বিধায়ক সন্তু পান! হাসির আলো প্রকল্পের ছোঁয়ায় কাটল দীর্ঘ ৭৯ বছরের বঞ্চনা

রাকেশ চক্রবর্তী, হুগলি: দেশ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর যুগে প্রবেশ করেছে, তখন একবিংশ শতকেও স্বাধীনতার দীর্ঘ ৭৯ বছর পর অন্ধকারেই দিন কাটছিল একটি আস্ত জনপদের। হুগলির তারকেশ্বর বিধানসভা কেন্দ্রের অষ্টরদত্তপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের চকদহ গ্রামের আদিবাসী পাড়ার বাসিন্দাদের সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবশেষে অবসান ঘটল। দীপাবলির ঠিক প্রাক্কালে অবশেষে আলোয় সেজে উঠল চকদহের সেই অবহেলিত আদিবাসী পাড়া। নতুন এই বৈদ্যুতিক আলোয় এখন নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

দীর্ঘ বঞ্চনা ও মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, চকদহের আদিবাসী পাড়ার বহু পরিবার বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎ পরিষেবা থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত ছিলেন। আশপাশের সমস্ত এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও এই পাড়ার বাড়িগুলোতে তা পৌঁছয়নি। এলাকার মানুষের অভিযোগ, কয়েক বছর আগে গ্রামে বৈদ্যুতিক খুঁটি বসানো হলেও বাড়ি পর্যন্ত তার বা সংযোগ না টানায় সেই খুঁটিগুলো কার্যত কোনো কাজেই লাগছিল না।

সন্ধ্যা নামলেই গোটা এলাকা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ডুবে থাকত। গৃহস্থালির সাধারণ কাজকর্ম থেকে শুরু করে খুদে পড়ুয়াদের পড়াশোনা, সব ক্ষেত্রেই চরমে দুর্ভোগ পোহাতে হতো। বাধ্য হয়েই মোমবাতি কিংবা হারিকেনের টিমটিমে আলোয় ভরসা রাখতে হতো কচিকাঁচাদের।

প্রশাসনের উদ্যোগ ও বিধায়কের প্রতিশ্রুতি রক্ষা

ওই এলাকায় প্রায় চারশো আদিবাসী পরিবারের বসবাস রয়েছে। তবে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ওই আদিবাসী পাড়ায় প্রায় ৫০টিরও বেশি পরিবার রয়েছে। ইতিমধ্যেই সেই সমস্ত বাড়িতে নতুন মিটার বক্স বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শুধু তাই নয়, শতাধিক পরিবারকে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আনার জোরদার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বিধায়ক সন্তু পান। বিশেষ করে বিপিএল (BPL) তালিকাভুক্ত দরিদ্র পরিবারগুলিকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পরিষেবা দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

বিধায়ক সন্তু পান জানান, নির্বাচনী প্রচারের সময় গ্রামবাসীরা তাঁর কাছে এই বঞ্চনার কথা তুলে ধরেছিলেন। তখনই তিনি গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও বিষয়টি জানান। এছাড়া অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলিকে রাজ্য সরকারের ‘হাসির আলো’ প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এলাকায় পর্যাপ্ত পানীয় জলের ব্যবস্থার কাজও দ্রুত শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে।

উন্নয়নের বাস্তব চিত্র ও প্রশ্নচিহ্ন

দীপাবলির আগেই ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বলে ওঠায় স্বাভাবিকভাবেই এলাকার সাধারণ মানুষ অত্যন্ত খুশি। তাঁদের কাছে এই বিদ্যুৎ সংযোগ নিছক কোনো সরকারি পরিষেবা নয়, বরং দীর্ঘ ৭৯ বছরের অবহেলা ও বঞ্চনা ঘুচিয়ে আধুনিক সভ্যতার আলোয় পা রাখার এক নতুন সুযোগ।

তবে এই ঘটনার পর থেকেই একটা বড় প্রশ্ন জোরালোভাবে উঠতে শুরু করেছে, স্বাধীনতার এতগুলো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও কেন একটি গ্রামের মানুষকে শুধু আলোর মতো মৌলিক অধিকারের জন্য এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলো? কয়েক বছর আগে খুঁটি বসা সত্ত্বেও কেন এতদিন বাড়ি পর্যন্ত তার পৌঁছাল না? এই বিলম্বের পেছনে প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব ঠিক কোথায় ছিল, তা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক চর্চা। দীপাবলির আলোয় চকদহ আলোকিত হলেও এই ঘটনা ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, প্রকৃত উন্নয়ন কেবল বড় শহর বা ঝকঝকে পরিকাঠামোয় নয়, বরং রাজ্যের প্রতিটি প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায় মৌলিক পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই নিহিত।

Related Articles