এদের তৈরি অস্ত্রে অসুর বধ করেন মা দুর্গা
অশুভ শক্তির প্রতিক মহিষাসুরের সঙ্গে শুভ শক্তির প্রতিক দেবী দুর্গার যুদ্ধ।
সম্বুদ্ধ দত্ত: ‘ওরে যুদ্ধ করে করবি কিরে বল’, তবুও এক সময় যুদ্ধ করতেই হয়। অশুভকে বিনাশ করতে কখনও কখনও যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।
যুদ্ধ আসন্ন অস্ত্রাগারে চরম ব্যস্ততা। ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে নানান অস্ত্র। এ যুদ্ধ এক মহা যুদ্ধ, মহৎ উদ্দেশ্যে যুদ্ধ। অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে শুভ শক্তির বিজয়ের যুদ্ধ। অশুভ শক্তির প্রতিক মহিষাসুরের সঙ্গে শুভ শক্তির প্রতিক দেবী দুর্গার যুদ্ধ।
পুরানে মহিষাসুর সম্পর্কে বেশ কয়েকটি মত প্রচলিত আছে। তার মধ্যে অন্যতম শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত রম্ভসুর নামের এক অসুর কঠোর তপস্যা করে দেবাদিদেব মহাদেবকে সন্তুষ্ট করেন। রম্ভসুরের তপস্যায় তুষ্ট দেবাদিদেব রম্ভকে বর দিতে চাইলে রম্ভ তাঁর কাছে এমন এক সন্তান চাইলেন সেই সন্তান যেন স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল এই ত্রিলোকের অধীশ্বর হয়। দেবাদিদেব রম্ভর বর অনুমোদনও করলেন। এই রম্ভসুর এক দিন এক সুন্দরী যুবতী মহিষকে দেখে যৌন তাড়নায় প্রলুদ্ধ হয়ে তার সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হন। এই সঙ্গমের ফসল হল মহিষাসুর। যার রূপ ছিল মহিষ এবং মানুষের সংমিশ্রণের আকার।
শিবের বরে বলীয়ান রম্ভ পুত্ৰ মহিষাসুরের অত্যাচারে এক সময় স্বর্গ, মর্ত্য পাতাল– ত্রিলোক অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। মহিষাসুর দেবতাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করে স্বর্গ অধিকার করে নিলেন। স্বর্গচ্যুত অসহায় দেবতার দল রাজ্য ফিরে পেতে হাজির হলেন ব্রহ্মার কাছে। ব্রহ্মা জানিয়ে দিলেন একমাত্র কোনও অমিত শক্তির অধিকারিণী নারীশক্তি মহিষাসুরকে বধ করতে পারবে। এমন কথায় দেবতারা মহিষাসুর বধের উদ্দেশ্যে তাঁদের সম্মিলিত শক্তি দিয়ে সৃষ্ঠি করলেন অপরূপা নারী দেবী দুর্গাকে। মহিষাসুর নিধনে দেবকুল দেবী দুর্গাকে তাদের আয়ূধ দিয়ে সাজিয়ে বলীয়ান করে তুললেন। দেবাদিদেব মহাদেব দিলেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দিলেন চক্র, বরুণ দিলেন শঙ্খ, অগ্নি দিলেন শক্তি, বায়ু দিলেন ধনুরবান, দেবরাজ ইন্দ্র দিলেন বজ্র, যম দিলেন দণ্ড, ব্রহ্মা দিলেন রুদ্রাক্ষ এবং কমন্ডুল, মহাকাল দিলেন খড়্গের সঙ্গে ঢাল, শেষনাগ দেবীর হাতে তুলে দিলেন বিষধর সর্প। অপর দিকে অসুরের হাতে রইল ঢাল এবং তরোয়াল।
মর্ত্যে দুর্গার মহিষাসুর বধের এই কাহিনি মূর্তি আকারে পূজা শুরু হয়। মৃৎশিল্পীদের হাতে তৈরি যুদ্ধরত দুর্গা, অসুর থেকে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক এবং গণেশের হাতেও অস্ত্র থাকে। সন্তান-সন্ততি সমেত দুর্গার এমন মূর্তি কিন্তু ভারতে অন্য কোথাও দেখা যায় না।
দেবতাদের এই সমরাস্ত্র সারা বছর ধরে তৈরি করে চলেছে হাওড়া জেলার গুটিনাগড়ি গ্রাম। আক্ষরিক অর্থে এই গ্রামকে দেবতাদের অস্ত্রাগার বলা যেতেই পারে। গুটিনাগড়ির প্রতিটি ঘরেই এখন জোর কদমে চলেছে দেবতাদের প্রতীকী অস্ত্র তৈরির কাজ। অস্ত্র প্রস্তুতকারীরা নাওয়া খাওয়া ভুলে দিন রাত অস্ত্র তৈরি করে চলেছেন। পুজো যত এগিয়ে আসে ব্যস্ততা চরমে ওঠে। গ্রামে পা রাখলেই দূর থেকে কানে ভেসে আসে অস্ত্র তৈরির টুং টাং থেকে ঝনঝন শব্দ।
সাধারণত দুই রঙের অস্ত্র এখানে তৈরি হয়। রুপোলি এবং সোনালি। টিনের পাতলা পাত হল অস্ত্র তৈরির প্রধান উপাদান। প্রতিটি অস্ত্রের জন্য আলাদা আলাদা ছাঁচ রয়েছে। প্রথমে টিনের পাতের ওপর অস্ত্রের ছাপ (ডাইস) রেখে একটা ছোট ধারালো বাটালির সাহায্যে অস্ত্রের আকার ফুটিয়ে তুলতে হয়। এরপর শিল্পীরা নিপুণ ভাবে কাতানের (কাটার) সাহায্যে টিনের পাত কেটে মা দুর্গা থেকে অসুর এবং অন্য দেবতাদের হাতের খাঁড়া, ত্রিশূল, ঢাল, তলোয়ার, শঙ্খ, চক্র, বজ্র, গদা, পদ্ম, সাপ, বীণা এবং দণ্ড থেকে অন্যান্য সব অস্ত্র তৈরি করে।
টিনের পাতের আয়তনের ওপর নির্ভর করে এক একটা টিনের পাতে কত সংখ্যক এবং কী আকারের অস্ত্র তৈরি হবে। কাতানের সাহায্য অস্ত্র একেবারে নিখুঁত ভাবে কারিগররা টিনের পাত কেটে অস্ত্রের আকার ফুটিয়ে তোলেন। তবে টিনের পাত কাটলেই কিন্তু অস্ত্র তৈরি হয় না। একটা বিশেষ পদ্ধতিতে পাতলা লকলকে অস্ত্রগুলিকে বেশ শক্ত এবং সোজা করা হয়। ছোট লোহার ছুঁচালো দণ্ড দিয়ে অস্ত্রকে হালকা করে ভাজ করা হয়। এই পদ্ধতিকে কারিগরদের ভাষায় বলে টানা বা টান দেওয়া। এরপর কারিগরেরা তাদের নিখুঁত হাতে ওই অস্ত্রগুলির ওপর সারিবদ্ধভাবে ছোট ছোট ছিদ্র করে বিভিন্ন নকশা করে। এমন নকশার পর অস্ত্রগুলি দেখতে বেশ সুন্দর হয়ে ওঠে। শেষ পর্যায়ে চলে রঙের কাজ। সাদা, লাল এবং সবুজ রঙের সাহায্য খাঁড়া এবং ঢালের উপর চোখ ফুটিয়ে তোলা হয়। প্রত্যেকটা অস্ত্রের বিভিন্ন অংশে এবং ত্রিশূলের ফলা রঞ্জিত করা হয় লাল রক্তবর্ণে। কারিগর পরিবারের মহিলা এবং কিশোর-কিশোরী প্রায় প্রত্যেকে সদস্য অস্ত্র তৈরির কাজে যুক্ত থাকে।
মহিলারা প্রধানত সুচারু ভাবে তাদের কোমল হাতে অস্ত্রের মধ্যে চোখ আঁকা থেকে অন্যান্য রঙের কাজ করে। এই রঙের কাজ অস্ত্রের সৌন্দর্যকে অন্য মাত্রা এনে দেয়। শেষে চলে অস্ত্রগুলিকে সঠিক ভাবে বাজারজাত প্রক্রিয়া। সারা বছর ধরেই এই গ্রামে অস্ত্র তৈরি হয়। তবে অগ্রায়ণ মাস থেকে শুরু হয়ে যায় চূড়ান্ত তৎপরতা। রথযাত্রার পর থেকে ধীর ধীরে অস্ত্র বিক্রির কাজ চলতে থাকে।
গুটিনাগড়ি গ্রামের তৈরি অস্ত্রের বেশ সুখ্যাতি রয়েছে। এখনকার অস্ত্র কুমোরটুলি, বড়বাজার থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের কুমোরপাড়া এবং দশকর্মার দোকানে পৌঁছে যায়। ইদানিং গুটিনাগড়ির শিল্পীদের তৈরি সুদৃশ্য অস্ত্র আমাদের রাজ্য ছাড়িয়ে বিহার, অসম, ওড়িশার এবং ত্রিপুরা থেকে সুদূর আন্দামানে পৌঁছে যাচ্ছে। একইভাবে বেশ কিছু অস্ত্র আবার বিদেশে পর্যন্ত পাড়ি দিচ্ছে।
হাওড়ার বীরশিবপুর বোয়ালিয়া মোড় থেকে গুটিনাগড়ি অস্ত্র গ্রামের ঢালাই করা রাস্তার দিয়ে যেতে যেতে চোখ জুড়িয়ে যায়। শান্ত জনজীবন, কিশোর-কিশোরীদের অলস চলাফেরা, শিশুদের নিষ্পাপ চাহনি। বিস্তীর্ণ সবুজের প্রান্তর। হেয়ালি প্রকৃতি, কখনও রোদ কখনও বৃষ্টি। আকাশে দস্যি মেঘের দাপাদাপি। বর্ষায় বৃষ্টিভেজা উদ্দীপ্ত সবুজের সমাহার। পুকুরে চোখ মেলে চেয়ে থাকা শালুকের দল। কাছে দূরে কাশফুলের অভ্যর্থনা শারদীয়া উৎসবকে যেন আগাম শুভেচ্ছা জানায়।






