Freedom Fighter: ইনিই সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক গুরু, জানেন কে ছিলেন?
Chittaranjan Das: Legacy of Unity and Sacrifice
নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস:
“এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ,
মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”
ছত্রটুকু বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা। কবি তাঁর কবিতার ভাষায় ব্যক্ত করেছেন চিত্তরঞ্জন দাস শুধু একজন নামি ব্যক্তি নন, তিনি দেশরঞ্জন (Freedom Fighter)। তাঁর সুদূর প্রসারিত বাঙালির বাঙালিয়ানা ব্যক্তিত্ব ছিল কত মহীয়ান। তাঁর পার্থিব নশ্বরদেহ পঞ্চভূতে বিলীন হলেও তিনি রয়েছেন অবিভক্ত বাংলা তথা সারা ভারতবাসীর হৃদয়ে চির অমর। দেশের মানুষ সেদিন তাঁকে যতটুকু চিনেছিলেন, বুঝেছিলেন; আজ একুশ শতকের আধুনিকতার নামে অবক্ষয়ের যুগে নতুন প্রজন্মের প্রয়োজন, তার হাজার গুণ বেশি করে তাঁকে চেনা-জানা ও তাঁর পথনির্দেশ অনুসরণ করা।
[আরও পড়ুন: West Bengal Assembly: “আমি ফরওয়ার্ডে খেলি”- বিধানসভায় কেন বললেন বিশ্বনাথ কারক?]
দেশরঞ্জন চিত্তরঞ্জন দাস জন্মেছিলেন কলকাতার পটলডাঙা স্ট্রিটের এক ভাড়া বাড়িতে। তারিখটা ছিল ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর। পিতা ছিলেন হাইকোর্টের ‘সলিসিটার’ ভুবনমোহন দাস। মাতা নিস্তারিণী দেবী। চিত্তরঞ্জন ছিলেন পিতা-মাতার অষ্টম সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। ছোট থেকেই তিনি ছিলেন মাতৃভক্ত। ভিন্ন চরিত্রের মানুষ। শিক্ষাক্ষেত্র প্রথম জীবনে তিনি ভর্তি হন লন্ডন মিশনারি সোসাইটির ইনস্টিটিউশনে। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে এনট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে স্নাতক হন। তারপর আইসিএস পড়ার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডে পাড়ি দেন। সেখানে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ায় ইনার টেম্পলে ভর্তি হন। ১৮৯৪ সালে ব্যারিস্টার হয়ে চিত্তরঞ্জন দাস দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। নাম নথিভুক্ত করেন কলকাতা হাইকোর্টে ব্যারিস্টার হিসাবে। সংসারের তখন বেহাল দশা, দেউলিয়া ভুবনমোহন দাস। বিবাহ করেন বিক্রমপুরের নওগাঁর বাসিন্দা বরদানাথ হালদারের প্রথম কন্যা বাসন্তীদেবীকে। বিবাহে চিত্তরঞ্জনকে ঈশ্বর বিরোধী, মাতাল নাস্তিক বলে ব্রাহ্মসমাজ কটূক্তি করে (Freedom Fighter)।
চিত্তরঞ্জন প্রথম দুটি আখ্যা পান মালঞ্চ কাব্যগ্রন্থের ঈশ্বর ও বারবিলাসিনী কবিতার জন্য। ঈশ্বরে বিশ্বাসের জন্য তিনি ‘প্রার্থনা’ কবিতাটির উল্লেখ করেন। ‘আমি হিন্দু না’ এই মর্মে লিখিত দিয়ে ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর বিবাহ সম্পন্ন হয়। সেটা তাঁর সারা জীবনের পীড়াদায়ক হয়েছিল। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে কিংস ফোর্ড হত্যা মামলায় অরবিন্দ ঘোষের বিচার শুরু হয়। প্রথমদিকে আইন ব্যবসায় তেমন প্রসার না হলেও অরবিন্দ ঘোষের মামলায় পেশাগত মঞ্চের প্রথম সারিতে আসেন। সওয়াল-জবাবে মূল আসামি অরবিন্দ ঘোষকে নির্দোষ প্রমাণ করে বেকসুর খালাস করেন। বারীন ঘোষ, অবিনাশ গুহ, উল্লাসকর দত্তদের ফাঁসির বদলে হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। পরবর্তী সময়ে বারো বছর জেল খেটে তাঁরা নিঃশর্ত মুক্তি পান। তখন থেকেই তিনি সিআর দাস নামে বেশি পরিচিত (Freedom Fighter)।
ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলায় (১৯১০-১১) বিবাদি পক্ষের হয়ে আইনি লড়েন। দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় আইনেই তিনি ছিলেন পারদর্শী। বিশ শতকের গোড়ার দিকে যখন ভারতবর্ষ তথা বাংলাকে বঞ্চনা ও ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে, রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষীদের উৎকট ঘনঘটায়, রাজনীতির আকাশ ক্রমান্বয়ে কলুষিত হতে থাকে, তখন তিনি স্বেচ্ছায় রাজনীতিতে অবতীর্ণ হন। আন্দোলনের পথ ও পন্থা নিয়ে নরম ও চরমপন্থীদের মধ্যে চলে মতপার্থক্য। নরমপন্থীদের মত বিনিময়, আলাপ-আলোচনায় আন্দোলন; অর্থাৎ তোষামোদ করে স্বাধীনতা অর্জন। অন্যরা মনে করেন কাপুরুষতা। চরমপন্থীদের মতে, ভিক্ষায় দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়া অসম্ভব।
তিনি চরমপন্থী মতে গড়ে উঠা যুগান্তর দল, অনুশীলন সমিতির মতো বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। এসএন ব্যানার্জি, বিসি পাল ও অরবিন্দ ঘোষদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্রিটিশ শক্তির ধর্মীয় বিভাজন নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) আন্দলেনের বিস্তৃতি ঘটাতে এগিয়ে আসেন। তিনি চান যে কোনও মূল্যে আপসহীন পূর্ণ স্বাধীনতা। অত্যাচার, বঞ্চনা থেকে স্বাধীনতা। তাই বঙ্গভঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামে বয়কট আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তখন দেশের স্বাধীনতাকামী যুবক-যুবতীরা সশস্ত্র সংগ্রামী দলে ঝুঁকে পড়ে। তখন স্বদেশি পণ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে চতুর্দিকে। অন্যদিকে বয়কট আন্দোলন। নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিপিন চন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ, ভগ্নী নিবেদিতা, বারিন ঘোষ ও ভুপেন্দ্রনাথ দত্তরা।
ই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দাদা সুবোধচন্দ্র মল্লিকের আন্তরিক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ। যার অন্তরালে গড়ে উঠে মানিকতলায় বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউশন। শিক্ষা প্রসারের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠান ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে শক্তি জোগায়। গোপনে এখেনেই তৈরি হতো যাবতীয় প্রয়োজনীয় হাতে ছোড়া বোমা। পাঠানো হতো অনুশীলন দল ও যুগান্তর দলের মতো বিপ্লবী সংগঠনের হাতে। পরিণত হয় বোমা-বারুদের কারখানায়। কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী দলের আবেদন নিবেদনের সমান্তরাল দুরুত্বে তৈরি হয়েছিল যার কেন্দ্র পাঞ্জাব ও বাংলা। দুরুত্বের রাজনীতিতে অতি জনপ্রিয় নেতা হিসেবে নিজের ব্যক্তিত্বের মহিমায় সামনে আসেন চিত্তরঞ্জন দাস। ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরে রাজনীতির ভাষা বেছে নেন মাতৃভাষা বাংলাকে।
ব্রিটিশের পুলিশ ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিতে হিন্দু-মুসলমানদের বিভেদ সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হলে চিত্তরঞ্জন প্রতিরোধে জোর দেন, হিন্দু-মুসলমান ঐক্যবদ্ধ করতে। কিন্তু তার আগেই হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিস্তর ফাটল ধরে। মুসলিমলিগ ও হিন্দু মহাসভার মতো সংগঠনগুলি বেশ সক্রিয় হয়। গান্ধিজি তা আন্দাজ করেই অসহযোগ আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলন একসঙ্গে যুক্ত করতে অসমর্থ হলে পরিস্থিতি জটিল হয়। তখন চিত্তরঞ্জন কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরে স্বরাজ নামে একটি মঞ্চ গড়েন। পরবর্তী সময়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হওয়ায় কংগ্রেসের প্রতিকূলে যায়। চিত্তরঞ্জনের মতে মুসলিমরা বাঙালার জনগণের অবিছেদ্য অংশ। তাদের পেছনে রেখে মহৎ কাজ সাধিত হওয়া অসম্ভব। মুসলিমলিগ ও হিন্দু মহাসভা স্বাধীনতা আন্দোলনে সংগ্রামের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। তাই তিনি দুই সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করতে বেঙ্গল প্যাক্ট নামে একটি চুক্তি সম্পন্ন করেন। মুসলিম তোষণের অভিযোগে হিন্দু উচ্চবর্ণের একটি অংশ অমান্য করে। চিত্তরঞ্জন যুক্তি দেখান হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে না লড়লে আমাদের স্বরাজের দাবি কখনও বাস্তবে রূপায়িত হবে না (Freedom Fighter)।
কংগ্রেসের ভিতরে থেকেই সুভাষচন্দ্র বসু, জেএন সেনগুপ্ত, অনিলবরণ রায়, বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ও প্রতাপ চন্দ্র সামন্তরা একবাক্যে সমর্থন করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজ হাতে গড়া বেঙ্গল প্যাক্ট দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের হয় ধ্যান-জ্ঞান। তার মধ্যে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ভোটে জিতে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। চিত্তরঞ্জন দাস অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ ও নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য তৎপর হন। বিধবা বিবাহ, অসবর্ণ বিবাহ তাঁর মস্তিষ্ক প্রসূত। ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ পরিবারে নিজের মেয়েদের বিবাহ দেন। রাজনীতিতে প্রবেশের পর নিজ পেশা, আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য বর্জন করতে তিনি দ্বিধা করেননি। তখনকার দিনে আইন ব্যবসায় মাসে রোজগার হতো পঞ্চাশ হাজার টাকা (Freedom Fighter)।
বন্ধু-বান্ধব আত্মীয় স্বজনের বাধা দানে চিত্তরঞ্জন যখন মানসিক দ্বন্দ্বে মর্মাহত, তখন স্ত্রী বাসন্তীদেবী এসে জানান অর্থই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে আমি মনে করি না। তোমার সংকল্পে আমি পাশে আছি। দেশের মঙ্গলে সর্বস্ব ত্যাগের মাহাত্ম্যে তিনিই সেদিন হয়ে ওঠেন প্রকৃত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। দান করেন নিজের বাস্তুভিটাও। এমনকী সাধের বইয়ের আলমারিটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে দিয়ে তাঁর প্রার্থনা পূর্ণ করেন (Freedom Fighter)।
FB POST: https://www.facebook.com/share/p/16RxMx33UR/
কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র হওয়ার পরের বছর ১৯২৫ সালের ১৬ জুন মাত্র ৫৫ বছর বয়সে দেশরঞ্জন-দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস তাঁর চির সাধের বাংলা মায়ের তথা আপামর ভারতবাসীকে কাঁদিয়ে দার্জিলিং শহরে কয়েকদিনের জ্বর ভোগ করে চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হন। ছিলেন সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক গুরু। সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে বহু বিপ্লবী নেতা চোখের জলে বুক ভাসিয়ে বলেন আমরা দ্বিতীয়বার পিতৃহারা হলাম। বড় আফসোসের কথা। তাঁর সাধ ও স্বপ্নের বেঙ্গল প্যাক্ট বাস্তবে রূপায়িত না হওয়ায় ভারতবর্ষ তথা বাংলার রাজনীতিতে আসে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। যার দহনে দগ্ধ আপামর বাংলা তথা সমগ্র ভারতবাসী। তার রাজনীতির শিষ্য সুভাষচন্দ্রকে বহিষ্কৃত হতে হয়। আজ রয়েছে চিত্তরঞ্জন আভিনিউ, চিত্তরঞ্জন সেবাসদন, নেই তাঁর জনপ্রিয় আদর্শ। যে আদর্শ প্রতিফলিত হলে ভারতবর্ষের মানচিত্র পাল্টে যেত। মানুষ পেত নতুন এক অখণ্ড স্বাধীন ভারতবর্ষ (Freedom Fighter)।






