অফবিট

James Augustus Hicky: কোনও বাঙালি নয়, কোনও ভারতীয় নয়, বঙ্গে প্রথম খবরের কাগজ চালু করেন এক বিদেশি

তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা -'বেঙ্গল গেজেট্' ই হল ভারতবর্ষের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র।

বিশ্বজিত ঘোষ: ভারতীয় সংবাদপত্রের জনক কোনো সংস্কৃত বেদজ্ঞ পুরোহিত মশায় নন। আপাদমস্তক একজন দেশ বহির্ভূত-একজন ইউরোপিয়ান। আইরিশ বাসিন্দা-জেমস্ অগাস্টাস হিকি। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা -‘বেঙ্গল গেজেট্’ ই হল ভারতবর্ষের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র। এবং তা স্বয়ং কলকাতাতেই ১৭৮০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। জেমস অগাস্টাস হিকি জাতিতে একজন আইরিশ খৃষ্টান ছিলেন। তাঁর পত্রিকার নাম ছিল ‘বেঙ্গল গেজেট’ তথা ‘ক্যালকাটা জেনারেল অ্যাডভার্টাইজার’। পত্রিকাটি ট্যাবলয়েড মাপের ছিল। ইংরাজী প্রবাসে আছে pen is mighter than sword.সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে এই কথাটির বেশ সাযুজ্যতা প্রকাশ পায়। কারণ সংবাদপত্রই একটা দেশের, জাতির, রাষ্ট্রের এবং সর্বোপরি একটা সময়ের ইতিহাস বা চলমান জীবনের ছবি তুলে ধরতে পারে। এই সংবাদপত্রে শুধু নীরস সরকারি কাজের বর্ণনা বা সরকারি তাঁবেদারি নয়, সরকারি কাজের হালহকিকত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে চিরুনি তল্লাশি, সাহিত্য-সংস্কৃতির মান এবং সর্বোপরি সমাজের দর্পণ হয়ে উঠতে পারে। তাই যুগে যুগে দেশে দেশে শাসক তথা রাষ্ট্র যন্ত্র স্বাধীন সংবাদপত্রের টুঁটি বারবার চেপে ধরেছে। কারণ সেই সংবাদপত্র থাকলে সরকার এবং তার বিভিন্ন যন্ত্র স্বরূপ যে মূল স্তম্ভ গুলো আছে সেগুলোর গোপন অভিসন্ধি, দুর্নীতি, অপকৌশল, বিভিন্ন সরকারি প্যাঁচপয়জার প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। এবং তার দরুন জনগণ সচেতন হয়ে জনরোষ বা সরকারের বিপক্ষে বিদ্রোহের সূচনা করতে পারে।সংবাদপত্র সরকারের পশ্চাৎদ্বার নীতিকে যদি তুলে ধরে, তাহলে জনমানসে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। এবং ধীরে ধীরে সেই অসন্তোষ বিদ্রোহের আকার ধারণ করতে পারে। তাই এই অধিনিয়ম। হিকির ক্ষেত্রেও এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি (James Augustus Hicky)।

আরও পড়ুন: Kargil Victory: কার্গিল বিজয় দিবসে দেশবাসীকে বিশেষ বার্তা অভিষেকের

১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের পরেই বাণিজ্য করতে আসা ইংরেজদের আধিপত্য ধীরে ধীরে প্রশাসনের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে থাকে। এবং এই সুচতুর ইংরেজ জাতি পলাশির যুদ্ধের পর ভারতে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা কায়েম করলে তার সঙ্গে সঙ্গে হোটেল, কফি হাউস, পানশালা, রঙ্গ মঞ্চ, বিনোদন এবং ধর্মের প্রসারের জন্য গীর্জার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এই ইংরেজদের ঘাটতি ছিল শুধুমাত্র সংবাদপত্র সূচনার। যার কারণ আগেই উল্লেখ করেছি। এমতাবস্থায় ১৭৬৬ সালে ইংরেজ কোম্পানির একজন সাধারণ কর্মচারী উইলিয়াম বোল্ট্স সংবাদপত্র প্রকাশ করার মনোভাব প্রকাশ করলে, তৎকালীন ভাইসরয় ওয়ারেন হেস্টিংস তা অনুমোদন করেননি। এবং এই ব্যাপার যাতে পুনরায় উদ্ভাসিত না হয় সেজন্য ওই কর্মচারীকে ইংল্যান্ডে ফেরানোর ব্যবস্থা করেন। পরে দীর্ঘ সময় ধরে এই ইংরেজদের কেউই সংবাদপত্র প্রকাশে আগ্রহ দেখাতে সাহস করেনি। পরে প্রায় দুদশকের কাছাকাছি সময়ে এসে হিকি প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। তবে তিনি প্রথমেই সংবাদপত্র প্রকাশ করার ব্যপারে উৎসাহী ছিলেন না। তিনি অর্থ উপার্জনের জন্য নানা কাজ করেছেন। কিন্তু ভাগ্য বিপর্যয়পূর্ণ জীবনে কোন কাজেই আর্থিক স্বচ্ছ্বলতা লাভ করতে পারেননি। প্রথম দিকে তিনি অভিজ্ঞ নিয়মিত প্র্যাকটিস করা ডাক্তারের মতো ডাক্তারি করতেন। পরবর্তীকালে আইন সম্পর্কে অবহিত হয়ে আদালতে অ্যাটর্নির কাজ পর্যন্ত করেন। পরবর্তীতে তিনি ছাপাখানার কাজ শিখে সেই কাজে শিক্ষানবিসি করেছেন। এই হিকি সাহেব কলকাতায় এসে ঋণ করে জাহাজের ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করেন এবং জাহাজ ডুবে গিয়ে প্রচুর দেনার দায়ে জর্জরিত হন। এর পরেই তিনি সংবাদপত্র প্রকাশ করে সাংবাদিকতার চেষ্টা করেন। এখানেই আমরা পেলাম ভারতের সাংবাদিকতার প্রথম প্রাণপুরুষকে (James Augustus Hicky)।

Truth of Bengal fb page: https://www.facebook.com/share/1ADtx3ZZeU/

জেমস্ অগাস্টাস হিকি একজন আইরিশ যুবক ছিলেন। ভাগ্য অন্বেষণের জন্য তিনি স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পরিজন নিয়ে কলকাতায় আসেন। তিনি জীবনে বহু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যধিক আত্মবিশ্বাসী, স্বাধীনচেতা, দৃঢ় প্রত্যয়ী একজন মানুষ। তাঁর আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনচেতা মনোভাব তাঁর সাংবাদিকতায় প্রতিফলিত হয়। তবে তিনি পেশাদার সাংবাদিক ছিলেন না। এই হিকি সাহেবের জীবনের কিছু ঘটনা আমরা জানলে বুঝতে পারব যে একটা মানুষ কতবার ভাগ্য বিপর্যয়ে ভাঙার পরেও আবার নতুন উদ্যমে কাজ করতে পারেন। প্রথম দিকে জাহাজের ব্যবসা করতে গিয়ে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু জাহাজ ডুবে লোকসান হলে তিনি ঋণের দায়ে কারাবরণ করেন। পরবর্তীকালে ছাপার কাজ করে নানারকম বরাতের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করেও বরাতের টাকা সময়মতো আদায় করতে পারেননি। এবং তার দরুন নানা মামলা মোকর্দমায় বারবার গ্রেফতার হয়েছেন। এবং তা কখনো স্বয়ং তৎকালীন সরকার বা প্রশাসনের সঙ্গেই সম্মুখে বিরোধ ঘটেছে। এই অসহযোগিতা এবং ভাগ্য বিপর্যয়ের কারণে তিনি মনোভাব প্রকাশ করেন একটি সংবাদপত্র প্রকাশের। স্বপ্ন দেখেন সাংবাদিক হওয়ার। হিকির দীর্ঘ জীবনের খুঁটিনাটি স্বল্প পরিসরে বলা সম্ভব নয়। তবে তিনি সাংবাদিকতার মাধ্যমে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠানের ভিত নড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাই তাঁর সংবাদপত্র সমস্ত সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। তিনি সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজ এবং রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তিনি নিজের পয়সা খরচ করে তাঁর পত্রিকার জন্য পেশাদার সাংবাদিক নিয়োগ করেন। তিনি কখনোই অন্যায়, বেনিয়ম, বা সরকারি তাঁবেদারি করে সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনের জন্য টাকা জোগাড় করেননি। তিনি সাংবাদিকতা এবং সংবাদপত্রকে অন্যায়ের প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসাবে তুলে ধরতে চেয়েছেন (James Augustus Hicky)।

হিকি তাঁর সংবাদপত্রে সাহিত্য এবং শ্রুতিমধুর সাংবাদিক ভাষার প্রচলন করেন। তাঁর নিজস্ব সাহিত্যের রীতিও সংবাদপত্রের পাতায় উঠে এসেছে। হিকি ভারতীয় সাংবাদিকতার নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন। তাঁর ঋজু মেরুদন্ড নির্ভর সাংবাদিকতা এবং রাষ্ট্রের অনাচারের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভ, প্রক্ষোভ সাংবাদিকতার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তাঁর সাংবাদিকতার মধ্যে দিয়েই ভারতীয় সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতার জয়যাত্রার সূচনা। তাঁর সাংবাদিকতার ধারা বর্তমান ভারতীয় সাংবাদিকতার আদর্শ হওয়া উচিত।

Related Articles