ভারতের প্রথম মহিলা ডক্টর অফ সায়েন্স বিজ্ঞানসাধিকা অসীমা চট্টোপাধ্যায়, মৃগী রোগের অভিশাপ থেকে ভারতীয়দের মুক্তি দেন
ভারতের ইতিহাসে প্রথম মহিলা ডক্টর অফ সায়েন্স হলেন দেবী সরস্বতীর বরপুত্রী অসীমা চট্টোপাধ্যায়।
Truth Of Bengal: মৃগী রোগ বা এপিলেপ্সির নাম শুনলেই বুক কাঁপত সকলের। এক সময় ভারতে এই রোগের সঠিক চিকিৎসার পথ ছিল রুদ্ধ। রোগীর অসুখ সারাতে তুকতাক, জলপড়ার মতো নানান অবৈজ্ঞানিক ভুল উপায় অবলম্বন করা হত। বিজ্ঞানসাধিকা ডক্টর অসীমা চট্টোপাধ্যায় ভারতীয়দের মৃগী রোগের অভিশাপ থেকে মুক্তির পথ দেখান। ভারতের ইতিহাসে প্রথম মহিলা ডক্টর অফ সায়েন্স হলেন দেবী সরস্বতীর বরপুত্রী অসীমা চট্টোপাধ্যায়। ভারতের বিজ্ঞান সাধনার ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। ডক্টর অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে ভারতের প্রথম মৃগী রোগ প্রতিরোধকারী ওষুধ তৈরি হয়।
১৯১৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জন্ম অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের। সে সময় মেয়েদের উচ্চ শিক্ষা তো দূরের কথা ভালো করে পড়াশোনাই শেখানো হত না। কিন্তু অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের মনে ছাত্র জীবনের শুরু থেকে ছিল পড়াশোনার প্রতি তীব্র আকাঙ্খা। বাবা ইন্দ্রনারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে বিজ্ঞানের প্রতি তীব্র আকর্ষণ জন্মায় মেয়ে অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের মনে। স্কুলশিক্ষা শেষ করে রসায়নে সাম্মানিক কোর্সে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন মেধাবী অসীমা। সে সময় কোনো মেয়ে রসায়ন নিয়ে উচ্চ শিক্ষার কথা ভাবতই না। সে সময় বিজ্ঞানে স্নাতক স্তরে কোনো ছাত্রীর পক্ষে সহজ ছিল না। তাই উপযুক্ত নম্বর থাকা সত্ত্বেও রসায়নে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা করতে ২ বছর অপেক্ষা করতে হয় অসীমা চট্টোপাধ্যায়কে। কিন্তু পাখির চোখ থেকে সরে আসেননি তিনি।
মেধাবী অসীমার অধ্যাবসায় মুগ্ধ ছিলেন শিক্ষকরা। কখনো ল্যাবরেটরির ক্লাস করতে ভুল হত না অসীমার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪০ সালে রসায়নে স্নাতকোত্তর করার পর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং বিজ্ঞানসাধক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর তত্ত্বাবধানে অসীমা চট্টোপাধ্যায় রসায়নে ডক্টরেট করেন। ১৯৪৪ সালে রচিত হয় এক নয়া ইতিহাস। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম মহিলা ডক্টরেট ডিগ্রি পান অসীমা চট্টোপাধ্যায়। তিনিই ভারতের প্রথম মহিলা ডক্টর অফ সায়েন্স বা ডিএসসি। কোনো ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বার কোনো ভারতীয় মহিলার প্রাপ্ত এই সম্মান।
সে সময় বেশিরভাগ রসায়নবিদ যখন ইনঅর্গানিক বা অজৈবিক পদার্থ নিয়ে গবেষণা চালাতেন তখন একেবারে উদ্ভিদজাত প্রাকৃতিক পদার্থ নিয়ে গবেষণা চালান অসীমা চট্টোপাধ্যায়। বিজ্ঞান ও ভারতের প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রকে নিজের গবেষণার মাধ্যমে মেলান। সে সময় ওষুধ দামি ছিল ও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হত। ভারতে সেভাবে ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা ছিল না। উদ্ভিদজাত প্রাকৃতিক উপাদানের সাহায্যে ম্যালেরিয়া ও মৃগীরোগ প্রতিরোধকারী ফর্মুলা আবিষ্কার করেন ডক্টর অসীমা চট্টোপাধ্যায়।
নিজের জীবনে বিজ্ঞান চর্চা করতে গিয়ে যে বাধা পান সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় মহিলাদের বিজ্ঞান চর্চার পথ সুগম করতে নিরলস প্রচেষ্টা চালান অসীমা চট্টোপাধ্যায়। তিনি লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপিকা হয়ে কাজে যোগ দেন। পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার কাজ শুরু করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপনা করেন। পরে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে ও রাজা বাজার সায়েন্স কলেজে রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হন। তাঁর কাজের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। ডাক আসে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও।
প্রথমে ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন ও পরে ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অনুপ্রেরণায় মৃগী রোগ প্রতিরোধকারী ওষুধ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন অসীমা চট্টোপাধ্যায়।Marsilla minuta নামক গাছের উপাদান থাকে মৃগীরোগের ওষুধ আবিষ্কার করেন যার নাম রাখা হয় Ayush-56। Picrorhiza Kurroa নামক গাছের উপাদান থেকে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধকারী ওষুধ আবিষ্কার করেন। ১৯৬২-১৯৮২ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের খৈরা অধ্যাপক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন অসীমা চট্টোপাধ্যায়। ১৯৭৫ সালে নতুন এক ইতিহাস লেখা হয়। ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসে অসীমা চট্টোপাধ্যায় প্রথম মহিলা জেনারেল প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বিজ্ঞান চর্চা করতে গিয়ে নানান বাধার মুখে পড়েও কখনো দমে যাননি ডক্টর অসীমা চট্টোপাধ্যায়। নিরলস বিজ্ঞান চর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৬০ সালে তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমির ফেলো হন। ১৯৬১ সালে পান শান্তি স্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার। এছাড়াও পেয়েছেন সি ভি রমণ পুরস্কার ও পদ্মভূষণ সম্মান। তিনি রাজ্যসভায় রাষ্ট্রপতি দ্বারা মনোনীত সদস্য হন। বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি স্ত্রী ও মায়ের দায়িত্বও সফল ভাবে পালন করেন অসীমা চট্টোপাধ্যায়। স্বামী ডক্টর বরদানন্দ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিশিষ্ট পদার্থবিদ। তিনি ছিলেন অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের ঐকান্তিক সমর্থক। ২০০৬ সালে প্রয়াত হন বিজ্ঞানসাধিকা অসীমা চট্টোপাধ্যায়। ২০১৭ সালে তাঁর শতবর্ষে গুগল ডুডলের মাধ্যমে তাঁকে সম্মান জানায়।


