কলকাতা

‘২১ জুলাই’ রাহুলকে সামনে রেখে বাংলায় নতুন অঙ্ক প্রদেশ কংগ্রেসের

আবহেই সম্পূর্ণ নিজস্ব রণকৌশল নিয়ে বঙ্গে ২১ জুলাইয়ের প্রস্তুতি শুরু করে দিল প্রদেশ কংগ্রেস।

Truth of Bengal: ভোটের ফলাফলের বিপর্যয় এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল—এই দুই জোড়া ধাক্কায় তীব্র সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সোনিয়া গান্ধীর একান্ত বৈঠক রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে। এর পাশাপাশি, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও সম্প্রতি দিল্লির ১০ জনপথ-এ গিয়ে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করে এসেছেন। এই জোড়া বৈঠকের পর রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে যে, রাজনৈতিক অস্তিত্ব টেকাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি শেষ পর্যন্ত তাঁর দলকে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গেই মিশিয়ে দেবেন? তবে এই জল্পনার আবহেই সম্পূর্ণ নিজস্ব রণকৌশল নিয়ে বঙ্গে ২১ জুলাইয়ের প্রস্তুতি শুরু করে দিল প্রদেশ কংগ্রেস। দীর্ঘ ২৮ বছর পর এবার প্রদেশ কংগ্রেসের সদর দফতর বিধান ভবনের বাইরে এসে ঐতিহাসিক শহিদ মিনারে ২১ জুলাই পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। যুব কংগ্রেসের ডাকা এই শহিদ তর্পণের মঞ্চে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে ইতিমধ্যেই আমন্ত্রণ জানিয়েছে রাজ্য নেতৃত্ব। দিল্লির এআইসিসি নেতৃত্ব ইঙ্গিত দিয়েছে, বর্তমানে রাজ্যে কোনো নির্বাচন না থাকা সত্ত্বেও যদি প্রদেশ কংগ্রেস নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি জাহির করে শহিদ মিনার ভরিয়ে তুলতে পারে, তবে রাহুল গান্ধী এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে কলকাতায় আসতেও পারেন।

স্মর্তব্য যে, শেষবার কলকাতা সফরে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র ভাষায় নিশানা করেছিলেন রাহুল গান্ধী। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, কেন্দ্রের ইডি বা সিবিআই যেভাবে তাঁকে (রাহুলকে) ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা করেছে, হেনস্থা করেছে বা তাঁর ঘরবাড়ি কেড়ে নিয়েছে, তেমন কোনো পদক্ষেপ তো তৃণমূলনেত্রীর বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ ছিল, তৃণমূল সরকারের বেলাগাম দুর্নীতির কারণেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের পথ সুগম হয়েছে। লোকসভা ও বিধানসভা উপনির্বাচনের পর বাংলার রাজনৈতিক চিত্র বদলে যেতেই এখন কার্যত বিধ্বস্ত কালীঘাট তথা তৃণমূল শিবির। এবার সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো তথা যুবনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে সিআইডি-র আইনি টানাপোড়েন তুঙ্গে উঠেছে। এর ওপর তৃণমূলের অন্দরেই লোকসভা ও বিধানসভার অলিন্দে আলাদা আলাদা গোষ্ঠী বা উপদল তৈরি হয়ে গিয়েছে। এই কোন্দলের সুযোগ নিয়ে তৃণমূলের বহু পুরনো এবং বিক্ষুব্ধ প্রথম সারির নেতা পুনরায় কংগ্রেসে ফেরার জন্য বিধান ভবনের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ শুরু করেছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে খবর।

তবে এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে প্রদেশ কংগ্রেস এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এক সময় তৃণমূল কংগ্রেস যেভাবে ২১ জুলাইয়ের শহিদ মঞ্চকে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য দলবদলের বা ‘যোগদান মঞ্চ’ হিসেবে ব্যবহার করত, কংগ্রেস এবার সেই পথে হাঁটবে না। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার স্পষ্ট জানিয়েছেন, “২১ জুলাই যুব কংগ্রেসের ডাকে যে শহিদ তর্পণ কর্মসূচি হতে চলেছে, রাজনৈতিকভাবে তার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে এই শহিদ তর্পণ করব এবং এআইসিসির সর্বোচ্চ নেতৃত্বকেও এখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সারা রাজ্যের কংগ্রেস কর্মীরা ওই দিন একজোট হয়ে শহিদ মিনারে উপস্থিত থাকবেন। তবে আমাদের এই পবিত্র মঞ্চ কোনোভাবেই অন্য দল থেকে আসা নেতাদের ‘যোগদান মঞ্চ’ হবে না।” শুভঙ্কর বাবু আরও জানান যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিজেপির বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ লড়াইয়ে শামিল হতে চাইলে যে কেউ নিঃসংকোচে কংগ্রেসে আসতে পারেন, তাঁর জন্য দরজা খোলা রয়েছে। তবে সেই যোগদান পর্ব ২১ জুলাইয়ের আগেও হতে পারে কিংবা পরেও হতে পারে, কিন্তু শহিদদের শ্রদ্ধা জানানোর পবিত্র মঞ্চে কোনো চমক দেওয়া হবে না।

এদিকে, রবিবার এই ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচির প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে আয়োজিত একটি রক্তদান শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। সেখান থেকে ফেরার পথে শ্যামবাজারে একটি জরুরি কাজ সেরে, এক কর্মীর সঙ্গে চা-টোস্ট খেয়ে গল্প করতে করতে আচমকাই একটি সাধারণ সরকারি বাসে উঠে পড়েন তিনি। প্রদেশ সভাপতির মতো একটি হেভিওয়েট পদে থেকে এবং নিজস্ব গাড়ি থাকা সত্ত্বেও শুভঙ্কর বাবুর এভাবে আচমকা বাসে উঠে পড়া দেখে সঙ্গে থাকা কর্মীরা রীতিমতো হকচকিয়ে যান। বাসে যাতায়াত করার সময়ে তাঁর একটি ছবি তোলেন দলের মুখপাত্র সুমন রায়চৌধুরী, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় আসতেই বেশ চর্চা শুরু হয়। পরে জানা যায়, রবিবার ছুটির দিন হওয়ায় নিজের দুই ব্যক্তিগত চালককেই ছুটি দিয়ে দিয়েছিলেন শুভঙ্কর বাবু, আর সেই কারণেই অত্যন্ত সাধারণ মানুষের মতো বাসে চেপে গন্তব্যে রওনা দেন। এই ঘটনার পর দলের নীচুতলার কর্মীরা শুভঙ্কর সরকারের এই অতি সাধারণ এবং মাটির কাছাকাছি জীবনযাত্রার ভূয়সী প্রশংসা করছেন।

Related Articles