Shyambazar: কলকাতার বুকে ‘নবীনতম প্রাচীন’! শ্যামবাজারের জন্ম কাহিনি
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসা করতে প্রথম জাহাজ নিয়ে তারা পৌঁছেছিল সুন্দরবন লাগোয়া এক প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায়।
শ্রাবণী মিত্র, কলকাতা: কলকাতার ইতিহাস বহু প্রাচীন। তবে বাংলার যেসব প্রাচীন এলাকাগুলি রয়েছে তার মধ্যে কলকাতা প্রাচীনতত্ত্বের দিক দিয়ে অনেকটাই নবীন। সেই তুলনায় মুর্শিদাবাদ, নবদ্বীপ, কৃষ্ণনগর, শান্তিপুর, ভাটপাড়া,নৈহাটি, বর্ধমান, সপ্তগ্রাম, মালদা, বিষ্ণুপুর অনেক প্রাচীনত্ত্বের নিদর্শন রাখে। কলকাতার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ইংরেজ নীলকরদের ভারতে আগমন থেকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসা করতে প্রথম জাহাজ নিয়ে তারা পৌঁছেছিল সুন্দরবন লাগোয়া এক প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায়। একেবারেই জঙ্গল ও আলো আঁধারি ঘেরা এক গ্রাম। চারিদিকে শস্যের খেত, জলাভূমি, গ্রামীণ মেঠো রাস্তা। দূরে দূরে মাটির ঘর।গোবিন্দপুর, সুতানুটি ও কলকাতা – এই তিন গ্রামকে নিয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের ব্যাপ্তি বাড়াতে থাকেন ইংরেজ বণিকরা। ধীরে ধীরে নিজেদের বিস্তার ঘটাতে শুরু করেন। সেই সময় বঙ্গদেশের রাজধানী মুর্শিদাবাদ। ব্যবসা ও এলাকা বাড়াতে গিয়ে ইংরেজদের সঙ্গে মুর্শিদাবাদে নবাবের বিরোধ শুরু হয়। নবাবের অনুমতি না নিয়ে ইংরেজরা কলকাতায় দুর্গ তৈরি করে। এই দুর্গ ধ্বংস করতে মুর্শিদাবাদ থেকে বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে কলকাতায় পৌঁছান নবাব। বিরোধ চরমে পৌঁছায় (Shyambazar)।
এদিকে অজ পাড়া-গাঁ কলকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুর ইংরেজ বণিকদের দাপাদাপিতে পরিচিতি পেতে থাকে বঙ্গে। বহু ধনী পরিবার কলকাতায় বসতি স্থাপন শুরু করেন। ধীরে ধীরে প্রচার ঘটতে থাকে এই তিন গ্রামের। সেই সময় বঙ্গের প্রাচীন ও উন্নত শহরগুলির ধারে কাছে না থাকলেও এই তিন গ্রামের পরিচিতি বাড়তে থাকে। ইংরেজরা এই তিন গ্রামকে একত্রেই নাম দেয় কলকাতা। এই কলকাতা নামকরণ নিয়ে অনেক ইতিহাস রয়েছে। তবে আজকের এই নিবন্ধে আমরা কলকাতার একটা অংশ শ্যামবাজারকে নিয়ে আলোচনা করব। ব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতির জটিল অংকে প্রবেশ করে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সেই অংকে স্থানীয় জমিদারদের সমর্থন আদায় করে নেয়। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদে নবাবদের সঙ্গে যেসব জমিদারদের বিরুদ্ধে সেই সময় চরমে ছিল সেইসব জমিদারদের সঙ্গে। ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধে পর্যন্ত জড়িয়ে পড়ে মুর্শিদাবাদের নবাব। পরাজিত হতে হয় নবাবকে। কলকাতা ছাড়িয়ে গোটা বঙ্গ দেশে ইংরেজ আধিপত্য ছড়িয়ে পড়ে। শুধু বাংলা নয়, একটা সময় গোটা দেশে ইংরেজ আধিপত্য কায়েম হয়। ভারতের শাসনভাগ সরাসরি ব্রিটেন থেকে পরিচালিত হতে থাকে। সেই সময় ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা।
এই কলকাতার মধ্যে শ্যামবাজার ও শ্যামপুকুর নামক দুইটি পল্লী বহু প্রাচীন। ১৭৪৯ খ্রীষ্টাব্দের গভর্নমেন্টের কাগজপত্রে শ্যামবাজার নামক গ্রামের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানা যায়, সেই সময় কলকাতার উত্তরে শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায় নামে এক জমিদার বসবাস করতেন। ওই এলাকায় একটা বড় বাজার তৈরি করেছিলেন তিনি। তার নামে এলাকার নামকরণ হয়ে যায় শ্যামবাজার। তার কিছু দূরে একটি বড় পুকুর খনন করেছিলেন এই জমিদার। ওই এলাকাটির নামকরণ হয়ে যাই শ্যামপুকুর। কোম্পানির খাতায় যে বিরাট বাজারের উল্লেখ আছে, তার মালিকও ছিলেন তিনি। লোকমুখে সেই শ্যামাচরণবাবুর বাজার হয়ে ওঠে শ্যামবাজার। এই এলাকা দুটি ঠিক কত পুরনো, তার কোনো হদিশ পাওয়া যায় না। ইভান কটনের লেখা ‘ক্যালকাটা ওল্ড অ্যান্ড নিউ’ বইতে শ্যামবাজারের নামকরণ নিয়ে অন্য এক মত। সেই মত অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, পলাশির যুদ্ধের কিছু আগে কলকাতায় বেশ কিছু বাঙালি জমিয়ে ব্যবসা ফেঁদে বসেছিলেন। তাঁদেরই একজন শোভারাম বসাক। শোভারামের বাড়ির কুলদেবতা ছিলেন শ্যাম রাই বা শ্যামচাঁদ। আরাধ্য দেবতার প্রতি শ্রদ্ধাবশেই তিনি এলাকার নাম রেখেছিলেন শ্যামবাজার। দেবতার নিত্যপূজার জলের জন্য পুকুরও খনন করিয়েছিলেন তিনি। আজ সেটাই শ্যামপুকুর নামে পরিচিত (Shyambazar)।
অন্য আরেক মত থেকে উঠে আসে অন্যরকম তথ্য।ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের ব্যবসাকে শক্তিশালী তৎকালীন জমিদারদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন। তাদের অধীনে বেড়ে উঠেছিলেন এক বাঙালি। যিনি তাঁর মেধা, বুদ্ধি এবং বিচক্ষণতা দিয়ে বিপুল প্রতিপত্তি অর্জন করেছিলেন। তাঁর নাম গোবিন্দরাম মিত্র। কলকাতা শহরের জন্মের সময়ে গোবিন্দরাম মিত্র ছিলেন একজন প্রভাবশালী জমিদার এবং ব্যবসায়ী। তিনি ব্রিটিশদের সঙ্গে ব্যবসা করে নিজের সম্পত্তি বাড়াতে থাকেন। ধীরে ধীরে তিনি কলকাতার অন্যতম ধনী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। তাঁর খ্যাতি এতটাই বেশি ছিল যে, স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘ব্ল্যাক জমিদার’ বা ‘নেটিভ জমিদার’ নামে পরিচিত ছিলেন। গোবিন্দরাম মিত্রের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত বিলাসবহুল। তিনি উত্তর কলকাতায় একটি সুবিশাল এবং দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন, যা সেই সময়ের ইউরোপীয়দেরও চোখ ধাঁধিয়ে দিত। তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত ছিলেন। জনশ্রুতি, তিনি তাঁর নিজের বাড়িতেই কৃষ্ণকে উৎসর্গ করে একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। তিনি এই মন্দির তৈরিতে কোনও কার্পণ্যও করেননি। এই মন্দিরে তিনি শ্রীকৃষ্ণের একটি মূর্তি স্থাপন করেছিলেন। যে বিগ্রহের পরিচিতি ছিল শ্যাম রায় ও শ্যামসুন্দর নামে। নিত্যপুজো থেকে শুরু করে বড় করে উৎসব সবকিছুই করতেন গোবিন্দরাম মিত্র। সেই থেকেই জন্ম হয় শ্যামবাজার নামের।
এরকম নানা রকম মত রয়েছে শ্যামবাজার নামের সঙ্গে। তবে সেদিনের সেই শ্যামবাজার ছিল একেবারেই গ্রামীণ পরিবেশে গড়ে ওঠা। ইংরেজ আমলে রাস্তাঘাট উন্নত হওয়ার পর সেখানে জনবসতি বাড়ে। তবে সেই সময়েও গরুর গাড়ি করে এই শ্যামবাজার থেকে ব্যবসায়ীরা মাল নিয়ে যেতেন। কলকাতার অন্যতম বড় ব্যবসা কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল শ্যামবাজার।






