প্রাথমিকে ৩২ হাজার চাকরি বহালের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ করল সুপ্রিম কোর্ট
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে দ্বারস্থ হয়েছিলেন চাকরি থেকে বঞ্চিত মূল আন্দোলনকারী প্রার্থীরা, আর তাঁদের সেই আবেদনই আজ গ্রহণ করল আদালত।
Truth of Bengal: পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ফের এক নতুন এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মোড় এল। ২০১৪ সালের টেট (TET) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিযুক্ত ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি বহাল রাখার যে রায় কলকাতা হাইকোর্ট দিয়েছিল, তা এবার সর্বোচ্চ আদালতের আতশকাচের তলায়। সোমবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মার ডিভিশন বেঞ্চ এই চাকরি বাতিল সংক্রান্ত মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে এই ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নোটিশ জারি করেছে শীর্ষ আদালত। আগামী আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এই বহুল চর্চিত মামলার পরবর্তী শুনানির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে দ্বারস্থ হয়েছিলেন চাকরি থেকে বঞ্চিত মূল আন্দোলনকারী প্রার্থীরা, আর তাঁদের সেই আবেদনই আজ গ্রহণ করল আদালত।
উল্লেখ্য, বিগত ২০২৩ সালের ১২ মে কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন সিঙ্গল বেঞ্চের বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় এই ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের নিয়োগ বাতিলের ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইন্টারভিউ ও অ্যাপটিটিউড টেস্টে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে প্রশিক্ষণহীন এই শিক্ষকদের চাকরি বাতিলের পাশাপাশি নতুন করে ইন্টারভিউ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ ও রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে গেলে, শীর্ষ আদালত রায়ের ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়ে মামলাটি পুনর্মূল্যায়নের জন্য ফের হাইকোর্টের বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চে ফেরত পাঠায়। এরপর বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চে দীর্ঘ শুনানির পর, গত ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর রায় ঘোষণা করা হয়। সেই রায়ে হাইকোর্ট কর্মরত শিক্ষকদের স্বস্তি দিয়ে জানায় যে, ৩২ হাজার শিক্ষকের সকলেই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত— এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ তদন্তে মেলেনি। মাত্র কয়েকজন ‘অযোগ্য’ প্রার্থীর জন্য এত বিপুল সংখ্যক কর্মরত শিক্ষকের চাকরি কেড়ে নেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। হাইকোর্টের এই রায় ঘিরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন বঞ্চিত প্রার্থীরা।
এই গোটা আইনি লড়াইয়ের উৎস লুকিয়ে রয়েছে আজ থেকে এক দশক আগে, ২০১৪ সালের প্রাথমিক টেট বিজ্ঞপ্তিতে। ২০১৪ সালের ৬ মার্চ প্রাথমিকে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর প্রায় ১৫ লক্ষ চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেছিলেন। দীর্ঘ টালবাহানার পর ২০১৫ সালের নভেম্বরে পরীক্ষায় বসেন প্রায় ১৩ লক্ষ প্রার্থী। এরপর ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ফলপ্রকাশ হলে দেখা যায় প্রায় ১ লক্ষ ২৪ হাজার প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু বিতর্ক দানা বাঁধে তখনই, কারণ কোন প্রার্থী কত নম্বর পেয়ে পাস করেছেন, তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব বা ব্রেক-আপ সে সময় পর্ষদ প্রকাশ করেনি। এর মাঝেই ৪২,৪৪৯টি শূন্যপদের জন্য শুরু হয় ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া। ২০১৭ সাল থেকে ধাপে ধাপে নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়, যার মধ্যে প্রথমে ১১ হাজার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং পরবর্তীতে প্রায় ৩২ হাজার প্রশিক্ষণহীন প্রার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও বঞ্চিত প্রার্থীদের অভিযোগ ছিল অত্যন্ত বিস্ফোরক। তাঁদের দাবি ছিল, নিয়োগের সময় নিয়ম মেনে কোনো মেধা তালিকা বা প্যানেল প্রকাশ করা হয়নি; বরং রাতের অন্ধকারে মোবাইলে ‘এসএমএস’ (SMS) পাঠিয়ে গোপনে পছন্দের প্রার্থীদের চাকরি দেওয়া হয়েছিল। কারা, কীসের ভিত্তিতে চাকরি পেলেন— তা সম্পূর্ণ আড়ালেই রেখে দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ আন্দোলনের পর, আদালতের চাপে ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ প্রথমবারের মতো নম্বরসহ মেধাতালিকা প্রকাশ করলে বঞ্চিতদের সন্দেহে সিলমোহর পড়ে। দেখা যায়, বহু কম নম্বর পাওয়া প্রার্থী চাকরি পেয়েছেন, অথচ যোগ্যরা বাদ পড়েছেন। এর পরেই ২০২৩ সালে প্রিয়াঙ্কা নস্কর-সহ একাধিক বঞ্চিত প্রার্থী কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন। এবার হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের সেই সুরক্ষাকবচের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া বঞ্চিতদের মামলাটি গৃহীত হওয়ায়, ৩২ হাজার কর্মরত শিক্ষকের ভবিষ্যৎ ফের একবার চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।






