“এক ইঞ্চি জমিতেও খনন নয়!” অরাবলী পাহাড় নিয়ে ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিম কোর্টের
সব ধরনের মাইনিং বা খনি সংক্রান্ত কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে
Truth of Bengal: অরাবলী পর্বতমালা সুরক্ষায় এক ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। শনিবার সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আদালত নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্ট বিশদভাবে বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত অরাবলী পাহাড়ের এক ইঞ্চি জমিতেও কোনো ধরনের খননকার্য চালানো যাবে না। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ এই নির্দেশ দিয়ে স্পষ্ট করেছে যে, পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই অরাবলী পর্বতশ্রেণীর একটি নতুন এবং বিজ্ঞানসম্মত সংজ্ঞা জমা না পড়া পর্যন্ত সেখানে সব ধরনের মাইনিং বা খনি সংক্রান্ত কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
পাঁচ মাস আগে সুপ্রিম কোর্টেরই নির্দেশে গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি অরাবলীর এই নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের কাজ করছে। শনিবারের শুনানিপর্বে প্রধান বিচারপতি কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন যে, সমস্ত সমস্যার মূল সূত্রপাত হয়েছে শক্তিশালী খনি লবির স্বার্থের কারণে। তবে আদালতের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট— যেকোনো মূল্যে অরাবলীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। তাই আদালত এই কমিটির দেওয়া নতুন সংজ্ঞায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট অংশেও খননকাজের অনুমতি দেওয়া হবে না। শীর্ষ আদালতের এই কঠোর নির্দেশকে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে সাধুবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন পরিবেশপ্রেমী সংগঠন।
বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল অরাবলী পাহাড়ের ভৌগোলিক সীমানা ও সংজ্ঞা নির্ধারণকে কেন্দ্র করে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক একটি প্রস্তাব দেয় যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নয়, বরং আশেপাশের সমতল এলাকার চেয়ে ১০০ মিটার বা তার বেশি উঁচু ভূখণ্ডকেই কেবল অরাবলী পাহাড় বলে গণ্য করা হবে। গত বছরের ২০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বিআর গবইয়ের বেঞ্চ কেন্দ্রের এই সংজ্ঞায় সিলমোহর দিয়েছিল। তবে এই রায়ের পরই তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের অভিযোগ ছিল, কেন্দ্রের এই শর্তের কারণে এতকাল অরাবলী বলে পরিচিত পর্বতশ্রেণীর প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকাই আইনি সুরক্ষার বাইরে চলে যাবে। ১২ হাজারেরও বেশি পাহাড়ের মধ্যে মাত্র হাজারখানেক পাহাড় এই শর্ত পূরণ করতে পারত, যার ফলে রাজস্থান, গুজরাট, হরিয়ানা এবং দিল্লি জুড়ে বিস্তৃত বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলে নির্বিচারে খনি গ্রাস ও বাণিজ্যিক নির্মাণের রাস্তা খুলে যেত।
এই রায়ের পর রাজস্থান ও হরিয়ানার বিভিন্ন প্রান্তে পরিবেশপ্রেমী এবং স্থানীয় মানুষজন ব্যাপক আন্দোলনে নামেন। এরই মধ্যে একটি রিপোর্টে দাবি করা হয় যে, গত সাত বছরে কেবল রাজস্থানেই ৭১ হাজারেরও বেশি বেআইনি খননের ঘটনা ঘটেছে, যার সিংহভাগই ছিল অরাবলী লাগোয়া জেলাগুলিতে। এই গুরুতর পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি আমলে নেয়। ২৯ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চ অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়ে জানায় যে পূর্ববর্তী রায়টি এখনই কার্যকর হচ্ছে না। একই সঙ্গে অরাবলীর পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখতে আদালত অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্য ভাটি এবং আদালত বান্ধব কে পরমেশ্বরকে কয়েকজন প্রখ্যাত পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীদের নাম সুপারিশ করার নির্দেশ দেয়, যার ভিত্তিতেই এই বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠিত হয়। বর্তমান বেঞ্চ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্টের ওপরই এখন নির্ভর করছে অরাবলীর ভবিষ্যৎ।






