সম্পাদকীয়

Water fight: আসন্ন ‘জলযুদ্ধে’ পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তুতি

ফলে পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পানীয় জলের সংকট আমাদের ভবিষ্যতের জন্য এমন এক ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করবে যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলে সেটা পানীয় জলের জন্যই হবে

ড. রামকৃষ্ণ সেন: শিক্ষক: প্রতিবছর গরম কালে অতিরিক্ত দাবদাহে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে যাই। পরিবেশ দিবসে টবে গাছ লাগিয়ে কয়েকটি ছবি ফেসবুকে দিয়ে বার বার দেখি কটা লাইক কমেন্ট পড়ল। কিন্তু এই অতিরিক্ত উত্তাপ, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি কারণে ভৌমজলস্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। সে বিষয়ে আমরা কোনও সচেতনতামূলক প্রচার চালাই না। নিজেরাও সচেতন নই। ফলে পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পানীয় জলের সংকট আমাদের ভবিষ্যতের জন্য এমন এক ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করবে যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলে সেটা পানীয় জলের জন্যই হবে (Water fight)।

পানীয় জলের জন্য বিশ্বযুদ্ধ? অবাক কাণ্ড!

ছোটবেলা থেকে আমরা জেনে এসেছি পৃথিবীর তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল। তা হলে জল সংকটের প্রশ্ন আসে কী করে? ভূগর্ভ থেকে আকাশ– জল সর্বত্রই আছে। মাটির তলায় আকুইফার, ভূপৃষ্ঠের উপর জলাশয়, সাগর-মহাসাগর, হিমবাহ, হিমশৈল-চারদিকে জলের অফুরন্ত উৎস। কিন্তু এই জলের মাত্র এক শতাংশ আমরা ব্যবহার করতে পারি। পৃথিবীর ৯৭ শতাংশ জল লবণাক্ত, ব্যবহারের অযোগ্য। মানুষের ব্যবহারযোগ্য জলের পরিমাণ মাত্র ২.৫ শতাংশ। এই জলের বেশিরভাগ আছে মেরু অঞ্চলের বরফের মধ্যে। মাটির তলার জল সবটাই ব্যবহার করা সম্ভব নয়। তাই মানুষের ব্যবহারযোগ্য জলের পরিমাণ অতি সামান্য, মাত্র এক শতাংশের কম।

জলচক্রের হিসাব অনুযায়ী জলের জোগানের এই চিত্র খুব একটা পাল্টায় না। যেটা পাল্টায় তা হল প্রথমত– অতি সামান্য ব্যবহারযোগ্য জল মানুষ নষ্ট করে ফেলছে– দূষিত করছে, অপচয় করছে। দ্বিতীয়ত– প্রকৃতির নিজস্ব জলচক্রকে আমরা সম্পূর্ণ হতে দিচ্ছি না। (Water fight)

ভারত সরকারের ২০১৮ সালের নীতি আয়োগের রিপোর্টে আমরা দেখি দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ ভয়াবহ জল সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। জলের এই অভাব তীব্রতম হবে ২২৩০ সাল নাগাদ। এর মধ্যেই দেশের ২০টি বড় মহানগরে ব্যাপক জলসংকট শুরু হয়েছে, চেন্নাই শহরে এক ট্যাঙ্ক জল গরমের সময় বিক্রি হচ্ছে এক গ্রাম সোনার চেয়ে বেশি দামে। সাধারণভাবে এক লিটার পানীয় জলের দাম ২০ টাকা। ভেবে দেখুন, সেই হিসেবে প্রতিদিন আপনার পরিবারের জন্য মোট কতো টাকার পানীয় জল প্রয়োজন। শুধু শহরাঞ্চলে নয়, আমাদের দেশে কৃষিক্ষেত্রে প্রায় ৮৩ শতাংশ জল ব্যবহার করা হয়। ভূগর্ভ থেকে বেহিসেবি জল উত্তোলনের ফলে জলের ভাণ্ডার যে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে তাই-ই নয়, অতিরিক্ত জল তুলে নেওয়ার ফলে প্রায় ৭০ শতাংশ জল সংক্রমিত হয়ে উঠছে (Water fight)।

অতিরিক্ত ও বেহিসেবি ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব উষ্ণায়নেরও প্রকোপ বাড়ছে, ফলে জলস্তরের হ্রাস ঘটছে। খরার প্রকোপে ভূগর্ভস্থ জল খরচ হয়ে যাছে গৃহস্থালির কাজ থেকে সেচের কাজে। আমরা পরিবেশকে দূষিত করছি, কৃষিক্ষেত্রে ভুল কৃষি প্রযুক্তি ও ফসল নির্বাচন করছি, জলাশয় ভরাট করে ফেলছি, আর মাটির তলার জল নির্বিচারে তুলে ফেলছি। এতে মাটি লবণাক্ত হয়ে উঠছে, আর্সেনিক, ফ্লুরাইড সংক্রমণ ঘটছে (Water fight)।

প্রশ্ন আসতে পারে আকাশ থেকে পাতাল, জলের চক্র তো নিরন্তর কাজ করে চলে। তা হলে জলের সংকট হবে কেন? আসলে ব্যবহারযোগ্য জলকে আমরা দূষণ ও অপচয়ের মাধ্যমে নষ্ট করে ফেলছি। আর যে জলচক্রের কথা বলা হচ্ছে, সেই চক্রটি সম্পূর্ণ হতে ন্যূনতম সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের চাহিদা বাড়ার জন্য সেই চক্র আমরা সম্পূর্ণ হতে দিই না।

যত নগরায়ন হচ্ছে তত মানুষের প্রয়োজনে কাটা হছে গাছ, বোজানো হচ্ছে জলাভূমি। ২০১৫ সালে এক আন্তর্জাতিক গবেষক দলের সমীক্ষা থেকে জানা গিয়েছিল, মাথাপিছু গাছের সংখ্যার গড় সারা বিশ্বে যেখানে ৪২২, ভারতের ক্ষেত্রে সেখানে মাত্র ২৪। এমনকী সবচেয়ে জনবহুল দেশ চিনের গড় ১৩০। আবার মোট জমির সাপেক্ষে ভারতের বনভূমির পরিমাণ ও বেশ কম, ২০১৫ সালে মাত্র ২৩.৭৭ শতাংশ, অথচ জাপানে ৬৮.৪৬ শতাংশ। আর জলাশয়? ব্রিটিশরা এক সময় বলতো কলকাতা হল ‘সিটি অফ পন্ডস’। আর এখন কলকাতায় পুকুর দেখতে তেমন পাওয়া যায় না (Water fight)।

পশ্চিমবঙ্গের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে ভৌমজল একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিশেষ করে বোরো ধান ও অন্যান্য শুষ্ক মরসুমের ফসল উৎপাদনে এই জলভাণ্ডার অমূল্য সম্পদ। তবে গত দুই দশকে ভূ-জলের অপরিকল্পিত এবং অতিরিক্ত নিষ্কাশনের ফলে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ভৌমজলের স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ভূ-জল বোর্ড এবং রাজ্য ভূ-জল দফতরের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু ব্লক ভৌমজলের দিক থেকে ‘অতি-নিষ্কাশিত’ অথবা ‘আংশিক সংকটাপন্ন’ তালিকাভুক্ত। দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলির মধ্যে মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও বীরভূম জেলায় ভৌমজলের উপর চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি। উদাহরণস্বরূপ, মুর্শিদাবাদের ভরতপুর-১ ও রঘুনাথগঞ্জ ব্লকে ভূ-জলের স্তর গ্রীষ্মে ১৫ মিটার বা তারও নিচে নেমে যায়। নদিয়ার চাপড়া ও তেহট্ট ব্লকে অত্যধিক পাম্পিং এবং অনিয়ন্ত্রিত গভীর নলকূপ স্থাপনের ফলে ভূ-জলের অবস্থা সংকটজনক হয়ে উঠেছে। উত্তর ২৪ পরগনার হাবরা-১ এবং বসিরহাট-২ ব্লকে লবণাক্ত জলের অনুপ্রবেশও একটি গুরুতর সমস্যা, যা ভূ-জলের গুণগত মানকেও হ্রাস করছে (Water fight)।

[আরও পড়ুনঃ BJP MLA Suspended: শিক্ষক নিয়োগে অচলাবস্থা: সাসপেন্ড বিজেপি বিধায়ক]

পশ্চিমবঙ্গের ৩৪১টি ব্লকের মধ্যে ৫৪টি ব্লক বর্তমানে ভূ-জল সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১০টি ব্লক ‘অতি-নিষ্কাশিত’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। এই শ্রেণিবিভাগ নির্ধারণ করা হয়েছে বার্ষিক ভূ-জল নিষ্কাশন বনাম পুনঃপূরণের হারের ভিত্তিতে। যেমন, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুশমণ্ডি ব্লকে কৃষিকাজে ভূ-জলের ব্যবহার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, অথচ পুনঃপূরণ হার ৬৫ শতাংশ এর নিচে রয়ে গেছে। এই অবস্থার মোকাবিলায় ভূ-জল সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, জলাধার নির্মাণ, খাল ও পুকুর পুনর্খনন এবং কৃষিতে জলের দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। ব্লক ও পঞ্চায়েত স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতিগতভাবে গভীর নলকূপ স্থাপনের উপর বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজন। অতএব, পশ্চিমবঙ্গে ভৌমজলের অবনমন এখন শুধু পরিবেশগত নয়, আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি বড় সমস্যা। ব্লকভিত্তিক বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং সচেতন পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সংকটের মোকাবিলা করা ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই। মুর্শিদাবাদ জেলার রঘুনাথগঞ্জ, ভরতপুর-১. সামসেরগঞ্জ ব্লকগুলিতে গ্রীষ্মকালীন মরসুমে ভূ-জলের স্তর পৌঁছে যাচ্ছে ১৪-১৬ মিটার গভীরে। কৃষিকাজের উপর অত্যধিক নির্ভরতার ফলে ভূ-জলের বার্ষিক নিষ্কাশন হার ৮৫-৯০ শতাংশ ছুঁয়ে গেছে। নদিয়া জেলার তেহট্ট-১, চাপড়া, কৃষ্ণনগর-২ ব্লকগুলিতে অনেক ক্ষেত্রেই গভীর নলকূপের সংখ্যা সরকার অনুমোদিত সীমার বাইরে চলে গেছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত ভূ-জলের প্রায় ৯৫ শতাংশ পুনঃপূরণ হচ্ছে না (Water fight)।

[লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/truthofbengal]

বহু স্থানে পানযোগ্য জলের সংকট দেখা দিচ্ছে। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাবরা-১, বসিরহাট-২, মিনাখাঁ ব্লকগুলিতে ভৌমজলের অবনমন ছাড়াও লবণাক্ততা প্রবেশ বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় অতিরিক্ত ভূ-জল উত্তোলনের ফলে নোনাজল ভূগর্ভে ঢুকে পড়ছে, ফলে পানীয় ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত জল অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। খরাপ্রবণ বীরভূম জেলার সাঁইথিয়া, লাভপুর, নলহাট ব্লকগুলিতে ভূ-জলের পুনঃপূরণ তুলনামূলকভাবে কম। পাথুরে ভূমির কারণে জল মাটির নিচে যাওয়ার হার কম, ফলে চাষের মরসুমে দ্রুত জলস্তর কমে যায়। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট, কুশমণ্ডি ব্লকগুলিতে ভূ-জল ব্যবহারের হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত হওয়ায় ভূ-জলের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা গড়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে মোট ব্লকের সংখ্যা ৩৪১টি, ‘অতি-নিষ্কাশিত’ ব্লক ১০টি (যেখানে ভূ-জল নিষ্কাশন পুনঃপূরণের তুলনায় বেশি), ‘আংশিক সংকটাপন্ন’ ব্লক প্রায় ২০-২৫টি, ভৌমজল নির্ভর কৃষি চাষ ৬৫ শতাংশ (সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী), নলকূপের সংখ্যা আনুমানিক ২০ লক্ষ, যার মধ্যে অনেকগুলির লাইসেন্স নেই।

সম্ভাব্য সমাধান ও সুপারিশ

১. বৃষ্টির জল সংরক্ষণ– প্রতিটি ব্লকে স্কুল, হাট, বাজারে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা।

২. পুকুর-জলাশয় পুনঃখনন– সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে বন্ধ পুকুর, খাল পুনরুজ্জীবন করে ভূ-জলের পুনঃপূরণ বাড়ানো।

৩. ক্ষুদ্রচাষীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি– টানেল চাষ, ড্রিপ ইরিগেশন ইত্যাদির মাধ্যমে জলের দক্ষ ব্যবহার।

৪. ডাটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ– ব্লকস্তরে জলের স্তর পর্যবেক্ষণের জন্য ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

৫. গভীর নলকূপের অনুমোদন নিয়ন্ত্রণ– লাইসেন্সবিহীন টিউবওয়েল বন্ধ করা এবং বিকল্প জল উৎস ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পদক্ষেপ ও ফলাফল

পশ্চিমবঙ্গের ভূ-জল সংকট মোকাবিলায় মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যেগে ও পরিকল্পনায় রাজ্য সরকার ২০১১ সাল থেকে ‘জল ধরো, জল ভরো’ কর্মসূচি চালু করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল ভৌমজলের অবনমন রোধ করা এবং বর্ষার জল সংরক্ষণের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ জলস্তর পুনরুদ্ধার করা। এই কর্মসূচি এখন পশ্চিমবঙ্গের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ ও জলসম্পদ সংরক্ষণ প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। এই প্রকল্পে যে সকল কাজ করা হয়েছে তা হল—

১. পুকুর ও ডোবা খনন ও সংস্কার– রাজ্যজুড়ে প্রায় ২ লক্ষাধিক পুকুর, ডোবা ও জলাশয় খনন বা সংস্কার করা হয়েছে। এর ফলে বর্ষার জল সংরক্ষণ সহজ হয়েছে এবং ওই জল ধীরে ধীরে মাটির নিচে প্রবেশ করে ভূ-জল স্তর পুনরুদ্ধারে সহায়তা করেছে।

২. রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম– সরকারি অফিস, স্কুল, কলেজ, ব্লক অফিস ইত্যাদিতে ছাদের জল সংরক্ষণের জন্য হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা বসানো হয়েছে, যাতে নগর ও গ্রামীণ এলাকায় ভূ-জল পুনঃপূরণ হয়।

৩. ছোট সেচ প্রকল্প ও জলাধার নির্মাণ– অসংখ্য ক্ষুদ্র জলাধার ও মাইক্রো-সেচ প্রকল্প চালু হয়েছে। এতে করে কৃষকরা বৃষ্টির জল নির্ভর সেচ ব্যবস্থায় আগ্রহী হচ্ছেন।

৪. জলবায়ু সহনশীল কৃষিপ্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ– চাষিদের ‘কম জল খরচে চাষ’ পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেমন ড্রিপ ইরিগেশন, মালচিং, পলিচ্যাম্পার ব্যবহার ইত্যাদি।

৫. সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান– স্কুল, গ্রাম পঞ্চায়েত, ব্লক স্তরে পোস্টার, স্ট্রিট থিয়েটার ইত্যাদির মাধ্যমে জল সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীন কিছু উল্লেখযোগ্য কর্মসূচিভিত্তিক ফলাফল আলোচনা করলেই প্রকল্পটির গুরুত্ব বোঝা যাবে। যেমন, বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস ব্লকে সংস্কারকৃত পুকুরের সংখ্যা ৪৮০-র বেশি, নতুন খনন হয়েছে ১২০টি। ফলে গ্রীষ্মে ভূ-জলের স্তর ২ মিটার পর্যন্ত বেড়েছে। পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা-২ ব্লকে পুকুর খনন ও সৌরচালিত জল পাম্প বসানো হয়েছে। চাষের জন্য ভৌমজল নির্ভরতা ২৫ শতাংশ কমেছে। স্থানীয় চাষিরা বোরো ধান ছাড়িয়ে শস্য বৈচিত্রে আগ্রহী হয়েছেন। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাবরা-১ ব্লকে ২৫০টি স্কুল ও পঞ্চায়েত ভবনে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। ভূগর্ভস্থ জলের লবণাক্ততা রোধে গঠন করা হয়েছে কৃত্রিম পুনঃপূরণ ইউনিট। মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ-২ ব্লকে অত্যধিক ভূ-জল ব্যবহারকারী এলাকা হিসেবে নির্বাচিত। জল ধরো জল ভরো প্রকল্পের আওতায় ৫০০টিরও বেশি জলাশয় পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। সেন্ট্রাল গ্রাউন্ড ওয়াটার বোর্ডের রিপোর্টে দেখা গেছে, ভূ-জল স্তর ১.৭ মিটার পর্যন্ত বেড়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা-২ ব্লকে ছোট সেচ প্রকল্প চালু করে চাষে সোলার পাম্প ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। ৩২০টি পুকুর পুনরুদ্ধার ও ৪৫টি নতুন জলাধার তৈরি। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা শিবির আয়োজন করা হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার গঙ্গাসাগর ও কাকদ্বীপ ব্লকে লবণাক্ত অঞ্চলে মিষ্টি জলের রিজার্ভ তৈরি করা হয়েছে। জলাশয় খননের মাধ্যমে বৃষ্টির জল ধরে রাখার ব্যবস্থা সফলভাবে গৃহীত হয়েছে। অনুপ্রবেশকারী নোনা জল ঠেকাতে নির্মাণ হয়েছে ১৮টি চেক ড্যাম। দক্ষিন দিনাজপুর জেলার কুশমণ্ডি ব্লকে জলাধার খননের মাধ্যমে ভূ-জলের উপর নির্ভরতা ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্প গৃহিত হয়েছে। বীরভূমের লাভপুর ব্লকে চাষযোগ্য জমির জলদুষ্প্রাপ্যতা কমাতে জলাশয় পুনরুদ্ধারের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় জল কমিটি গঠন করে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গ্রামবাসীদের। ২০২৩-এর সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই প্রকল্পের সার্বিক সাফল্য হল- ১. মোট ১.৮৫ লক্ষ জলাশয় খনন-সংস্কার, ২. ২৫,০০০-র বেশি সরকারি ভবনে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং, ৩. ১,২০০-র বেশি ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন, ৪. ভূ-জলের স্তরে গড়ে ০.৫-২ মিটার বৃদ্ধি কিছু ব্লকে, ৫. কৃষিক্ষেত্রে ভূ-জলের ব্যবহার হ্রাস ১৩-২৫ শতাংশ পর্যন্ত।

এই প্রকল্পে সমগ্র রাজ্য জুড়ে ২০১১-২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ১.৮ লক্ষ পুকুর সংস্কার ও খনন করা হয়েছে। বহু অঞ্চলে ভূ-জলের স্তর ১-২ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যেমন পূর্ব বর্ধমান, বাঁকুড়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনার কয়েকটি ব্লকে। ইন্ডিয়ান কাউন্সলির অব এগ্রিকালচার রিসার্চ ও সেন্ট্রাল গ্রাউন্ড ওয়াটার বোর্ডের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, জল ধরো জল ভরো কর্মসূচি মাটির নিচে জলের পুনঃপূরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই প্রকল্পের জন্য জাতীয় পুরস্কার-ও পেয়েছে ২০১৯ ও ২০২১ সালে।

তবে এখনও বহু অঞ্চলে অবৈধ গভীর নলকূপ রয়ে গেছে, যেগুলি এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য নস্যাৎ করতে পারে। কিছু অঞ্চলে পুনঃপূরণ কাঠামো নির্মিত হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। জল ধরো জল ভরো প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়াতে স্থানীয় পঞ্চায়েত ও নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আরও জরুরি।

Related Articles