Rath Yatra: বাংলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যের রথযাত্রা ও রথের মেলা
চাকদা ব্লকের যশড়া, নেউলিয়া, পালপাড়ার মহেশ পণ্ডিতের শ্রীপাটের মতই চাঁদুড়িয়া এক নম্বর জিপির মালোপাড়ায় অবস্থিত বসুধা জাহ্নবী শ্রী পাট বৈষ্ণবদের কাছে পরম তীর্থ ক্ষেত্র বলে পরিচিত।
Truth of Bengal: স্বপন কুমার দাস: বাংলায় বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে অন্যতম হল রথের মেলা। যা বাংলার এক প্রাচীন ঐতিহ্য। রথযাত্রা ওড়িশা তথা পুরীর প্রধানতম উৎসব হলেও শ্রীচৈতন্যর প্রভাবে বঙ্গদেশেও রথযাত্রা প্রচলিত হয়। বঙ্গদেশে কে কবে প্রথম রথযাত্রার প্রবর্তন করেন তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুসারে শ্রীরামপুরের মাহেশের রথকেই বাংলার প্রাচীনতম রথযাত্রা বলে ধরে নেওয়া হয়। রথযাত্রা উপলক্ষে অনেক জায়গাতেই বসে রথের মেলা। রথযাত্রা বা রথ দ্বিতীয়া আষাঢ় মাসে আয়োজিত অন্যতম প্রধান হিন্দু উৎসব। ভারতের ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে এই উৎসব বিশেষ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়। এছাড়া ইসকনের ব্যাপক প্রচারের জন্য এখন এটি বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর কৃষ্ণের বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তনের স্মরণে এই উৎসব আয়োজিত হয়ে থাকে। ভারতের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ রথযাত্রা ওড়িশার পুরী শহরের জগন্নাথ মন্দিরের রথযাত্রা। (Rath Yatra)
পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদল, শ্রীরামপুর শহরের মাহেশের রথযাত্রা, গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্র মঠের রথ, কলকাতার রথ এবং বাংলাদেশের ইসকনের রথ ও ধামরাই জগন্নাথ রথ বিশেষ প্রসিদ্ধ। রথযাত্রা দুটি সংস্কৃত শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, তার মধ্যে ‘রথ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অক্ষ, যুদ্ধযান বা কোনওপ্রকার যানবাহন অথবা চাকাযুক্ত ঘোড়ায় টানা হালকা যাত্রিবাহী গাড়ি। এবং যাত্রা হল কোথাও গমন, অতিবাহন বা তীর্থযাত্রা। আষাঢ় মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়াতে শুরু হয় প্রভু জগন্নাথের রথযাত্রা। সঙ্গী থাকেন দাদা বলভদ্র এবং বোন সুভদ্রা। রথযাত্রা বললে প্রথমেই মনে আসে পুরীর জগন্নাথ ধামের নাম। বিশ্ব প্রসিদ্ধ এই স্থানটি বুঝি বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় তীর্থস্থান। এবার গোটা বাংলা জুড়ে নতুন উন্মাদনা দেখা গেল। দিঘাতে জগন্নাথ দেবের মন্দির হয়েছে। এই বছরই প্রথম রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে। (Rath Yatra)
নতুন মন্দির থেকে রথে চড়ে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবী মাসির বাড়ি যাবেন পুরাতন দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে। ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম এবং বাংলার প্রাচীনতম মাহেশের রথযাত্রা আয়োজিত হয় হুগলির শ্রীরামপুরে। ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে এই যাত্রা শুরু হয়। রথযাত্রার সময় মাহেশে গ্রামের স্নানপিড়ি ময়দানে এক মাস ধরে মেলা চলে। শ্রীরামপুরের মাহেশ জগন্নাথ দেবের মূল মন্দির থেকে মাহেশ গুণ্ডিচা মন্দির (মাসির বাড়ি) অবধি জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার ৫০ ফিট উচ্চতার রথটি টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। উল্টোরথের দিন আবার রথটিকে জগন্নাথ মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। কিংবদন্তি অনুসারে, চতুর্দশ শতকে মাহেশের রথযাত্রার সূচনা করে বাঙালি সন্ন্যাসী ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী। সন্ন্যাস গ্রহণের পর স্বয়ং শ্রীচৈতন্য মাহেশের জগন্নাথ মন্দির দর্শন করেন। পরবর্তীকালে ১৭৫৫ সালে কলকাতার নয়নচাঁদ মল্লিক মাহেশে জগন্নাথ দেবের বর্তমান মন্দির তৈরি করেছিলেন। বর্তমান রথটি ১৩০ বছরেরও বেশি পুরনো। রথে রয়েছে মোট ১২টি লোহার চাকা এবং দু’টি তামার ঘোড়া। অতীতে সাধক ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী স্বপ্ন পেয়ে গঙ্গায় ভেসে আসা নিমকাঠ দিয়ে দারুমূর্তি তৈরি করেন। প্রতি বছর রথের আগে বিগ্রহের অঙ্গরাগ হয়ে থাকে। এই রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে আজও বসে মেলা।
[আরও পড়ুনঃ AISATS Controversy: ড্রিমলাইনার দুর্ঘটনার কয়েকদিন পর অফিসে উদযাপন, ভাইরাল ভিডিও ঘিরে বিতর্ক]
সারা দেশের সাথে পশ্চিমবাংলার নদিয়া জেলায়ও রথযাত্রার অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে। করিমপুর থেকে শুরু করে কল্যাণী পর্যন্ত নদিয়া জেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে ছোট বড় বিভিন্ন ধরনের রথের শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় এবং রথের রশিতে টান দিতে অংশগ্রহণ করেন। প্রথমেই অবিভক্ত নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজধানী এবং বর্তমান নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। কৃষ্ণনগরে প্রথম রথযাত্রার সূচনা করেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রপৌত্র মহারাজা গিরীশচন্দ্র। আনুষ্ঠানিকভাবে রাজবাড়ির কূলদেবতা অগ্রদ্বীপের গোপীনাথের জন্যই প্রসিদ্ধ। মহারাজা গিরিশচন্দ্রের প্রচলিত রথযাত্রায় গোপীনাথ শোভিত থাকতেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় গোপীনাথকে নদিয়ার রাজপরিবার ধরে রাখতে পারেনি। তিনি স্থায়ীভাবে অগ্রদ্বীপে ফিরে গিয়েছেন।(Rath Yatra)
সাম্প্রতিককালে তাঁর বিগ্রহ ছাড়াই শুধুমাত্র তাঁর ছবি দিয়ে এই রথযাত্রা সম্পন্ন হয়। কৃষ্ণনগরে নতুন বাজারের গোপীনাথ মন্দিরের পাশে রথ থাকে। সেখান থেকে নতুন বাজারের মোড় পর্যন্ত মাত্র কয়েকশো ফুট এই রথের যাত্রাপথ। মহারাজ গিরীশচন্দ্রের আমলে রথটি ছিল কাঠের। পরে তা নষ্ট হয়ে গেলে স্থানীয় বাসিন্দাবৃন্দ ও নতুন বাজার ব্যাবসায়ী সমিতির সাহায্যে পুনরায় নতুন কাঠের রথ নির্মিত হয়। পরবর্তীতে সেটিও নষ্ট হয়ে যায়। শেষে ১৯৯১ সালে সাড়ে উনিশ ফুট উচ্চতাযুক্ত লোহা দ্বারা নির্মিত একটি রথ প্রস্তুত করা হয়। মূর্তির বদলে সেই রথে ঠাঁই পেয়েছে গোপীনাথের একটি আলোকচিত্র। কৃষ্ণনগরের ‘রাজার রথ’ গোপীনাথের বিগ্রহ ছাড়াই চলছে ২০১৪ সাল থেকে। এই রথের প্রায় দু’শো বছরের ইতিহাসে যা প্রথম। মূর্তির পরিবর্তে রথে রইল শুধু গোপীনাথের ছবি।
নদিয়া জেলার মায়াপুরের ইসকন মন্দিরের রথযাত্রা পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বিখ্যাত রথ উৎসব। এখানে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা রথে চড়ে আসেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, মায়াপুর ও তার পার্শ্ববর্তী একটি গ্রাম ছিল রাজাপুর। রাজাপুর গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী। প্রায় পাঁচশো বছর আগে এক পুরোহিত স্বপ্নে দেখেন যে, রাজাপুর থেকে মায়াপুরে প্রস্থান করবেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা।তার পর সেখান থেকে রথে চড়ে ফিরে আসবেন তাঁরা। এই প্রথা মতোই প্রতিবছর মায়াপুর ও রাজাপুর গ্রামে রথ উৎসব পালিত হয়ে আসছে। এই রথযাত্রা উপলক্ষে মায়াপুরে ৯ দিন ধরে চলে কীর্তন এবং বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠান।
মায়াপুরে ইসকন মন্দিরে মহাসমারোহে পালিত হল জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উত্সব রাজাপুর জগন্নাথ মন্দিরে রথযাত্রার দিন ফের রথে করে নিজের আদি গ্রাম রাজাপুর থেকে মাসির বাড়ি মায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দিরে আসবেন তিনি। এবং উল্টো রথের দিন আবার জগন্নাথ দেব রাজাপুর মন্দির ফিরে যাবেন। ভক্তদের মিলিত ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মায়াপুরের আকাশ বাতাস। মাসির বাড়ি হিসাবে গণ্য চন্দ্রোদয় মন্দিরে সাত দিন কাটিয়ে আবার উল্টোরথ যাত্রায় একই ভাবে ফিরে চলেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। পাশেই বৈষ্ণব তীর্থ পুণ্যভূমি নবদ্বীপ। সেখানেও বিভিন্ন মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় পুজো-পার্বণ এবং রথযাত্রা।(Rath Yatra)
[লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/truthofbengal]
প্রাচীন জনপদ কাঁচরাপাড়ার রথতলতলাতে কৃষ্ণ রাই জিউ মন্দিরের সামনে অবস্থিত প্রাচীন রথ। কাঁচরাপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত কাঁচরাপাড়া মৌজাটি কল্যাণী পুরসভা গঠিত হওয়ার কয়েক বছর পরে পুরসভার অন্তর্গত হয়। পুরোহিতরা রথের পুজো করলেন সঙ্গে সহযোগী মহিলারা হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন পুজো সম্পন্ন করতে। রথের পুজো করার পর পুরোহিতরা চলে যান মূল মন্দিরে। সেখানে কৃষ্ণ রাই বিগ্রহের পুজো করা হয়। কৃষ্ণ রাই জিউ-এর বিশাল আটচালা মন্দিরটি তৈরি করে দেন ধর্মপ্রাণ নিমাই চরণ মল্লিক এবং গৌর চরণ মল্লিক ১৮৩৭ সালে। মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের পরম ভক্ত এবং অন্যতম প্রধান পরিষদ শিবানন্দ সেন তার গুরুর শ্রীনাথ চক্রবর্তীর সেবিত কৃষ্ণ রাই বিগ্রহ পুজো শুরু করেন। পরবর্তীকালে এখানে রথযাত্রা শুরু হয় এবং রথের মেলাও শুরু হয়।
সে যুগে বঙ্গে বিখ্যাত রথগুলির মধ্যে অন্যতম রথ ছিল কাঁচরাপারার রথ। সেই ঐতিহ্য বজায় রেখে এখনও মন্দির সংলগ্ন মাঠে এবং পূর্বদিকে কৃষ্ণ রাই জিউ তরুণ সংঘের মাঠেও মেলা বসে। এছাড়া মেলা বসে রথতলা থেকে বাঁশবেড়িয়া ঘাট যাওয়ার রাস্তার দুই ধারেও। মেলায় বিশেষ আকর্ষণ নানা গাছের চারা বিক্রি। এছাড়া পাঁপড় থেকে শুরু করে জিলিপি, বাদাম ভাজা, ঘুগনি ইত্যাদি বিক্রি হয়। আবার আধুনিক ফাস্টফুড থেকে শুরু করে চায়না ফুড সবই পাওয়া যায়। সংসারের নিত্য প্রয়োজনীও জিনিসপত্র এখানে বিক্রি হয়। মাটির পুতুল পাওয়া যায় এই মেলাতে। বিনোদনের জন্য মেলায় আসে নাগরদোলা। সত্যিকারের মিলনমেলা এই কাঁচরাপাড়ার রথযাত্রার। কল্যাণী থানার পুলিশ আইনশৃঙ্খলার দিকটি বজায় রাখে।
পবিত্র রথযাত্রায় গয়েশপুর মঙ্গল সমিতি ক্লাবের রথযাত্রা ঘিরে উপচে পরে ভক্তদের ভিড়। ভক্তদের রশির টানে রথে চড়ে মাসির বাড়ি গেলেন জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা। ‘রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম, ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম…’– আষাঢ়স্য শুক্লপক্ষে জমজমাট গয়েশপুর বিধানচন্দ্র রোড।(Rath Yatra)
হরিণঘাটাতেও রথের মেলা বসে জাগুলি হরিণঘাটা এবং নগরউখড়াতে। এলাকার মানুষ রথযাত্রা ঘিরে মেতে ওঠে। হরিণঘাটা থানা এলাকায় বিরহী রায় বাড়ির ১১০ বছরের প্রাচীন রথ ও রথের মেলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বড় নিদর্শন। এই রাতের সূচনা করেন মন্মথ নাথ রায় ১৯১৫ সালে। মামজোয়ান গ্রামে বিভিন্ন উৎসবের মধ্যে অন্যতম রথযাত্রা। আজও সেই রথযাত্রা বর্তমান প্রজন্ম ঐতিহ্যের সঙ্গে নিষ্ঠার মাধ্যমে পালন করে থাকে। মামজোয়ান বাজারে প্রতিবছরের মতো এবছরও রথের মেলা বসেছে। বিশিষ্ট সমাজসেবী মোহনলাল ব্রহ্মচারী এই রথটি তৈরি করে দিয়েছেন। মামজোয়ান গ্রাম ছাড়াও চূর্ণী নদীর অপর তীরের গ্রাম থেকেও ভক্ত ও দর্শনার্থীরা রথের মেলায় উপস্থিত হন। এখানকার রথেও জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা আরোহন করেন।
ভীমপুর ঝড়পাড়ার রথযাত্রা এবছর ৫৫ বছরে পড়ল। এই রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা থাকে চোখে পড়ার মতো। এখানকার রথ জেলার অন্যান্য রথের সাথে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করে তুলেছে। এখন শুধু ভীমপুর নয় বিভিন্ন জায়গা থেকেই রথযাত্রা দেখার জন্য প্রচুর মানুষের সমাগম হয় এবছরও রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বহু ভক্ত সমাগম হয়েছে।
ধর্মদা গ্রামবাসীর উদ্দেশে তিন লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে রথ প্রদান করেছে এক বৃদ্ধা। ধর্মদা হরিসভা মন্দিরে রথটি নির্মিত হয়ে সকলের উদ্দেশে প্রদান করা হয়েছে। রানাঘাটের বিখ্যাত রথ হল হবিবপুরের ইসকন মন্দির থেকে আগত রথ। এই রথ ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে রানাঘাটে আসে তারপর স্বাস্থ্যন্নোতি ময়দানে মেলা বসে। আবার রানাঘাটের জগন্নাথ দেবের মন্দির থেকে রথ বের হয় মহাসমারোহে। রানাঘাট শহরের পূর্বদিকেও রথের মেলা ধুমধামের সঙ্গে হয়। আবার কুপার্স ক্যাম্প এলাকাতেও রথের মেলা ঘিরে এলাকাবাসীদের উন্মাদনা চোখে পড়ে।
আড়ংঘাটায় যুগলকিশোর মন্দির সুপ্রাচীন এবং বিখ্যাত। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরটিতে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ আছে। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসে মন্দির প্রাঙ্গনে একমাসব্যাপী মেলা বসে। এই মেলা যুগলকিশোরের মেলা নামে প্রসিদ্ধ।
শান্তিপুর শহরে একসময় দশটি স্থানে রথের মেলা বসত। এবছর থেকে সেই মেলা বেড়ে ১১ হল। শান্তিপুরের গোস্বামী বাড়ির রথযাত্রায় পালিত হয় এক বিশেষ রীতি। রথের আগের দিন রঘুনাথ, জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রাকে অভিষেক করানো হয়। তারপর হয় দেবতার অধিবাস। এরপর ফল নৈবেদ্য দিয়ে চলে পুজো। গোস্বামী বাড়ির এই বিশেষ রথযাত্রা প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। জগন্নাথ নয়! রঘুনাথকে কেন্দ্র করেই হয় শান্তিপুরের রথ। শান্তিপুরের রথযাত্রার ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। এখানকার রথগুলির মধ্যে কয়েকটি গোস্বামী পরিবারের রথ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সেই আবহমান কাল থেকে শান্তিপুরে বড় গোস্বামী বাড়িতে রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়ে চলেছে। বড় গোস্বামী বাড়ির এই রথ যাত্রাই জগন্নাথ-সুভদ্রা ও বলভদ্রা ছাড়াও পূজিত হন রামচন্দ্র। তবে প্রচলিত রামচন্দ্রের মূর্তির চেয়ে অনেকটাই আলাদা এই মূর্তি। এখনে রঘুনাথ বাবু হয়ে পদ্মাসনে বসে আছেন। মুখে মোটাসোটা গোঁফ! পরনে ধুতি আর গায়ে চাদর। গায়ের রং সবুজ। অবশ্য রথে রঘুনাথের পাশে থাকে জগন্নাথের বিগ্রহও। রথের দিন হাওদায় চাপিয়ে রঘুনাথকে মন্দির থেকে রথের সামনে এনে বিশেষ পুজো করা হয়। পুরী, গুপ্তিপাড়া, মহিষাদল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য রথগুলির প্রত্যেকটিই কাষ্ঠ নির্মিত হলেও শান্তিপুরে রঘুনাথের রথটি লৌহ নির্মিত। তবে বড় গোস্বামীবাড়ি ছাড়াও গোপালপুর সাহাবাড়ি, সূত্রাগড়ের মোদক সম্প্রদায়ের রথ উল্লেখযোগ্য। রথযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে মেলা। রথের মেলা বসে বড় গোস্বামী বাড়ি সংলগ্ন মাঠে, অন্যটি রথতলায়। বড় গোস্বামী পাড়ার মেলায় আজও মেলার সাবেক আমেজটা অটুট রয়েছে। শান্তিপুরে রথযাত্রা মানে ঘুড়ি ওড়ানোর রেওয়াজ।
চৈতন্যধামে জগন্নাথ বাড়ির বালক সাধুর রথ, মণিপুর রাজকন্যা পরম বৈষ্ণব বিম্বাবতী মঞ্জরীদেবীর ইচ্ছায় মণিপুর রাজবাড়ির রথ, দেবানন্দ গৌড়ীয় মঠের রথ, সারদেশ্বরী আশ্রমের সন্ন্যাসিনীদের রথ– তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। মণিপুররাজ ভাগ্যচন্দ্র সিংহ ১৭৯৭ সালে নবদ্বীপে আসেন। তার কন্যা বিম্বাবতী মঞ্জরি মহাপ্রভু দর্শনের স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। এরপর রাজা ভাগ্যচন্দ্রের মৃত্যুর পর কুমার চৌরজি সিংহ বোন বিম্বাবতী মঞ্জরীর ইচ্ছানুসারে নবদ্বীপে বসতি স্থাপন করেন। ১৮০৫ সালে বিম্বাবতী মঞ্জরীর হাত ধরেই মণিপুর রাজবাড়ির রথযাত্রার সূচনা হয়। বাংলার শেষ স্বাধীন রাজা লক্ষণ সেনের প্রধানমন্ত্রী হলায়ুধের অধস্তন পঞ্চম পুরুষ হলেন জগন্নাথ গোস্বামী। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ওপার বাংলার সুবিখ্যাত রথের চাকা থেমে গিয়েছে নবদ্বীপে এসে। বেশ কয়েক বছর ধরে বাসুদেবের রথ নামে পরিচিত সেই রথের চাকা আর গড়ায় না। অবিভক্ত বাংলাদেশে যশোমাধবের রথযাত্রার খ্যাতি ছিল সুবিদিত। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগেই বিগ্রহ চলে আসে নবদ্বীপে। নাম হয় বাসুদেব। ১৯৪৫ থেকে ঢাকার বদলে নদিয়ায় চলেছে বাসুদেবের রথ। বাসুদেব অবশ্য কোনও দিনই রথে চড়েননি। তাঁর প্রতিনিধি হয়ে চড়তেন জগন্নাথদেব।(Rath Yatra)
চাকদা ব্লকের যশড়া, নেউলিয়া, পালপাড়ার মহেশ পণ্ডিতের শ্রীপাটের মতই চাঁদুড়িয়া এক নম্বর জিপির মালোপাড়ায় অবস্থিত বসুধা জাহ্নবী শ্রী পাট বৈষ্ণবদের কাছে পরম তীর্থ ক্ষেত্র বলে পরিচিত। আজও পূজিত হন প্রভু নিত্যানন্দের হাতে প্রতিষ্ঠিত শালগ্রাম শীলা জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাদেবী। প্রতিদিন নিত্যপুজো সহ জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা সহ রথযাত্রার সময়েও বিশেষ পুজো অনুষ্ঠিত হয়। তবুও এখানে রথের দড়িতে আজ পযর্ন্ত টান পড়েনি, দুঃখের বিষয় এখানকার প্রাচীন বাসিন্দারাও জগন্নাথ দেবকে রথে উঠতেই দেখেননি। তবে এখানকার মানুষ রথের আনন্দ উপভোগ করেন শিমুরালি স্টেশনের নিকট গৌড়ীয় মঠের রথে। রাস্তার দুপাশে মেলা বসে। নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জের শিবনিবাসে রয়েছে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত এশিয়া মহাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় শিবলিঙ্গ। বর্তমানে দুটি শিব মন্দির ও একটি রাম সীতা মন্দির। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই মন্দিরে রথের প্রচলন করেন।






