সাহিত্যে এঁকেছিলেন কয়লাখনির শ্রমিক জীবনের চিত্র, অমর শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়
তিনি 'কালি কলম' ও 'কল্লোল' গোষ্ঠীর অন্যতম বিশিষ্ট লেখক ছিলেন।
রাজু পারাল: শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। কয়লাখনির খেটে খাওয়া শ্রমিকদের শোষিত জীবন কথা লিপিবদ্ধ করে বাংলা সাহিত্যে তিনি অমর হয়ে আছেন। ১৩৩০ সালের ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় ড: নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত লিখেছিলেন, ‘আজকাল যাঁহারা গল্প লেখেন তাঁহাদের মধ্যে শ্রীযুক্ত শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় যেমন করিয়া অবনত শ্রমিক জীবনের সুন্দর চিত্র আঁকিয়াছেন, তেমন আর কেহ লিখিয়াছেন বলিয়া মনে হয় না। তাঁহার লেখা পড়িলেই মনে হয় যে, তিনি এই শ্রেণীর লোকদের জীবন ও মন দরদের সহিত অন্তরঙ্গভাবে জানিবার ও বুঝিবার চেষ্টা করিয়াছেন। তাই তাঁহার চিত্রগুলি এত মনোজ্ঞ ও সত্য হইয়াছে।’
রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের ভিত গাঁথা হয়েছিল শৈলজানন্দের কলম দিয়েই। আর তাঁর যোগ্য সঙ্গী ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু, প্রবোধকুমার সান্যাল প্রমুখ। তিনি ‘কালি কলম’ ও ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর অন্যতম বিশিষ্ট লেখক ছিলেন।
সাহিত্যিক শৈলজানন্দের জন্ম ১৯০১ সালের ১৮ মার্চ, বীরভূম জেলার রূপসীপুরের হাটসেরাদি গ্রামে। তাঁর পিতা ধরণীধর মুখোপাধ্যায়, মা হেমবরণী দেবী। শৈলজানন্দের তিন বছর বয়সকালে মা হেমবরণী মারা গেলে বাবা ধরণীধর তাঁকে মামার বাড়িতে রেখে আসেন। সেই সময় ধনী কয়লা ব্যবসায়ী দাদু রায়সাহেব মৃত্যুঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের কাছেই তিনি মানুষ হন। ধনী দাদুর বিশাল একান্নবর্তী পরিবারের বাসিন্দা হয়েও নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করতেন শৈলজানন্দ। ভাবতেন, ওদের মা-বাবা আছে, আমার কেউ নেই। সেই নিঃসঙ্গতা বোধেই নিহিত ছিল তাঁর সাহিত্যবোধের বীজ। মাঝে মধ্যেই নিজের অন্তর বেদনার কথা মাকে জানাতে চিঠি লিখতেন।
যদিও সে চিঠির ঠিকানা তাঁর জানা ছিল না। তবুও যেন লিখে শান্তি পেতেন খানিকটা। এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘কেমন যেন নেশার মতো পেয়ে বসলো মাকে চিঠি লেখার কাজটা। রোজই চিঠি লিখতে লাগলাম। নির্জনে ছাদে গিয়ে চুপটি করে বসে বসে পাতার পর পাতা লিখে লিখে খাতাটা প্রায় শেষ করে ফেললাম। অনেকগুলো চিঠি আমি লিখেছিলাম। আজকে আমার এই পরিণত বয়সে পেছনের জীবনটাকে জরিপ করতে বসে বুঝতে পারছি, এইখানেই হয়েছিল আমার সাহিত্যের হাতেখড়ি। সাহিত্যের চেহারাটাও ঠিক এমনিই। সাহিত্যও এমনি মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কথা আর কাহিনীতে ভরা।’
শৈলজানন্দের শিক্ষাজীবন শুরু হয় রানিগঞ্জের সিয়ারসোল বিদ্যালয়ে। সেখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ওই বিদ্যালয়ে পড়াকালীন দু’জনের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। তখন শৈলজানন্দ লিখতেন পদ্য আর নজরুল লিখতেন গদ্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় দু’জনে যখন এন্ট্রান্স পর্যায়ের ছাত্র ছিলেন, সেই সময়ে স্কুলের প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা না দিয়ে দু’জনে পালিয়ে যান সেনা বাহিনীতে যোগ দিতে। মেডিক্যাল টেস্টে শৈলজানন্দ বাতিল হলেও বন্ধু নজরুল যোগ দেন সেনা বাহিনীতে। অতপর শৈলজানন্দ কলেজে ভর্তি হন। অর্থনৈতিক কারণে কলেজ ত্যাগ করে একসময় শর্টহ্যান্ড ও টাইপ রাইটিং শিখে তিনি কুমারডুবির কয়লাখনিতে কাজ নেন। সেখানে কাজ করার সময়েই একের পর এক স্মরণীয় গল্প লেখেন শৈলজানন্দ। কয়লা খনির শ্রমিকদের শোষিত জীবন উঠে আসে তাঁর লেখায়।
১৯৩২ সালে কয়লা খনির চাকরি ছেড়ে দিয়ে শৈলজানন্দ পুরোদস্তুর সাহিত্যচর্চা ও চলচ্চিত্রকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেন। ওই সময়ে ‘বাঁশরি’ পত্রিকায় তাঁর রচিত ‘আত্মঘাতীর ডায়েরি’ প্রকাশিত হলে দাদামশাই তাঁকে আশ্রয়চ্যুত করেন। আশ্রয়হীন শৈলজানন্দ কলকাতায় চলে আসেন এবং সম্পূর্ণভাবে সাহিত্যের আঙিনায় ডুব দেন। কবিতা রচনার মধ্যে দিয়ে সাহিত্যক্ষেত্রে প্রবেশ করলেও পরবর্তীকালে কথা সাহিত্যিক হিসেবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেন শৈলজানন্দ।
খনি শ্রমিক, সাঁওতাল ও অন্যান্য নিম্নবর্গের শ্রমজীবী মানুষের জীবন অবলম্বনে অনেকগুলি উপন্যাস তিনি সে সময়ে রচনা করেছিলেন। যার মধ্যে ‘মাসিক বসুমতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প ‘কয়লাকুঠির দেশ’। শৈলজানন্দের চিন্তনে ও মননে, ‘কয়লাকুঠির দেশ, চারদিকে রেলের লাইন, লোহালক্কড়ের যন্ত্রপাতি, চিমনি আর ধোঁয়া– অসমতল প্রান্তরের উপর মাঝে মাঝে এক- একখানি গ্রাম। বহুকালের পুরাতন কয়লাকুঠি।’ তিনি একটি বিশেষ অঞ্চলের জীবনকে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করে সজীব চিত্র রচনা করেছেন। যেখানে আছে দারিদ্র, আছে প্রেম।
উপন্যাস এবং গল্প মিলিয়ে শৈলজানন্দ সৃষ্টি করেছেন প্রায় দেড়শত গ্রন্থ। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি- কয়লাকুঠির দেশ, ডাক্তার, বন্দি, আজ শুভদিন, মাটির ঘর, দিনমজুর, জীবননদীর তীরে, পৌষ পার্বণ, অভিশাপ, রূপং দেহি, আমি বড় হব, পাতালপুরি, আকাশকুসুম, ঝড়ো হাওয়া, সারারাত, যে কথা বলা হয়নি ইত্যাদি। ‘আমার বন্ধু নজরুল’ ও ‘ কেউ ভোলে না কেউ ভোলে ‘ তাঁর লেখা দুটি স্মৃতিকথাও বেশ স্মরণীয়।
সেই সময়ের বিখ্যাত সব পত্রিকায়- (ভারতবর্ষ, প্রবাসী, বিচিত্রা, মাসিক বসুমতী, কল্লোল, কালিকলম, বঙ্গবাণী, সংহতি, ছায়া, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, সাহানা) শৈলজানন্দের লেখা একের পর এক গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। শৈলজানন্দ সম্পাদনাও করেছিলেন বেশ কিছু পত্রিকা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য– সাপ্তাহিক সাহানা, কালি কলম, গল্পভারতী ইত্যাদি।
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় শুধু যে সাহিত্যিক ছিলেন তা নয়, চলচ্চিত্রের প্রতিও ছিল তাঁর অদম্য আকর্ষণ। তিনি বলেছিলেন, ‘সাহিত্যকে বাঁচাবার জন্যই আমি গিয়েছিলাম সিনেমায়। …সাহিত্যের স্পর্শ না পেলে সিনেমা শিল্পের দুর্দিন ঘনিয়ে আসতে দেরি হবে না। নিজের লেখা ‘কয়লাকুঠি’ গল্প অবলম্বনে তৈরি করেন ‘পাতালপুরী’ ছবিটি। ‘মৃত্তিকা’ গল্প অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘দেশের মাটি’ ছবিটি। ১৯৬৮ সালে যা ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে আমন্ত্রিত হয়। ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন দুর্গাদাস গঙ্গোপাধ্যায়, ভানু বন্দোপাধ্যায় , কুন্দনলাল সায়গল, পঙ্কজ কুমার মল্লিক, শ্যাম লাহা, উমা শশী, চন্দ্রাবতী প্রমুখ।
প্রতিভাধর ব্যক্তি শৈলজানন্দ কেবলমাত্র কাহিনি ও চিত্রনাট্য লিখে সন্তুষ্ট হননি। ছবি পরিচালনার দিকেও তাঁর ঝোঁক ছিল অদম্য। শেষমেশ কুমুদরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে তৈরি করলেন কেবি পিকচার্সের প্রথম ছবি ‘নন্দিনী’। ছবিটির কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছিলেন শৈলজানন্দ নিজে। ছবিটিতে একাধিক গান লিখেছিলেন বন্ধু নজরুল ইসলাম। ১৯৪১ সালে ছবিটি বিএফজেএ পুরস্কার পায়।
‘নন্দিনী’ ছবির কাহিনি শৈলজানন্দের লেখা ‘জননী’ উপন্যাস অবলম্বনে রচিত। ধীরে ধীরে তিনি শেষপর্যন্ত বাংলা ছবির জগতে একজন কিংবদন্তি পরিচালক হয়ে ওঠেন। ১৯৪৩ সালের ডিসেম্বর মাসে মুক্তি পায় তাঁর অসামান্য ছবি ‘শহর থেকে দূরে’। পরে নিজের লেখা গল্পকাহিনি থেকে নির্মাণ করলেন– বন্দী, মানে না মানা, শ্রীদুর্গা, সন্ধে বেলার রূপকথা, রংবেরং, বাংলার নারী, কথা কও, আমিও বড় হব, মনি ও মানিক ইত্যাদি। সাহিত্যিক পরিমল গোস্বামী বলেছিলেন, ‘শুধু দৃষ্টি নয়, তাঁর সমস্ত মনপ্রাণ, ধ্যানধারণা সিনেমাকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খেতে থাকত।’
নিজের জীবনকালে সাহিত্যিক শৈলজানন্দ বহু পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। অর্জন করেছিলেন আনন্দ পুরস্কার, উল্টোরথ পুরস্কার এবং যাদবপুর ও বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া ডি লিট।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ১৯৭২ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং ১৯৭৬ সালে চলে যান চির শান্তির দেশে।






