সম্পাদকীয়

বইমেলার ‘বই-কথা’

যাঁরা প্রবীরদাকে চেনেন, তাঁরা জানেন যে, প্রবীরদা যতটা ভালো লেখেন, ততটাই ভালো কথা বলেন।

সুমন ভট্টাচার্য: পশ্চিমবঙ্গে সাংবাদিক হিসেবে যে ক’জন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গত ৪০ বছর ধরে অনুসরণ করছেন বা কংগ্রেস নেত্রী থেকে তৃণমূল নেত্রী, এবং পরবর্তীকালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়াকে খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, সেই তালিকায় দেবাশিস ভট্টাচার্য, আশিস ঘোষ, রন্তিদেব সেনগুপ্ত, প্রবীর ঘোষাল এবং জয়ন্ত ঘোষাল অবশ্যই অগ্রগণ্য। সেই প্রবীর ঘোষালের একটি বই ‘মমতা ম্যাজিক’ এবার কলকাতা বইমেলায় উদ্বোধন করেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম, ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু, সল্টলেকের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তী প্রমুখ। প্রবীরদা তো শুধু রাজনৈতিক ভাষ্যকার নয়, তিনি মধ্যে ৫ বছর শাসক দলের বিধায়কও ছিলেন। ফলে প্রবীরদার যখন কোনও বই লেখেন অবশ্যই তা ‘মমতা ভক্ত’দের কাছে বা তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের কাছে ‘বাইবেল’ হয়ে উঠতে পারে। যাঁরা প্রবীরদাকে চেনেন, তাঁরা জানেন যে, প্রবীরদা যতটা ভালো লেখেন, ততটাই ভালো কথা বলেন।

প্রবীরদার মতোই আর-এক সেলিব্রিটি সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ী। গৌতম লাহিড়ী আজকাল, প্রতিদিন, ইটিভি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। দীর্ঘ দিন দিল্লিতে ছিলেন। সর্বভারতীয় প্রেস ক্লাব অর্থাৎ, ‘প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়া’র সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন একাধিক বার। তিনি যতটা ভালো করে দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে চিনতেন, ততটাই ভালো চেনেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। সেই গৌতম লাহিড়ীর একটি বই ‘সংবাদের নেপথ্যে’ প্রকাশ পেল এই বইমেলাতেই। সেই প্রকাশেও উপস্থিত ছিলেন জয়ন্ত ঘোষাল, সংবাদ প্রতিদিনের সম্পাদক সৃঞ্জয় বসু, ফিচার এডিটর ভাস্কর লেট। প্রবীরদা এবং গৌতমদা, দুজনেরই বইয়ের প্রকাশক খোয়াই প্রকাশনী। খোয়াই প্রকাশনীর দুই তরুণ কর্ণধার কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রোশনি বন্দ্যোপাধ্যায় কালে কালে বাঙালি সেলিব্রিটি সাংবাদিকদের অনেকের বই-ই নিজেদের ঝুলিতে ঢুকিয়ে ফেলেছেন।

কবিতা দিয়ে হাতেখড়ি হলেও গল্পকার হিসেবে বৈশাখী ঠাকুর ইতিমধ্যেই বেশ জনপ্রিয়। সুন্দরী এই গল্পকার যেমন থ্রিলার লেখেন, তেমনই আবার রামকৃষ্ণের বিষয়ও বই লিখতে দ্বিধা করেন না। এবারের বইমেলায় তাঁর দুটি বই নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। একটি ‘পূবালী অহনা সমগ্র ১’, যেটি প্রকাশ করেছে বসাক বুক স্টোর। অন্যটি ‘রামকৃষ্ণ শরণং’ যেটি প্রকাশ করেছে সুদীপ ভট্টাচার্যের ‘ঘরে বাইরে প্রকাশন’। বৈশাখী ১৯-২০ থেকে শুরু করে প্রায় কলকাতার সমস্ত পত্রিকা এবং ম্যাগাজিনেই নিয়মিত গল্প লেখেন। শ্রীরামপুরে জন্ম হলেও তাঁর ছোটবেলাটা কেটেছে উত্তরবঙ্গে। তাই উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গ— দুই বঙ্গেই তিনি ঘরের মেয়ে। সেই ‘ঘরের মেয়ে পরিচয়’কে কাজে লাগিয়ে বৈশাখীর লেখালিখিতে পরিচিতি পাওয়া এবং নিজের জায়গাকে তৈরি করে নেওয়া। উত্তরবঙ্গের লিট ফেস্টেও যেমন তাঁকে দেখা যায়, আবার কলকাতা বইমেলাতেও তিনি স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ান।

সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণ গবেষক দেবরাজ ভট্টাচার্যের প্রোফাইল দেখলে মনে হয় তাঁর জীবনে ‘স্বপ্নো কি রানি’ দার্জিলিং। দার্জিলিং নিয়ে এমন কবিতা, এমন রোমান্টিক ক্যানভাস তিনি তৈরি করেন যে, তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল থেকে চোখ ফেরানো মুশকিল হয়ে যায়। সেই দেবরাজ এবার বইমেলায় একটি চমৎকার বই বের করেছেন, বইয়ের বিষয় দার্জিলিংয়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জীবনের শেষ কয়েকটি দিন। বইটির নাম ‘স্টেপ এসাইড: ৫, রঙ্গিত রোড, দার্জিলিং’। যাঁরা দেশবন্ধুকে অনুসরণ করেন বা যাঁরা দার্জিলিংকে ভালোবাসেন, তাঁরা জানেন দার্জিলিংয়ের ঠিক কোন বাড়িটিতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ জীবনের শেষ কটা দিন কাটিয়েছিলেন। সেই বিষয়ে এত তথ্য নির্ভর একটি বই এবার দেবরাজ লিখেছেন এবং আর-এক তরুণ প্রকাশক, ডি এম লাইব্রেরির অরিত্র গোপাল মজুমদার সেই বই প্রকাশ করেছেন এত যত্ন নিয়ে, যে মুগ্ধ হতেই হয়। দেবরাজ এবং অরিত্র গোপাল— দুজনের যুগলবন্দিতে ‘স্টেপ এসাইড : ৫, রঙ্গিত রোড, দার্জিলিং’ পাঠকের কাছে অবশ্য পাঠ্য বা সংগ্রহযোগ্য বলতেই হবে।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং সুভাষ চন্দ্র বসু বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের, স্বাধীনতা সংগ্রামের দুই অবিস্মরণীয় চরিত্র, যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সম্প্রীতির কথা বারবার বলেছিলেন, সেই পাশাপাশি সহাবস্থানের বার্তাই বহন করে চলে ‘নতুন গতি’ পত্রিকা। ইমদাদুল হক নূর সাহেব দীর্ঘ দিন ধরে এই পত্রিকাটি শুধু প্রকাশ করছেন না, তরুণ মুসলিম লেখকদের, সম্ভাবনাময় প্রতিভাদের তুলে আনছেন। সেই ইমদাদুল হক নূরের প্রকাশনা থেকে এবার প্রকাশ পেয়েছে মহম্মদ বাকীবিল্লাহ মণ্ডলের ‘গোধূলির দহন’। মহম্মদ বাকীবিল্লাহ মণ্ডল উত্তর ২৪ পরগণার অশোকনগরের বাসিন্দা। যদি পড়াশোনার কথা বলেন, তাহলে এম এ, এম ফিল এই মুসলিম লেখক ‘ট্রিপল বি এড’ও বটে। পেশায় শিক্ষক বাকীবিল্লাহ মণ্ডল ২০১২ সাল থেকেই কলম এবং অন্য পত্র-পত্রিকায় লিখে চলেছেন। এবার বইমেলায় ‘নতুন গতি’ প্রকাশ করল তাঁর কবিতার বই ‘গোধূলির দহন’।

অরুণ মুখোপাধ্যায়ের ‘ধর্মের কল এবং অন্যান্য’ এই প্রবন্ধ সংকলন বের করেছে দে’জ পাবলিশিং। অরুণ বাবু এক সময় শঙ্খ ঘোষের স্নেহধন্য ছিলেন। নিজের শারীরিক চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করে তিনি কখনও সাংবাদিকতা করেছেন, কখনও সওদাগরি অফিসে চাকরি করেছেন। কিন্তু লেখালিখি এবং সারস্বত সাধনা থেকে কখনও সরে যাননি। তাঁর লেখার শৈলী, তাঁর নিবন্ধ রচনার ধরন কিছুটা আলাদা। সেকথা তাঁর বইয়ের ভূমিকায় তিনি নিজেই বলেছেন। এই আলাদা ধরনের লেখার জন্য তাঁর লেখা পড়তে একটা অন্য ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়। অরুণ মুখোপাধ্যায় ঠিক যে সময়ে এই ‘ধর্মের কল এবং অন্যান্য’ প্রবন্ধ সংগ্রহ বের করছেন, সেই সময় ভারতবর্ষ উত্তাল ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতি নিয়ে। কিন্তু অরুণ মুখোপাধ্যায় দমবার পাত্র নন।

তিনি নিজের মত, নিজের যুক্তি, বুদ্ধিকে প্রতিষ্ঠা করে এই বইটিকে অন্য চেহারা দিয়েছেন। সুখের কথা দে’জ পাবলিশিং-এর তরুণ কর্ণধার অপু দে এই বইটিকে প্রকাশের এবং নামকরণের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। মানস ব্যানার্জী সরকারি চাকরি করেন। তার ফাঁকে ফাঁকে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা। রাজনীতি সচেতন, সাহিত্য সচেতন মানসরা শুরু করেছেন নতুন পত্রিকা, ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘শব্দরেণু’। সেই পত্রিকার সঙ্গেই যুক্ত এবং মানসের সহকারী সম্পাদক প্রিয়াঙ্গনা দীর্ঘাংগী। প্রিয়াঙ্গনা কবিতা লেখেন।

সেই কবিতার বইয়ের নাম ‘রূপকথা ছুঁয়ে’ এবার মানসদের শব্দরেণুর বইমেলা সংখ্যার পাশাপাশি প্রিয়াঙ্গনাও বের করেছেন তাঁর নিজের চটি কবিতার বই, ‘রূপকথা ছুঁয়ে’। এটা সুখের বিষয় যে ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতি, দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিবাদ এই সব কিছু উত্থানের মধ্যে দাঁড়িয়েও মানস, প্রিয়াঙ্গনার মতো তরুণ-তরুণীরা সাহিত্যেই মনোনিবেশ করেছেন। সাহিত্যের পত্রিকা বের করছেন, বই প্রকাশ করছেন এবং সাহিত্যচর্চার মধ্যে দিয়েই হয়তো বাঙালি অস্মিতাকে টিঁকিয়ে রেখেছেন। প্রিয়াঙ্গনার কবিতা এই ‘বাঙালি অস্মিতা’র কথা বলে। বোঝা যায়, তাঁর গোটা পরিবারই হয়তো কোনও না কোনওভাবে বাঙালির এই আত্মপরিচয়ের সন্ধানে রয়েছে।

২০২৬-এর এই মহাগুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের ঠিক মুখে দাঁড়িয়ে বাঙালির এই বইমেলা বা বলা যায় বাঙালির বইপার্বণ অবশ্যই আলাদা তাৎপর্য বহন করে। বাঙালি যে তার নিজস্ব অস্মিতা, নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি— আসলে কোনও কিছুকেই কারও কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারবে না, সেটা বোধহয় এবারের বইমেলা দেখিয়ে দিয়ে গেল। বাঙালির জাতিসত্তা বা বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার উপর বিজেপি যে আঘাত হানতে চায়, সেই আঘাতের জন্য বইমেলাই ছিল শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র। কিন্তু বইমেলার দেড় সপ্তাহ পার করে দেওয়ার পরও এটা নিশ্চিন্তে বলে দেওয়া যায় যে, বইমেলায় গেরুয়া শিবির তেমন কিছুই করে উঠতে পারেনি।

ছুটকো-ছাটকা কয়েকজনের বইপ্রকাশ বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের স্টল ছাড়া বাঙালির সংস্কৃতি ক্ষেত্রে গেরুয়া শিবির ঢুকতে পারল কোথায়? আসলে যারা রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করে, যারা রোকেয়া এবং নজরুলকে মেনে নিতে পারে না, যারা মৌলানা আবুল কালাম আজাদকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে, সেই গেরুয়া শিবিরের পক্ষে বাঙালির মনকে চেনা এবং মনকে জানা সত্যিই খুব কঠিন কাজ। সেই কাজে বোধহয় আরও একবার গেরুয়া শিবির ব্যর্থ হতে চলেছে। অন্তত বইমেলায় মুক্তচিন্তার বাঙালির প্রগতিশীলতার যে ধ্বজা ওড়াতে দেখা গেল, তারপরে এই কথাটা নিশ্চিন্তেই বলে দেওয়া যায়।

Related Articles