সম্পাদকীয়

কেন পুরুষরা কাঁদে না? সামাজিক পুরুষত্বের দমন-নিয়ন্ত্রণের গল্প

জন্মের মুহূর্তে যে শিশু কেবল একজন মানবশিশু, একটি স্পর্শকাতর প্রাণ, সামাজিক লেবেল তখনই তাকে ঢেকে দেয়।

সত্যগোপাল দে (সাংবাদিক, নারী ও শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং সাইকোলজিকাল কাউন্সেলর): একটি শিশু যখন মায়ের গর্ভ থেকে প্রথমবার ভূমিষ্ঠ হয় তখন তার সেই আকুল কান্না আসলে অস্তিত্বের প্রথম ঘোষণা। জন্মের সেই স্পর্শকাতর মুহূর্তে সে জানে না তার পরিচয়— ধর্ম, জাত, ভাষা, এমনকী তার জেন্ডার অর্থাৎ লিঙ্গ পরিচয় অচেনাই রয়ে যায়। সে তখন শুধু এক নবজাতক— ক্ষুধা আছে, উষ্ণতার প্রয়োজন আছে, নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে।

কিন্তু শিশুটির এই অচিহ্নিত সত্তাকে সমাজের কাঠামো খুব বেশিক্ষণ অব্যক্ত থাকতে দেয় না। ডাক্তার, নার্স বা ধাত্রী যখন শিশুটির জৈবিক বিশেষ অঙ্গটির দিকে তাকিয়ে উচ্চারণ করেন— “ছেলে হয়েছে” বা “মেয়ে হয়েছে”— সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক নিয়তির প্রথম ইটটি স্থাপিত হয়। এই ঘোষণাকেই সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন ‘সেক্স অ্যাসাইনমেন্ট’।

দেখতে যতই সাধারণ চিকিৎসাগত পর্যবেক্ষণ মনে হোক, এর অভিঘাত কিন্তু গভীরভাবে সামাজিক। কারণ, একটি জৈবিক তথ্যকে ভিত্তি করে সমাজ তৎক্ষণাৎ তৈরি করে ফেলে প্রত্যাশা, ভূমিকা, নিয়ম ও সীমারেখা— শিশুটি বড় হয়ে কেমন হবে, কী করবে, কীভাবে চলবে, কোন আচরণ তার ‘মানানসই’, কোনটি ‘অশোভন’— সবকিছুর নকশা যেন জন্মের সেই প্রথম শব্দেই আঁকা হয়ে যায়।

জন্মের মুহূর্তে যে শিশু কেবল একজন মানবশিশু— একটি স্পর্শকাতর প্রাণ— সামাজিক লেবেল তখনই তাকে ঢেকে দেয়। তাই জেন্ডার নিয়ে আলোচনা শুরু করতে হলে, আমাদের ফিরে তাকাতে হয় এই প্রথম ঘোষণাটির দিকে, যে ঘোষণার শেকড় বায়োলজিক্যাল হলেও এর শাখাপ্রশাখা সম্পূর্ণ সামাজিক, এবং যা আজও আমাদের সমাজের বৈষম্য, বঞ্চনা ও অসমতার গল্পকে গোপনে গুছিয়ে দেয়।

একটি শিশুকে যখন ‘ছেলে’ বলে চিহ্নিত করা হয়, তখন সমাজ তার কাঁধে অদৃশ্য এক সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়। তার হাতে ধরিয়ে দেয় এক অলিখিত চিত্রনাট্য— যার নাম পৌরুষ বা ম্যাসকুলিনিটি। শিশুটি তখনও শব্দ চেনে না অক্ষর চেনে না, কিন্তু সমাজ তাকে পাঠ দিতে শুরু করে দেয়। তাকে মুখে বলা হয় না, কিন্তু আচরণে, চোখের ইশারায়, শাসনে, উপহাসে— প্রতিটি মুহূর্তে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়; এই স্ক্রিপ্টই তোমার আজীবন অভিনয়; এর বাইরে যাওয়া নিষেধ।

এই চিত্রনাট্যের প্রথম শিক্ষা— ব্যথা পেলেও মুখ খুলো না।

দ্বিতীয় শিক্ষা— ভয় পেলেও লুকিয়ে রাখো।

তৃতীয় শিক্ষা— অভিমান, কান্না, দুর্বলতা— এসব ‘ছেলেমানুষি’ নয়, এগুলো নাকি ‘মেয়েদের ব্যাপার’।

তাকে বলা হয়, তাকে হতে হবে পাথরের মতো শক্ত, ইস্পাতের মতো নির্ভীক। অথচ সে-ও তো রক্তমাংসের মানুষ— তারও তো কাঁদতে ইচ্ছে করে, তারও তো ভয় জাগে, তারও তো মায়ের কোলে মুখ গুঁজে আশ্রয় নিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সমাজ তাকে সেই মানবিকতা থেকে ছিটকে সরিয়ে দেয়। ধমক দিয়ে বলে— ‘ছিঃ! তুমি না ছেলে?’

আসলে ‘পুরুষত্ব’ পথের যে সামাজিক আয়োজন, তার আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক কঠোর দমনব্যবস্থা। এই ব্যবস্থাই ছেলেদের বলে— তোমার মানবিক আবেগ বিপজ্জনক, তা দমন করতে হবে; কান্না দুর্বলতা পুরুষকে মানায় না, কোমলতা ‘মেয়েলি’, তাই তা বর্জন করো। ধীরে ধীরে তাকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয় যেন সে রক্তমাংসের মানুষ নয়, বরং এক সামাজিক রোবট— যার কাজ শুধু শক্তির প্রদর্শন, নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস, আর তথাকথিত ‘পুরুষোচিত’ আচরণের অহঙ্কার বহন করা।

এইভাবেই জন্মের পর থেকেই সামাজিক চিত্রনাট্য ছেলেদের ঘিরে তৈরি করে এক অদৃশ্য কারাগার। কারাগারটি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তার শিকল বেঁধে রাখে তাদের মন, স্বভাব, আচরণ, এমনকী আত্মপরিচয়কেও। আর এই বাঁধনই জন্ম দেয় অবদমন, হতাশা, রাগ, আক্রমণাত্মকতা— যা পরবর্তীতে হিংসার নানা রূপে প্রকাশ পায়।

ফলত, যে পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সমাজ বহুদিন ধরে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নিয়েছে, সেই সংস্কৃতি বিষিয়ে তোলে সবার জীবন— নারী, পুরুষ, শিশু, এমনকী পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের পরিকাঠামোকেও। এই অদৃশ্য কারাগার কেবল নারীর স্বাধীনতাকেই সংকুচিত করে না— পুরুষের মানবিক সত্তাকেও ক্রমশ পঙ্গু করে দেয়।

লিঙ্গভিত্তিক এই পূর্বনির্ধারিত চিত্রনাট্য তাই কেবল বৈষম্যের গল্প নয়— এ এক গভীর সামাজিক ক্ষত, যা সমাজকে প্রতিদিন নীরবে রক্তাক্ত করে চলেছে।

আমরা আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে প্রায়ই ধরে নিই— পুরুষ হওয়া যেন প্রকৃতির সংবিধান, জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই ডিএনএ-তে খোদাই হয়ে থাকা এক সত্য। কিন্তু আধুনিক জেন্ডার স্টাডিজ এবং মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী এই ধারণা ভ্রান্ত। সেক্স বা জৈবিক লিঙ্গ হল প্রকৃতির বিষয়— ক্রোমোজোম, হরমোন ও দেহগঠনের ভিন্নতা। কিন্তু জেন্ডার, অর্থাৎ পুরুষত্ব–নারীত্বের আচরণ, ভূমিকা, প্রত্যাশা— এসবের কোনওটিই জন্মগত নয়; এগুলো সমাজ তৈরি করে, গড়ে তোলে, আর চাপিয়ে দেয়। অর্থাৎ জেন্ডার হল একেবারে সামাজিক নির্মাণ— একটি সোশ্যাল কনস্ট্রাক্ট।

ফরাসি দার্শনিক ও নারীবাদী সিমোন দ্য বোভোয়ার বলেছিলেন, “কেউ নারী হয়ে জন্মায় না, নারী হয়ে ওঠে।” এই সত্য পুরুষের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য— কেউ পুরুষ হয়ে জন্মায় না; সমাজই তাকে শাসন, তিরস্কার, পুরস্কার-দণ্ডের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে পুরুষ বানায়। আর এই ‘পুরুষ হয়ে ওঠার’ পথে যে কতটা ত্যাগ, কতটা মানবিক অনুভূতির মৃত্যু, কতটা মানসিক ক্ষত জমতে থাকে— তার হিসেব সমাজ রাখে না। আমরা দেখি শুধু কঠিন বাহিরের আবরণটি; ভেতরের ক্ষত-বিক্ষত মানুষটিকে দেখি না।

এখন যদি এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটু আতশ কাচের নিচে রাখা যায়, দর্শন আর সমাজবিজ্ঞানের নির্মম যুক্তি নিয়ে দেখা যায়— কেন পুরুষরা কাঁদে না? কেন তারা বিশ্বজুড়ে নারীদের তুলনায় তিন গুণ বেশি আত্মহত্যা করে? কেন তারা সহিংসতাকে ক্ষমতার পরিমাপ হিসেবে ধরে নিতে শেখে?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর লুকিয়ে আছে সেই সামাজিক পুরুষত্বের কারখানায়— যেখানে শিশুকাল থেকে ছেলেদের শেখানো হয় শক্ত হওয়া মানেই অনুভূতিহীন হওয়া, কর্তৃত্ব মানেই আক্রমণ, আর সম্মান মানেই আধিপত্য।

এই গভীরতম সমস্যাগুলো বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই অদৃশ্য চিত্রনাট্যের দিকে— যা জন্মের মুহূর্তেই একজন ছেলের সামনে ছুড়ে দেওয়া হয়, এবং যা তার পুরো জীবনের মানসিক পরিমণ্ডলকে রূপ দেয়।

এই পুরুষত্বের কঠোর মানসিকতা এবং অহঙ্কার শুধু পুরুষদেরই আঘাত করে না। এর ফলে নারীর ওপরও বাড়ে বৈষম্য, নিয়ন্ত্রণ, সহিংসতা। যারা ছোটবেলা থেকে শেখে শক্ত হওয়া মানেই কর্তৃত্ব, তারা বড় হয়ে সেই কর্তৃত্বের ভাষা সবার ওপর প্রয়োগ করতে চায়। ফলত, নারীর স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার— সবকিছুই পুরুষদের এই শেখানো শক্তির সামনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সমস্যার মূল আসলে সেই ভুল ধারণা— যে ধারণায় পুরুষ হওয়া মানে কঠোর হওয়া, শক্ত হওয়া, অনুভূতি লুকোনো। এই ধারণাই ছেলেদের মনকে সংকুচিত করে, নারীর জীবনে আনে অসংখ্য বাধা। আমাদের তাই এই পুরোনো চিত্রনাট্য বদলাতে হবে।

পরিবারে, স্কুলে, সমাজে— সব জায়গায় শিশুদের শেখাতে হবে যে মানুষ হওয়া মানে আবেগ থাকা, ভুল হওয়া মানে শেখার সুযোগ, কান্না দুর্বলতা নয়। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে, সকলেরই অধিকার আছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার। মানবিকতা কোনও জেন্ডারের সম্পত্তি নয়।

লিঙ্গের এই সংকীর্ণ খাঁচা ভাঙতে পারলে তবেই আমরা এমন এক সমাজ গড়তে পারব, যেখানে নারী-পুরুষ উভয়ই নিজের মতো করে বড় হতে পারবে, খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিতে পারবে, বাঁচতে পারবে। আর সেটাই হবে আমাদের প্রকৃত অগ্রগতি। চিত্রনাট্য কি বদলে দেওয়া যায় না- হয়ত সময় লাগবে তবুও সম্ভব। পুরুষত্ব নারীত্ব নয় লেখা হোক মনুষত্বের চিত্রনাট্য, আর এটা যদি শুরু করা যায় তা হলে পৃথিবী একদিন হয়ত গার্হস্থ্য হিংসা, পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রদর্শন,  ধর্ষণমুক্ত হবে, বৈষম্যের অন্ধকারে সাম্যের আলোর রেখা দেখা যাবে, সবাই হয়ত তখন একসঙ্গে গাইবে—‘তুমি দেখো নারী-পুরুষ, আমি দেখি শুধুই মানুষ’।

Related Articles