সম্পাদকীয়

Dwijendralal Roy: কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

১৮৭৫ সালে তার কবিতা লেখা শুরু হয়। তার রচিত একশো আটটি সময়ের গান নিয়ে গীতসংকলন আর্যগাথা (১ম) পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়।

এমএ নাসের: আধুনিক বাংলা কাব্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। কাব্য ও সাহিত্য জগতের অস্তিত্ববাদী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবমণ্ডল ও পারিপাশ্বিকতার অপরাজেয় রোমান্টিক আদর্শিত মনীষী। কাব্য ও সংগীত সাধনায় বঙ্গবাসীর মনের মুকুরে চর্চিত বিশেষ ব্যক্তিত্ব। আর তার নাটক তো স্বদেশি মানুষের প্রাণে স্বাদেশিকতার জোয়ার প্রবাহিত করেছিল, তিনি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। বিশিষ্ট কবি, আধুনিক নাটকের অন্যতম স্রষ্টা, সংগীতস্রষ্টা মানুষটি ১৮৬৩ সালের ১৯ জুলাই, ১২৭০ বঙ্গাব্দের ৪ শ্রাবণ পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্মগ্ৰহণ করেন। বাংলাদেশের গোয়াড়ী পৈতৃক আবাস।কৃষ্ণনগরের রাজার অধীনে দেওয়ান পদে তার পিতা চাকরি হেতু চক্রবর্তী থেকে রায় উপাধিতে শোভিত হন। পিতা দেওয়ান কার্তিকেয়চন্দ্র রায়, পিতামহ উমাকান্ত রায়, প্রপিতামহ রাধাকান্ত রায়, তার পিতা মদনমোহন রায় ছিলেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের সেনাপতি। পিতৃব্য মহারাজ শ্রীশচন্দ্র, সতীশচন্দ্র, ক্ষিতীশচন্দ্র দেওয়ান। ভ্রাতা রাজেন্দ্রলাল, দেবেন্দ্রলাল, নরেন্দ্রলাল, সুরেন্দ্রলাল, হরেন্দ্রলাল। মাতা প্রসন্নময়ী দেবী। শৈশবে কৃষ্ণনগরের অ্যাংলো ভার্নাকুলার স্কুলে পাঠচর্চার সূচনা হয়। অতঃপর দূরারোগ্য ম্যালেরিয়া পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে (Dwijendralal Roy)।

আরও পড়ুন: Bloody Body: ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার নিখোঁজ যুবকের রক্তাক্ত দেহ, খুন নাকি আত্মহনন?

১৮৭৫ সালে তার কবিতা লেখা শুরু হয়। তার রচিত একশো আটটি সময়ের গান নিয়ে গীতসংকলন আর্যগাথা (১ম) পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়। ১৮৭৮ সালে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফল হয়ে দশ টাকা বৃত্তি হস্তগত হয়। এরপর কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে এফএ পাশ করেন। পরে হুগলি মহসিন কলেজ থেকে বিএ, ১৮৮৪ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এমএ, ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণির দ্বিতীয় পদ লাভ করেন। অতঃপর মধ্যপ্রদেশের ছাপরায় রাভেলগঞ্জ স্কুলে শিক্ষক পদে আসীন হন। উক্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন ভ্রাতা নরেন্দ্রলাল রায়। ১৮৮৪ সালের এপ্রিল মাসে পরিবারের সকলের অনুমোদনে কৃষিবিদ্যা শিক্ষার জন্য স্টেট স্কলারশিপ-সহ ইংল্যান্ড পাড়ি দেন। ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞতা সম্বলিত বিলেত প্রবাসী নামে ধারাবাহিক সংকলন ‘পতাকা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বিলেতে অবস্থান কালে পিতা-মাতার প্রয়াণ হয়। ১৮৮৬ সালে রয়্যাল এগ্ৰিকালচারাল কলেজ থেকে কৃষিবিদ্যা পাঠ্য শেষ করে এফআরএএস ডিগ্রি গ্ৰহণ করে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন (Dwijendralal Roy)।

১৮৮৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর ছোটলাট প্রদত্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে চাকরিতে নিযুক্ত হন। প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের তনয়া সুরবালা দেবীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দ্বিজেন্দ্রলাল যখন চাকরি সূত্রে শহরে, তখন তার পত্নী সুরবালা দেবীর একটি মৃত সন্তানের জন্ম দিয়ে অকাল মৃত্যু হয়। ইতিপূর্বে দুই সন্তানের শৈশবে ছয় বছর বয়সে মন্টু এবং প্রায় চার বছরে মায়ার মৃত্যু হয়। পুত্র- দিলিপকুমার রায় (১৮৯৭-১৯৮০), কন্যা-মায়াদেবী (১৮৯৮-১৯৭৩)।১৮৯৪ সালে আবগারি দফতরের প্রথম ইন্সপেক্টর পদে চাকরি করেছেন। গয়া থেকে প্রত্যাবর্তন করে দাদা মহাশয় প্রসন্নদাস গোস্বামীর বাসভবনে কিছুকাল অবস্থান করে ২, নম্বর নবকুমার চৌধুরী লেনে ১৮ কাঠা জমির উপর বাড়ি তৈরি করে গৃহপ্রবেশ হয়। বাড়ির নামকরণ হয় ‘সুরধাম’। শারীরিক অসুস্থ হেতু মধুপুরে দ্বিজাশ্রম নামে একটি বাড়ি নির্মাণ করে সুস্থতা কামনায় পরিবারের সকলের সঙ্গে অতিবাহিত করেন। ১৯০৫ সালে কলকাতায় পূর্ণিমা মিলন সাহিত্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ইভনিং ক্লাবের সদস্য ছিলেন। ১৯০৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় পদার্পণ করেন (Dwijendralal Roy)।

এহেন সময় কল্পি অবতার, বিরহ, আষাঢ়ে, ত্র্যহস্পর্শ, প্রায়শ্চিত্ত প্রভৃতি হাস্যরসের প্রহসন শীর্ষক গ্ৰন্থ প্রকাশ হয়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ১৮৮৭ সালে মুজাফফরপুর, ভাগলপুর, মুঙ্গের, ১৮৮৬-৯১ দিনাজপুরে, ১৮৯১-৯৩ বাঁকিপুরে, ১৮৯৪ সালে ঢাকা, ১৮৯৪-৯৮ সালে কলকাতা, ১৮৯৮-১৯০৪ সালে খুলনা, ১৯০৫ সালে বহরমপুর, ১৯০৬ সালে কাঁথি, ১৯০৬-০৮ সালে আলিপুর, ১৯০৯-১২ সালে বাঁকুড়া বদলি হন। উল্লেখযোগ্য গ্ৰন্থমালা-আর্যগাথা, মন্দ্র, আলেখা, ত্রিবেণী, নকশা প্রহসন একঘরে, ত্র্যহস্পর্শ, প্রায়শ্চিত্ত, পুনজন্ম, সীতা, ভীস্ম, সামাজিক নাটক- সিংহল বিজয়, দুর্গাদাস, সোরাব রুস্তম, তারাবাই, পরপারে, বঙ্গনারী, রাণা প্রতাপ সিংহ, মেবার পতন, নুরজাহান, শাজাহান, চন্দ্রগুপ্ত প্রভৃতি। নুরজাহানকে নিয়ে যে সব উপন্যাস, নাটক, কাব্য লেখা হয়েছে, তা হল হরকুমার ভট্টাচাৰ্য-নুরজাহান (উপন্যাস-১৮৯৯), বিপিন বিহারী ঘোষ-নুরজাহান (উপন্যাস-১৯১২), সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত- কবর-ই-নুরজাহান (কবিতা-১৯১৩), হরিনারায়ণ ঘোষ-নুরজাহান(কবিতা-১৯১৩), মোহিতলাল মজুমদার-নুরজাহান (নাট্যকবিতা)।

Truth of Bengal fb page: https://www.facebook.com/share/1ADtx3ZZeU/

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিশেষ কাব্যমন্দ্র সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রশংসা কলেবরে মত ব্যক্ত করেছেন, ‘মন্দ্র কাব্যখানি বাংলার কাব্য সাহিত্যকে অপরূপ বৈচিত্র্য দান করিয়াছে। ইহা নুতনতায় ঝলমল করিতেছে এবং এইকাব্যে যে ক্ষমতা প্রকাশ পাইয়াছে, তাহা অবলীলাকৃত ও তাহার মধ্যে সর্বত্র প্রবল আত্মবিশ্বাসের একটি অবাধ সাহস বিরাজ করিতেছে। সে সাহস কী শব্দ নির্বাচনে, কী ছন্দ রচনায়, কী ভাব বিন্যাসে সর্বত্র অক্ষুণ্ণ।’ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জিত হয়। রবীন্দ্র যুগে বাংলা কাব্য সংগীতে বিভিন্ন ধারা প্রয়োগ ও আধুনিক গান রচনা করেন। বিভিন্ন বিষয়ে তিনি প্রায় পাঁচশত গান রচনা করেছেন। তা দ্বিজেন্দ্রগীতি নামে সুপরিচিত। কবি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ, বন্ধু বৎসল, পরোপকারী, অভিমানী, মহাপ্রাণ, উদারচেতা, জ্ঞানী, শাস্ত্রবিশারদ, ধার্মিক, মাধুরী, উদার প্রকৃতির একজন স্বভাবের মানুষ। খ্যাতনামা গীতিকার, নাট্যকার, কবি ১৯১৩ সালের ১৭ মে কলকাতায় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের অকাল প্রয়াণ হয় (Dwijendralal Roy)।

Related Articles