সম্পাদকীয়

অক্লান্তকণ্ঠ এক সঙ্গীত-সন্ন্যাসী অতুলপ্রসাদ সেন

কলকাতার হেয়ার স্কুল, প্রেসিডেন্সি কলেজ ও পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ডের লন্ডন ইন কোর্টে গিয়ে তিনি আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।

ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী: উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের সূচনালগ্নে বাংলা সঙ্গীতজগৎ এক নবজাগরণের সাক্ষী হয়। এই সময়েই জন্ম নিয়েছিলেন এমন সব প্রতিভা, যাঁরা বাংলা গানকে আধুনিকতার পথে এগিয়ে নিয়ে যান। অতুলপ্রসাদ সেন তাঁদেরই অন্যতম। তিনি কেবল গীতিকার বা সুরকার নন— তিনি ছিলেন সঙ্গীতদর্শনে সমৃদ্ধ এক সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব, যাঁর গানে দেশপ্রেম, মানবিকতা, ভক্তি, ব্যক্তিগত আবেগ এবং দার্শনিক অনুরণন সুচারুভাবে মিশে আছে। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গান বাংলা কীর্তনের ঢঙ থেকে শুরু করে ঠুমরি ও ভজনের আঙ্গিককে আত্মস্থ করেছে, আবার তাতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ছায়াও স্পষ্ট।

অতুলপ্রসাদ সেন ১৮৭১ সালের ২০ অক্টোবর বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা পরশুরাম সেন ছিলেন শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি এবং মা হেমলতা দেবী গভীর ধর্মভাবাপন্না ও সঙ্গীতরসিক। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে গানবাজনার অনুকূল পরিবেশ ছিল তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠার অন্যতম প্রেরণা।

কলকাতার হেয়ার স্কুল, প্রেসিডেন্সি কলেজ ও পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ডের লন্ডন ইন কোর্টে গিয়ে তিনি আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। শিক্ষার সুবাদে তিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সঙ্গেও পরিচিত হন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর গানের সুরের বৈচিত্র্যে প্রভাব ফেলেছিল। লন্ডনে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হওয়ায় সঙ্গীতভাবনার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়।

তিনি বাঙালির পঞ্চকবির অন্যতম একজন। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সঙ্গীতের একজন পথিকৃৎ তিনি। অতুলপ্রসাদ একাধারে কবি, গীতিকার এবং গায়ক হিসেবে সর্বজন সমাদৃত। তবে বাংলাভাষীদের কাছে অতুলপ্রসাদ সেন একজন সঙ্গীতজ্ঞ ও সুরকার হিসেবেই বেশি পরিচিত। ব্রিটিশ ভারতবর্ষে অতুলপ্রসাদ তাঁর সমগ্র জীবনের উপার্জিত অর্থেরও বৃহৎ অংশ স্থানীয় জনকল্যাণে ব্যয় করেন। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে, ১৮৬১ থেকে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কালপর্বে বাঙালি পেয়েছে চার জন কিংবদন্তি সুরসাধককে— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন এবং অতুলপ্রসাদ সেন। কাজী নজরুলের আগমন আরও প্রায় তিন দশক পরে। বাংলা গানের জগতে তিনি এক বিশেষ রীতির প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি যে সব গানে সুর দিয়েছেন তা অতুলপ্রসাদী সুর নামে সুখ্যাত।

গানের সংখ্যায় তিনি বাকি তিন জনের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে। কিন্তু তাঁর সঙ্গীতকীর্তির অনন্য অন্তর্লীন মায়া তাঁকে সকলের চেয়ে আলাদা করে দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর আশি বছরের জীবনকালে লিখেছেন প্রায় দু’হাজার গান, পঞ্চাশ বছরের জীবনে ৫০০টি গান লিখেছেন দ্বিজেন্দ্রলাল, এর মধ্যে বেশির ভাগ নাটকের গান। স্বল্পায়ু রজনীকান্ত সেনের মোটামুটি ২৯০টি গানের হিসেব পাওয়া যায়। আর তেষট্টি বছরের পার্থিব জীবনে অতুলপ্রসাদ লিখেছেন সাকুল্যে ২০৮টি গান। তাও বাংলার বাইরে বসে, ব্যস্ত কর্মজীবনের ফাঁক-ফোকরে। তিনি বাংলা গানের সুরপ্রকরণে নতুনত্ব আনেন। রবীন্দ্রনাথের গান যেখানে রাগাশ্রিত কিছু স্বাধীন রূপ গ্রহণ করে, সেখানে অতুলপ্রসাদ উত্তরভারতীয় সাবেক ঠুমরি, দাদরা, কীর্তন ও লালনধর্মী সুরের উপর নির্ভর করেছিলেন। তাঁর সুরে টান থাকে, আবার বিন্যাসে অনায়াস প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়। তিনি শব্দচয়ন অনুযায়ী সুর বাঁধতেন; ফলত মাত্রা ও তাল জ্ঞান ছিল অনবদ্য। অতুলপ্রসাদ সেন  আত্মজীবনী লিখে যাননি। ব্রাহ্ম পরিবারের ছেলে অতুলপ্রসাদ কৈশোরে পিতৃহীন হয়ে সান্নিধ্য পেয়েছিলেন মাতামহ কালীমোহন গুপ্তের, সে যুগের বিখ্যাত গীতিকার ও গায়ক। বাবা রামপ্রসাদ সেনও ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ। অতুলপ্রসাদের চেতনায় গান এসেছিল সেই সূত্রে। মামাতো বোন, বিখ্যাত গায়িকা সাহানা দেবীর কথা অনুযায়ী, অতুলপ্রসাদ প্রথম গান লেখেন চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সে। গানটি ছিল ‘তোমারি উদ্যানে তোমারি যতনে উঠিল কুসুম ফুটিয়া’। প্রথম যৌবনে কঠিন আঘাত পেয়েছিলেন মায়ের কাছে। তেতাল্লিশ বছরের বিধবা মা হেমন্তশশী বিয়ে করলেন ব্রাহ্ম নেতা দুর্গামোহন দাশকে। অভিমানী অতুলপ্রসাদ ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে বিলেত গেলেন ব্যারিস্টারি পড়তে। সেখানে থাকাকালীন বড়মামা কৃষ্ণগোবিন্দ গুপ্ত সেখানে যান। অতুলপ্রসাদ প্রেমে পড়লেন মামাতো বোন, সুন্দরী, সুগায়িকা হেমকুসুমের। সমাজ-নিষিদ্ধ সম্পর্কে বিয়ের জন্য প্রতিবন্ধকতা এল যথেষ্ট। অতুলপ্রসাদ তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন। আইনজ্ঞ অতুলপ্রসাদ তাঁর কর্মগুরু সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহের পরামর্শক্রমে স্কটল্যান্ড চলে যান। সেখানকার আইনে এরকম বিয়েতে বাধা ছিল না।

সেখানে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে মামাতো বোন হেমকুসুমকে বিয়ে করেন অতুলপ্রসাদ। বিলেতবাসে ভাগ্যের সহায়তা মেলেনি। সেখানে পসার জমাতে পারেননি অতুলপ্রসাদ। তীব্র অর্থকষ্ট হয়ে ওঠে নিত্যসঙ্গী। সেখানে তাঁদের দু’টি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়, যাদের মধ্যে এক জন খুব কমবয়সেই মারা যায়। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে জীবিত পুত্রকে নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন অতুলপ্রসাদ। তখন আত্মীয়-স্বজন কেউ তাঁদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি। সেখান থেকে লখনউ চলে যান তাঁরা। এই পর্বে দ্বিতীয় স্বামী দুর্গামোহনের মৃত্যুর পর তাঁদের সংসারে ফিরে আসেন অতুলপ্রসাদের মা হেমন্তশশী। শাশুড়ি হিসেবে তিনি ছিলেন বধূকণ্টকি প্রকৃতির। শাশুড়ি-বউমার তীব্র বিসম্বাদ নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে ওঠে। হেমন্তশশী ও হেমকুসুমের দ্বন্দ্ব মেটেনি কখনও। হেমন্তশশীর মৃত্যুর পর ঘরে তাঁর ছবি টাঙানো ছিল। তা সরিয়ে ফেলার দাবি তোলেন হেমকুসুম। মায়ের ছবিকে অসম্মান করতে নারাজ হলেন অতুলপ্রসাদ। তীব্র বিরাগে হেমকুসুম চিরকালের জন্য স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে যান, আর কখনও ফেরেননি। পারিবারিক সংঘাতে দীর্ণ অতুলপ্রসাদকে মেনে নিতে হল ব্যর্থ দাম্পত্যের অভিশপ্ত জীবন। স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করা হল না। প্রিয়-বিরহের পথ ধরে জীবনে গান এল আরও প্রবল ভাবে। গান হয়ে উঠল তাঁর নিত্য সহচর। অন্তর-মথিত করা অব্যক্ত এক বেদনা হয়ে উঠল তাঁর গানের আধার। মাত্র ২০৮টি গানের সম্পদ দিয়ে শান্ত, নিরহঙ্কার মানুষটি বাংলা গানের ভুবনকে দিয়ে গেছেন অপার ঐশ্বর্য। প্রকৃতির গান, স্বদেশচেতনার গান, ঈশ্বর-নিবেদিত সঙ্গীত, প্রেমগীতি এবং বিবিধ— এ ভাবেই স্বচ্ছন্দে তাঁর গানের বিষয় বিভাজন করা যায়। গানের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের মতো গোছানো মানুষ ছিলেন না অতুলপ্রসাদ। তাই আসরে তাঁর গান গাওয়া হলে অনেকেই ভুল করে ভাবতেন রবীন্দ্রগান। লাজুক গীতিকবির জন্য স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম গ্রন্থিত হল তাঁর ‘কয়েকটি গান’।

পরে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে ‘গীতিগুঞ্জ’, আরও পরে স্বরলিপিসমৃদ্ধ ‘কাকলি’। বছরখানেকের বিরতি বাদ দিলে ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে থেকে আমৃত্যু অতুলপ্রসাদ ছিলেন লখনউয়ের মানুষ। সেই সুবাদে উত্তরপ্রদেশের সঙ্গীত-সংস্কৃতি উজাড় করে ঢেলে দিয়েছেন তাঁর গানে। বাংলা গানে ঠুংরি, গজলের আমদানি মূলত তাঁর হাত ধরে। বাংলা কথাচিত্রে গজলের মধুর-করুণ রসের স্বাদ বাঙালি এর আগে পায়নি। এ ধারায় উল্লেখ করার মতো গান— ‘ভাঙ্গা দেউলে মোর কে আইলে এলো হাতে’, ‘কে তুমি ঘুম ভাঙালে’, ‘তব অন্তর এত মন্থর’, ‘ক্রন্দসী পথচারিণী’ ইত্যাদি। ঠুংরি-ঘরানার গান ‘শ্রাবণ-ঝুলাতে বাদল রাতে আয় কে গো ঝুলিবি আয়’ অথবা কাফি-খাম্বাজের মিশ্রণে ঠুংরি চালের ‘বাদল ঝুম ঝুম বোলে’ বা ‘বধূ ধরো ধরো মালা পরো গলে’-র মতো সব আসর জমানো গান। গীতিকবিতায় উত্তরপ্রদেশের লোকগান, যেমন কাজরি, লাউনি ইত্যাদির সার্থক প্রয়োগ করে গানের মধ্যে সুরবৈচিত্র এনেছেন। লাউনি ছাদের গান ‘কে গো গাহিলে পথে’ আর ‘কেন এলে মোর ঘরে’ শ্রোতাদের বরাবর মন্ত্রমুগ্ধ করেছে। কাজরি চলনের একটি গান ‘জল বলে চল, মোর সাথে চল’ অতুলপ্রসাদি গায়ক-গায়িকাদের অন্যতম পছন্দের গান। গানের স্রোতে ভেসে বাংলা গানে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন খেয়াল, দাদরা নানা ধরনের হিন্দুস্থানি রাগপ্রধান গানের, তারই ফলশ্রুতি ‘সে ডাকে আমারে’, ‘যাব না যাব না ঘরে’, ‘আমার বাগানে এত ফুল’ প্রভৃতি গান। তাঁর গানে মুগ্ধ হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধি থেকে শুরু করে সমকালের শাস্ত্রীয়-সঙ্গীতের বহু সুরসাধক।

জীবনের বেশির ভাগ সময় বাংলার বাইরে থেকেও ভোলেননি দেশজ বাউল-কীর্তন, ভাটিয়ালি গান। বাউল গান রচনায় সিদ্ধহস্ত লিখলেন, ‘আর কতকাল থাকব বসে’ অথবা ‘মনরে আমার তুই শুধু বেয়ে যা দাঁড়’। আবার কীর্তনধারার গানেও বিলিতি ব্যারিস্টার সমান স্বচ্ছন্দ। এ তালিকায় স্মরণ করা যেতেই পারে ‘যদি তোর হৃদযমুনা হল রে উছল ভোলা’ কিংবা ‘ওগো সাথী মম সাথী’-র মতো আকুল করা গান। ধ্রুপদাঙ্গের গান তুলনায় কম রচনা করলেও তার ঐশ্বর্য বড় কম নয়, এ রকমই একটি গান ‘ক্ষমিও হে শিব আর না কহিব, দুঃখ বিপদে ব্যর্থ জীবন মম’। গত শতকের অনেক চলচ্চিত্রে সার্থক ভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল তাঁর গান। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখ দাবি করে ‘একা মোর গানের তরী ভাসিয়েছিলেম নয়নজলে’ গানটি। নিজের গানে বেশি ওস্তাদি তান-ঢং লাগানো পছন্দ করতেন না। তরুণ পাহাড়ি সান্যালকে এই কারণে বহু বার নিষেধও করেছিলেন। গান রচনা করতে পারতেন যে কোনও পরিবেশে, আদালতে কাজের ফাঁকে দিব্যি লিখেছেন, ‘ওগো আমার নবীন শাখী’-র মতো প্রেমের গান। রবীন্দ্রযুগে বাস করে, রবি-অনুরাগী হয়েও তাঁর গান ছিল রবীন্দ্র  প্রভাবমুক্ত। রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যে অতুলপ্রসাদ লিখেছেন দু’টি বিশেষ গান, ‘প্রভাতে যারে নন্দে পাখি’ এবং ‘জয়তু জয়তু কবি’।

বিশিষ্ট আইনজীবী এবং অবসরে সুরসাধক— এটুকু বললে, অতুলপ্রসাদের ব্যাপকতর পরিচয় প্রকাশিত হয় না। নিজের প্রবাসী পরিচয় মিথ্যে করতে বার বার তাঁর কলমে, সুরে তুলে এনেছেন মনকাড়া দেশাত্মবোধক গান ‘বলো বলো সবে’, ‘প্রবাসী চল রে দেশে চল’। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের ভাষাকেন্দ্রিক মুক্তিযুদ্ধের যোদ্ধাদের অন্যতম প্রাণের গান হয়ে উঠেছিল ‘মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা’। বাংলা ভাষা আর স্বদেশ, এই দুইয়ের ওপর তাঁর ছিল নাড়ির টান। প্রথম যৌবনে ভেনিসে গন্ডোলা-চালকের গানের সুরে মোহিত অতুলপ্রসাদ স্বদেশের কথা ভেবে লিখলেন কালজয়ী গান ‘উঠ গো ভারতলক্ষ্মী’। প্রবাসে বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে গড়ে তুললেন ‘নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মিলন’, প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হয়ে সম্মিলনের মুখপত্র ‘উত্তরা’ প্রকাশে তাঁর ভূমিকা হল সর্বার্থেই বিশিষ্ট। উর্দুচর্চার পীঠস্থান উত্তরপ্রদেশ, বিশেষ করে লখনউয়ের বহু স্কুলে বাংলা ভাষা শেখানোর জন্য দানের ঝুলি উপুড় করে দিলেন। বেহাগ, সিন্ধু, কাফি, পিলু, ভৈরবী, সাহানা, হাম্বীর, আশাবরী অজস্র হিন্দুস্থানি রাগের আধারে রচিত গানের ভেতর দিয়ে সুরসাধক অতুলপ্রসাদের চির-বৈরাগী, ঈশ্বর-সমর্পিত মনটিকে স্পষ্ট চিনে নেওয়া যায়। বাস্তবেও তাঁর সমকালের মানুষ চিনতে ভুল করেননি গুণী মানুষের সঙ্গকাঙাল, উদারচিত্ত, বন্ধুবৎসল ব্যারিস্টার সেনসাহেবকে।

সঙ্গীত-সমালোচকরা বলেন, অতুলপ্রসাদের প্রধান শক্তি হল তাঁর অভিব্যক্তি ও আবেগ। ভাষায় সরলতা, সংক্ষেপ, সুরে ধীরে উন্মোচন ও ধরে রাখার ক্ষমতা তাঁকে শ্রোতাদের মনে স্থান করে দিয়েছে। যদিও তাঁর গান ও সুররীতি রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের মতো ব্যাপক প্রসার পায়নি, তথাপি সঙ্গীতবিদদের মতে তাঁর সৃষ্টিকেই আধুনিক বাংলা গানের অন্যতম ভিত্তি বলা চলে।

এখনও তাঁর গান বহু বরেণ্য শিল্পী পরিবেশন করেন। ভক্তিগীতি ও দেশাত্মবোধক গানের ক্ষেত্রে তাঁর গানকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। শিক্ষাক্রমে, সঙ্গীতজ্ঞদের পাঠ্যতালিকায় ও অল ইন্ডিয়া রেডিও-সহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর গান স্থান পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সঙ্গীতবিদ্যালয়ে তাঁর গান প্রশিক্ষণের অঙ্গ।

তাঁর মৃত্যুর খবরে স্তম্ভিত রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “তিনি এক সুরলোক থেকে অন্য সুরলোকে গমন করেছেন।” সেই সঙ্গে অসঙ্কোচে অতুলপ্রসাদের মানব-হিতৈষণার পরিচয় দিয়েছেন কবিতায়— ‘ছিল তব অবিরত/ হৃদয়ের সদাব্রত/ বঞ্চিত করোনি কভু কারে/ তোমার উদার মুক্ত দ্বারে…’। লখনউ শহরের সারস্বত-সমাজ জানত, বিলেতফেরত ব্যারিস্টার সেন সাহেবের মনের তারগুলো বড় মমতায় বাঁধা। দেশের মাটিতে, দেশের দরিদ্র, অসহায় মানুষের সেবায় ভালবেসে অকাতরে দানধ্যান ছিল তাঁর জীবনব্রত। সেই সাধনার কথাই সহজিয়া ভঙ্গিতে বলে গেছেন তাঁর গানে— ‘সবারে বাসরে ভালো, নইলে মনের কালো ঘুচবে না রে’।

১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ২৬ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর পর চিতাভস্মের কিছু অংশ বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হয়। ঢাকা সাব-ডিভিশনের গাজিপুর জেলায় কাউরাইদ গ্রামে, সুতিয়া নদীর তীরে এক ব্রাহ্মমন্দির সংলগ্ন সমাধিস্থলে সমাহিত হয় চিতাভস্ম। স্মৃতিফলকে লেখা হয়েছিল বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালবাসার কথা, ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা।’ অতুলপ্রসাদের মাতামহ ভাওয়ালের জমিদার কালীনারায়ণ গুপ্তর কাছারি বাড়ি ছিল কাউরাইদ গ্রামে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাক সেনা আক্রমণে সে ফলক চূর্ণ হয়ে গেলে পরবর্তী পর্যায়ে নতুন ফলকে এল অন্য গানের কথাচিত্র, ‘আমার যে শূন্য ডালা তুমি ভরিও/ শুধু তুমি যে শিব তাহা বুঝিতে দিও’।

অতুলপ্রসাদ সেন বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর গানে ব্যক্তিমানস, সমাজচেতনা এবং সাংস্কৃতিক উন্মেষ অনবদ্যভাবে মিশেছে। তিনি ভক্তি ও ভজনকে বাংলার নিজস্ব সুরমূলে পুনঃস্থাপন করেছেন; দেশাত্মবোধকে সুরমূর্তির মাধ্যমে উচ্চারণ করেছেন; প্রেম, বেদনা ও জীবনের গূঢ় অনুভবকে সহজ ভাষায় উন্মোচিত করেছেন। তাঁর সুরের বৈচিত্র্য ও গানের ভাবগভীরতা আজও বাংলা সঙ্গীতের অনন্য ঐতিহ্য।

বাংলা গানের তিন মহান ধারকের মধ্যে তিনি এক বিশেষ স্তম্ভ। তাঁর গানের আবেগময়তা ও সুরের মানবিক আবেদন বাঙালি সঙ্গীতরসিকের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে। তিনি শুধু একজন সঙ্গীতকার নন, তিনি বাংলা জাতিসত্তার একান্ত অন্তর্নিহিত স্বর।