রাজ্যের খবর

মহাপ্লাবন, বর্গী হামলা, পলাশির যুদ্ধ থেকে মন্বন্তর সাধক রামপ্রসাদ অনেক ইতিহাসের স্বাক্ষী

From the great flood, the barbaric attack, to the battle of Plassey, Manvantar Sadhak Ramprasad is a witness to much history

Truth Of Bengal: স্বপন কুমার দাস: মাতৃসাধক রামপ্রসাদ মায়ের দর্শণের পাশাপাশি দেখেছিলেন মহাপ্লাবন, বর্গী হামলা, পলাশীর যুদ্ধ থেকে মন্বন্তর যা তার কাব্যে ফুটে উঠেছিল। সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন অষ্টাদশ শতকের আনুমানিক দ্বিতীয় দশকে হালিশহর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবনের বিস্তৃত কাহিনী জানবার উপায় নেই। রামপ্রসাদ সেনের জন্ম ও মৃত্যু সাল নিয়ে মতান্তর রয়েছে। যদিও অনেকেই মনে করেন ১৭১৮-এর ১৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম হয়েছিল। ঠাকুরদা রামেশ্বর সেন ও বাবা রামরাম সেন দু’জনেই ছিলেন চিকিৎসক। তৎকালীন কুমারহট্টে (হালিসহর) তাঁদের ভাল নামডাক ছিল। রামপ্রসাদের মায়ের নাম সিদ্ধেশ্বরী দেবী। তিনি সাধক-কবি বলেই পরিচিত। মাতৃসাধনার পাশাপাশি তিনি বাংলা গানের এক নতুন ধারার স্রষ্টা। আবার বাংলা সাহিত্যে তিনি একটা নাম। তাঁর গানের ভক্তিরসের অভূতপূর্ব আবেদনে শ্মশানবাসিনী কালী প্রবেশ করলেন বাঙালির ঘরে ঘরে।

করালবদনী হয়ে উঠলেন আদরিনী শ্যামা। তিনি শুধুমাত্র কালীসাধক নন, এক যুগসন্ধিক্ষণের সমাজ সচেতক এক কবিও। রামপ্রসাদ সেন মাটির মূর্তি গড়ে কালী পুজো করলেও অনেকেই মনে করেন তিনি ছিলেন নিরাকারে বিশ্বাসী ও একেশ্বরবাদী। তার প্রমাণও মেলে তাঁর কাব্যে— ‘ভবানী শঙ্কর বিষ্ণু এক ব্রহ্ম তিনভেদ করে সেই মূঢ় জন প্রজ্ঞা হীন।’ ঈশ্বরের মতো নিরাকার না হলেও যারা ছিলেন মানব রুপী ঈশ্বর, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাধক রামপ্রসাদ। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেব বা বামা ক্ষ্যাপার মতোই তিনি ছিলেন মা কালীর অন্ধ ভক্ত। ভক্ত বললে ভুল বলা হবে, কালী মায়ের স্নেহের ছেলে ছিলেন তিনি। বাংলা ভাষায় দেবী কালীর উদ্দেশ্যে ভক্তিগীতি রচনার জন্য তিনি সমধিক পরিচিত। তার রচিত “রামপ্রসাদী” গানগুলি এখনও বেশ জনপ্রিয়।

রামপ্রসাদ সেনই প্রথম কবি যিনি এই প্রকার গভীর ভক্তিসহকারে দেবী কালীর লীলাকীর্তন গান রচনা করেন। তার গানেই প্রথম কালীকে স্নেহময়ী মাতা এমনকি ছোটো মেয়ের রূপেও দেখা যায়। তার পরে একাধিক শাক্ত কবি এই কালীভক্তি প্রথাটিকে উজ্জীবিত করে রাখেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হলেন রামপ্রসাদ সেন। তিনিই বাংলায় ভক্তিবাদী শাক্তধর্ম ও দেবী কালীর লীলাকীর্তন শ্যামাসংগীতের ধারাটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। কালীপূজার সময় তাঁর গানগুলি নিয়মিত গাওয়া হয়। তাঁর গান আজও বাংলার পথেঘাটে আবালবৃদ্ধবণিতা, ব্যবসায়ী, পণ্ডিত, নিরক্ষর, সন্ন্যাসী, গৃহস্থ ও যুবকেরা তাঁর গান গেয়ে থাকেন। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, পান্নালাল ভট্টাচার্য, রামকুমার চট্টোপাধ্যায়, অজয় চক্রবর্তী প্রমুখ শিল্পীরা রামপ্রসাদী গানের বিশিষ্ট গায়ক। আজও এই গানের সহজ সরল সুরে মুগ্ধ হয়ে অনেকে অশ্রুবিসর্জন করে থাকেন।

ঊনবিংশ শতাব্দীর সাধন জগতে বিপ্লব এনেছিলেন শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস প্রায়শই রামপ্রসাদী গান গাইতেন। রামপ্রসাদ ছিলেন তার প্রিয় কবি। তার গাওয়া রামপ্রসাদীগুলি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত গ্রন্থে মুদ্রিত হয়েছে। এই গ্রন্থে লেখা আছে, ‘…তিনি (রামকৃষ্ণ) ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিবাহিত করতেন কমলাকান্ত ও রামপ্রসাদের লেখা দিব্যজননীর লীলাসঙ্গীত গেয়ে। এই আনন্দময় গানগুলি ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ ভাবের বর্ণনাকারী… “পরমহংস যোগানন্দও রামপ্রসাদ ও তাঁর ভক্তিগীতির গুণগ্রাহী ছিলেন। তিনিও প্রায়ই এই গানগুলি গাইতেন। ভগিনী নিবেদিতা রামপ্রসাদ সেনের সঙ্গে ইংরেজ কবি উইলিয়াম ব্লেকের তুলনা করেন। রামপ্রসাদ যে সময়ের মানুষ সেই সময়টা নানা কারণেই ঘটনাবহুল। সমাজে এসেছিল নানা বিপর্যয় এবং পরিবর্তন।

১৭৩৯-এর মহাপ্লাবন, ১৭৪২ এবং ১৭৫২-এর বর্গী হানা, ১৭৫৭-এর পলাশির যুদ্ধ আর ১৭৬৯-এর মন্বন্তর। এ সবের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছিল বাংলার কৃষি জীবন ও সাধারণ মানুষের উপর। এমনই এক সময় রামপ্রসাদের গান হয়ে উঠেছিল মানুষের বড় একটা আশ্রয়। সমাজে প্রচলিত নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন রামপ্রসাদ। রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রোধ করার বহু আগেই রামপ্রসাদ সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে বলেছিলেন, ‘নহে শাস্ত্রসমত্বা সমত্বা সহমৃতা।’ রামপ্রসাদ সেন মাটির মূর্তি গড়ে কালী পুজো করলেও অনেকেই মনে করেন তিনি ছিলেন নিরাকারে বিশ্বাসী ও একেশ্বরবাদী। তার প্রমাণও মেলে তাঁর কাব্যে— ‘ভবানী শঙ্কর বিষ্ণু এক ব্রহ্ম তিনভেদ করে সেই মূঢ় জন প্রজ্ঞা হীন।’

শাক্ত কবিদের মধ্যে কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ সেন যে সর্বাধিক জনপ্রিয়, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাঁর জনপ্রিয়তার পেছনে কাব্যোৎকর্ষই একমাত্র কারণ নয়। শাক্ত পদাবলীর প্রথম প্রবর্তক রামপ্রসাদ তার জনপ্রিয়তার এটি একটি মুখ্য কারণ। শাক্ত পদাবলীর একটি নামান্তর প্রসাদী সঙ্গীত’— বলা বাহুল্য রামপ্রসাদের নামের সঙ্গেই এটি যুক্ত হয়ে আছে। ‘ভক্তের আকুতি’ এবং জগজ্জননীর রূপ’ অর্থাৎ উপাস্য-উপাসনা তত্ত্বের কথা যাবতীয় সাধনতত্ত্বের পদ রচনার পদপ্রদর্শক সাধক কবি রামপ্রসাদ সাধনার ভাবে তিনি আত্মসমাহিত, সম্ভবত তিনি সাধনার সর্বোচ্চ স্তরেই উপনীত হয়েছিলেন— ফলে উপাস্যা দেবীর সঙ্গে তার বেলায় সম্বন্ধ যতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, তেমনটি অপর কোনো কবির বেলায়ই হয়নি। কবিবর ঈশ্বর গুপ্ত ১৮৩৩ খ্রিঃ রামপ্রসাদের জীবনী এবং তার রচিত ‘কালীকীর্তন’ প্রকাশ করায় শিক্ষিত সমাজে তিনি অপর শাক্ত কবিদের তুলনায় অনেক আগেই পরিচিতি লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন।

এ সমস্ত কারণ ছাড়াও যে কারণে রামপ্রসাদ বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, সে বিষয়ে ডঃ অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন– “সারা দেশে রামপ্রসাদের জনপ্রিয়তার একটা কারণ বাস্তব দুঃখকে তিনি বৈষ্ণব পদাবলীর মতো সূক্ষ্ম রসে পরিণত করেন নাই; তাহাকে স্বীকার করিয়া তাহা হইতে মুক্তির পথ খুঁজিয়াছেন। দুঃখবেদনা হইতে পলায়ন নহে, তাহার দ্বারা আচ্ছন্ন হইয়াও নহে— আদ্যাশক্তির কৃপায় কবি সমস্ত সুখ-দুঃখ ত্যাগ করিয়া মুক্তির পথ খুঁজিয়াছেন। কবি দুঃখের আঘাতে আরও নিবিড় করিয়া জননীকে চিনিয়া লইয়াছেন।

কবি দেখিয়াছেন, দুঃখ হইতে পরিত্রাণের পথ শ্যামার চরণে আশ্রয় গ্রহণ । তদানীস্তন কুশাসন, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, নিত্য দারিদ্র্য— ইহা হইতে মুক্তির পথ কোথায়? সেই পথই রামপ্রসাদ দেখাইয়াছেন। কাজেই তার গানের মধ্যে দুঃখবেদনার কথা থাকিলেও সেই দুঃখবেদনা প্রসাদী সঙ্গীতে ফলশ্রুতি নহে—বাস্তব দুঃখ হইতে সাধনার চিদানন্দময়লোকে উত্তরণই কবির অভিপ্রেত সাধারণ গৃহী মানুষ ইহা হইতে আশার আলোক লাভ করিয়াছে, মুমুক্ষু ইহা হইতে মুক্তি মোক্ষের এষণা লাভ করিয়াছে, লীলারসিক এই সমস্ত গানে মাতাপুত্রের বাৎসল্য রসের সম্পর্ক দেখিয়া তৃপ্ত হইয়াছে। এইজন্যই বাঙালী রামপ্রসাদের পদাবলী জড়াইয়া গিয়াছে।

বাংলার ঘরে ঘরে রামপ্রসাদ-সম্পর্কিত নানান কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। এগুলির মধ্যে রামপ্রসাদের বেড়া বাঁধার গল্পটি বেশ জনপ্রিয়। এই কাহিনি অনুসারে, রামপ্রসাদ একদিন বাড়ির সামনে বেড়া বাঁধছিলেন, সাহায্য করছিল তাঁর ছোট্ট মেয়ে। এক সময় মেয়েটি সেখান থেকে উঠে চলে যায় বাবার অগোচরে। রামপ্রসাদ একমনে বেড়া বেঁধে যান এবং তাঁর হাতে কেউ যেন দড়ি ধরিয়ে দেয়। কিছুটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর যখন মেয়ে এসে বলে, বাবা তোমাকে কে দড়ি ধরিয়ে দিচ্ছিল? তখন রামপ্রসাদ বুঝতে পারেন এতক্ষণ তাঁর মেয়ে নয়, কাজে সাহায্য করছিলেন স্বয়ং শ্যামা মা।

একদিন স্নানে যাচ্ছিলেন রামপ্রসাদ। হঠাৎ করেই রামপ্রসাদের গান শুনতে আসে এক অল্প বয়সী সুন্দরী মেয়ে। রামপ্রসাদও মনের আনন্দে তাঁকে অপেক্ষা করতে বলেন। কিন্তু স্নান করে এসে তিনি দেখেন সেই রমণী নেই, বদলে চন্ডী মন্ডপের দেওয়ালে লেখা – ‘আমি অন্নপূর্ণা, তোমার গান শুনতে এসেছিলাম।’ এই ঘটনার পর এক স্বপ্নাদেশ পেয়ে ত্রিবেনীর কাছে মহামায়াকে গান শুনিয়ে আসেন রামপ্রসাদ। কিংবদন্তি হল বারাণসী যাত্রাকালে রামপ্রসাদের দেবী অন্নপূর্ণার দর্শন লাভ। একবার তিনি গঙ্গাস্নান সেরে নিত্যপূজার কাজে চলেছেন, এমন সময় একটি সুন্দরী মেয়ে তার কাছে গান শোনার আবদার ধরে। পূজার দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে রামপ্রসাদ মেয়েটিকে একটু অপেক্ষা করতে বলেন। কিন্তু পরে ফিরে এসে তাকে আর দেখতে পান না।

পরে তিনি ধ্যানে এক দিব্যজ্যোতি দর্শন করেন এবং দেবীর কণ্ঠস্বর শোনেন, “আমি অন্নপূর্ণা, আমি বারাণসী থেকে তোর গান শুনতে এসেছিলাম। কিন্তু হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছি।” রামপ্রসাদ নিজের উপর ক্রুদ্ধ হন। তখনই দেবী অন্নপূর্ণাকে গান শোনাবার মানসে কাশীধামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু ত্রিবেণী সংগমে এসে তার পুনরায় দিব্যজ্যোতি দর্শন হয়। দেবীর কণ্ঠে তিনি শুনতে পান, “এখানেই আমাকে গান শোনা। বারাণসীই আমার একমাত্র নিবাস নয়, আমি সমগ্র জগৎ চরাচরে অবস্থান করি।” এই ঘটনাটি রামপ্রসাদের জীবনের শেষ ঘটনা। প্রতি বছরের মতো সেবারও কালীপুজোয় মত্ত ছিলেন রামপ্রসাদ। মূর্তি বিসর্জন করার সময় আচমকাই গান করতে শুরু করেন রামপ্রসাদ। মায়ের গলা জড়িয়ে পরপর চারটি গান শোনান প্রসাদ। শেষ গানটি গাওয়ার সময় আচমকাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে মহামায়ার সঙ্গেই ইহলোক ছেড়ে পরলোক গমন করেন তিনি।

একটি কিংবদন্তি অনুসারে এক বার কলকাতা থেকে হাঁটা পথে হালিশহর ফেরার পথে রামপ্রসাদকে বন্দি করেছিল চিতে ডাকাতের উত্তরপুরুষ বিশু ডাকাত তার উপাস্য দেবী চিত্তেশ্বরীর সামনে বলি দেওয়ার জন্য। হাঁড়িকাঠের সামনে মৃত্যু আসন্ন জেনে রামপ্রসাদ দেবীস্তুতি শুরু করেছিলেন। তখনই বিশু নিজের ভুল বুঝতে পেরে রামপ্রসাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে তাঁকে মুক্ত করেছিলেন। তেমনই এই মন্দিরের পাশেই চিত্তেশ্বরী সর্বমঙ্গলার মন্দিরকে নিয়ে রয়েছে অন্য একটি কাহিনি। মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত দেবী নাকি আগে দক্ষিণমুখী ছিলেন। এক দিন সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন নৌকায় গান গাইতে গাইতে যাচ্ছিলেন। তাঁর গান শোনার জন্য দেবী নাকি পশ্চিমমুখী হয়েছিলেন। তেমনই জয়নারায়ণ ঘোষাল প্রতিষ্ঠিত দুর্গা পতিতপাবনীকে দেখে রামপ্রসাদ গেয়ে উঠেছিলেন “পতিতপাবনী পরা, পরামৃত ফলদায়িনী স্বয়ম্ভূশিরসি সদা সুখদায়িনী।” তিনিই এই স্থানটির নামকরণ করেন ভূকৈলাস।

ছোটবেলায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হলে তিনি বাংলা, ফার্সি ও সংস্কৃত ভাষায় জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে রামপ্রসাদের বিয়ে হয় সর্বাণীদেবীর সঙ্গে। তাঁদের চার সন্তান ছিল। মাতৃ সাধনায় বিভোর রামপ্রসাদের সাংসারিক জীবন ছিল টানাপড়েনে ভরা।বাবা-মায়ের মৃত্যুর পরে রামপ্রসাদ সেন উপার্জনের আশায় কলকাতায় এসেছিলেন। তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই নিধিরাম তাঁর চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন গরানহাটায় দুর্গাচরণ মিত্রের কাছারিতে। আনুমানিক ১৭৩৯-এ তিনি দুর্গাচরণের কাছারিতে কাজে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তবে জাগতিক কাজকর্মে তাঁর মন ছিল না। কাজের সময় কেমন যেন আনমনা হয়ে থাকতেন।

এ ভাবেই এক দিন হিসেবের খাতায় লিখলেন, ‘আমায় দে মা তবিলদারী আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী।’ ক্রমেই সেরেস্তার হিসেবের খাতা হয়ে উঠল রামপ্রসাদের গানের খাতা। ব্যাপারটা যখন মিত্র মশায়ের কাছারিতে জানাজানি হল তখন সকলে ভেবেছিলেন এই বুঝি রামপ্রসাদের চাকরিটা গেল। হিসেবের খাতায় লেখা সেই সব গানের মাহাত্ম্য বুঝতে দেরি হয়নি বিচক্ষণ দুর্গাচরণের। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন রামপ্রসাদ কোনও এক মহাসাধক। রামপ্রসাদে কণ্ঠে কয়েকটি গান শুনে তাঁর অনুমান আরও দৃঢ় হয়েছিল। দুর্গাচরণই প্রথম তাঁকে ‘কবিরঞ্জন’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি রামপ্রসাদকে হালিশহরে ফিরে যেতে বলেন এবং মাসিক তিরিশ টাকা বৃত্তি সেখানে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

তিনি কর্মজীবনের শুরু থেকেই স্বীয় অস্তরের প্রবর্তনায় শ্যামাসঙ্গীত রচনা করতেন। দেওয়ান রাজকিশোর রায়ের আদেশে রামপ্রসাদ ‘কালীকীর্তন’ গ্রন্থ এবং রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নির্দেশে ‘কালিকামঙ্গল’ তথা ‘বিদ্যাসুন্দর কাহিনী রচনা করেছিলেন। কালীকীর্তন গ্রন্থে গীতিকবিতা ও আখ্যানমূলক কবিতার মাধ্যমে উমার জীবনকাহিনি বর্ণিত হয়েছে। কৃষ্ণকীর্তন অসম্পূর্ণ রচনা। এই গ্রন্থে গান ও কবিতার মাধ্যমে কৃষ্ণের জীবনকথা বর্ণিত হয়েছে। এর সম্পূর্ণ অংশটি পাওয়া যায় না। বিদ্যাসুন্দর রাজকুমারী বিদ্যা ও রাজকুমার সুন্দরের বহুপ্রচলিত প্রেম ও পরিণয়কাহিনি অবলম্বনে রচিত। সেই যুগে এই কাহিনিটি বাংলায় খুবই জনপ্রিয় ছিল। রামপ্রসাদ লিখেছেন, বিদ্যা ও সুন্দরে প্রেম ও পরিণয় দেবী কালীর সহায়তায় ঘটেছিল।

আর্থিক অনটনে ভরা জীবনে পরিবারের প্রতি তিনি ছিলেন কর্তব্যপরায়ণ। কখনও গৃহত্যাগী হয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যাননি। বৃদ্ধ বয়সে রামপ্রসাদের দেখাশোনা করতেন তার পুত্র রামদুলাল ও পুত্রবধূ ভগবতী। রামপ্রসাদের মৃত্যু নিয়ে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। রামপ্রসাদ প্রতি বছর দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালীপূজা করতেন। একবার সারারাত পূজা ও গানের পর সকালে কালীপ্রতিমা মাথায় করে নিয়ে বিসর্জনের পথে বের হন রামপ্রসাদ। ভক্তগণ তার পিছন পিছন বিসর্জন শোভাযাত্রায় অংশ নেন। স্বরচিত শ্যামাসঙ্গীত গাইতে গাইতে গঙ্গার জলে প্রতিমা বিসর্জনার্থে অবগাহন করেন রামপ্রসাদ। প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রাণ বহির্গত হয়। রামপ্রসাদ স্বয়ং তন্ত্র সাধক ছিলেন।

কুমারহট্ট হালিশহরে সেই সময় গভীর জঙ্গলে সাবর্ণ চৌধুরী বংশজ রামকৃষ্ণ চৌধুরী পঞ্চ মুন্ডি আসনে বসে সাধনা করতেন। পরবর্তীকালে রামপ্রসাদ সেনও পঞ্চমুন্ডি আসনে বসে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর গ্রামে এখনো তাঁর সাধন ধামের ধ্বংসাবেশ লক্ষ্য করা যায়। তন্ত্রক্তত সাধনা মূলত সাধকের দেহকেন্দ্রিক সাধনা । কবি বহুপদে এই সমস্ত তত্ত্বকথা বলেছেন ।তিনি যে তান্ত্রিক গ্রন্থ অবলম্বনে ও গুরু নির্দেশে তন্ত্র সাধনা করতেন তার ইঙ্গিত এই সাধন ভজন গ্রন্থে পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যুর পরে ক্রমেই সেই সিদ্ধপীঠ আগাছায় জঙ্গলে ভরে গিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর শতবর্ষে হালিশহরবাসীর চেষ্টায় রামপ্রসাদের ভিটে ও পঞ্চমুণ্ডির আসন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ১৯৫৭-এ সেই সিদ্ধপীঠে কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়।হালিশহরে গঙ্গা তীরবর্তী তার নামাংকিত ‘রামপ্রসাদ ঘাটে’ তার একটি আবক্ষ মূর্তি আছে।

বর্তমানে হালিশহরে তার জন্মস্থান ও পঞ্চমুন্ডির আসন খুঁজে তৈরি করা হয়েছে রামপ্রসাদ ভিটা সেখানে প্রসাদময়ী মায়ের মূর্তি যেমন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ঠিক তেমনি রামপ্রসাদের মূর্তিও প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। প্রতিবছর ২৬ শে জানুয়ারি রামপ্রসাদ ভিটাতে অন্নকূট উৎসব পালিত হয় গুডউইল ফ্রেটারনিটির উদ্যোগে যার সহযোগিতায় হাত বাড়িয়ে দেয় হালিশহর পৌরসভাও। এই উৎসব উপলক্ষে শিবের গলিতে মেলাও বসে। নিত্য পুজো ছাড়া এছাড়া মঙ্গল শনিবার বিশেষ পুজো হয় এ ছাড়া বিপত্তারিণী পুজোর দিনও ভোরবেলা থেকে মায়ের মন্দিরে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায় পুজোর জন্য। এখানে আসার জন্য হালিশহর কাঁচরাপাড়া নৈহাটি এবং গরিফা স্টেশন থেকে আসা যায় স্টেশন গুলি থেকে ৮৫নং বাসে হালিশহর থানা বা রামপ্রসাদ ঘাটে নেমে মিনিট সাথে হাঁটা পথ পূর্বদিকে।

লেখক- ক্ষেত্র গবেষক ও সাংবাদিক

Related Articles