সম্পাদকীয়

বিজেপি-র সংগঠন নেই! কাকে বোকা ভাবছেন তৃণমূলনেত্রী?

কিন্তু রামলীলা ময়দানে এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা বলে এসেছেন, তা তিনি সত্যি বলেছেন কিনা, তা নিয়ে এখন জোর চর্চা কালীঘাট তৃণমূলের অবশিষ্ট অংশের নেতা-কর্মীদের মধ্যেই

পার্থ মুখোপাধ্যায়: লুজ টক-এর জন্যে তিনি সবসময় চর্চায় থাকেন। ইতিহাস-ভূগোল গুলিয়ে দেন, না গুলিয়ে ফেলেন, তা তিনি যখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখনও চর্চার বিষয় ছিল। ইচ্ছা করে বলেন, নাকি মনে রাখতে পারেন না, সোশ্যাল মিডিয়ায় তা নিয়ে রিলস, মিম অনেক কিছু হতো, এখনও হয়। কিন্তু রামলীলা ময়দানে এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা বলে এসেছেন, তা তিনি সত্যি বলেছেন কিনা, তা নিয়ে এখন জোর চর্চা কালীঘাট তৃণমূলের অবশিষ্ট অংশের নেতা-কর্মীদের মধ্যেই। ছুটির দিনে দিল্লির রামলীলায় দিদির লীলা বুঝতেই হিমশিম খাচ্ছেন কালীঘাটের কর্মীরা! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে বলে এসেছেন, বিজেপি-র কোনও সংগঠন নেই। তাই বিজেপি পুলিশকে দিয়ে দলের কাজ করায়!

এসব শুনে দিদি অনুগামীদেরও চোখ কপালে। মাথায় ঘাড়ে-জল দিয়েও শান্ত হতে পারছেন না। কারণ, দিদির কথা সত্যি হলে, তিনি যখন নিজে পুলিশমন্ত্রী ছিলেন, তখনকার পুলিশও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা শুনতো না! কারণ, সবাই জানেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন পুলিশ দফতর নিজের হাতে রাখলেও প্রথমে সব সামলাতেন মুকুল রায়। আর পরে মুকুল রায়কে সরিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ঠিক যে কারণে, কদিন আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে জানিয়েছেন, ৪ মে সকালে মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার তাঁকে এসএমএস করে জানিয়েছিলেন, তৃণমূলই আবার ক্ষমতায় আসছে। এবং সেই জন্যে নাকি সেই পুলিশ সুপার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আগাম শুভেচ্ছাও জানিয়েছিলেন!

বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার ৬ মাসও হয়নি, তার মধ্যেই নেত্রীর এই রকমের বিভ্রম কী করে হল, বুঝেই উঠতে পারছেন না খোদ কালীঘাট তৃণমূলের লোকজন। সরাসরি জিজ্ঞাসা করছেন, বিজেপি তো ৬ মাস আগেও রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল না। তা হলে পুলিশকে দিয়ে বিজেপি দলের কাজ করাতে পারল কী করে! সর্ষের মধ্যেই কি ভূত ছিল, নাকি দিদিকে কোনও খবরই দেওয়া হতো না? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভুল বুঝিয়ে যাওয়া হয়েছিল? যদি তাই হয়, তা হলে সেটা কে বা কারা করেছিল? এবং কার নির্দেশে করেছিল? তৃণমূলের মধ্যে থেকেই তবে সাবোতাজ করা হয়েছিল? আর ভোটে হারার পর সেটা কালীঘাটের দিদি বুঝতে পারছেন!

এমনিতেই ২৮ বছর আগে কংগ্রেস ভেঙে আসার পর আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে সোনিয়া গান্ধিকে তাঁর নেত্রী হিসাবে ঘোষণা করেছেন। শুধু তাই নয়, ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে রামলীলার মঞ্চে বসিয়ে রাহুল গান্ধিকে ইয়ং লিডার বলে শুধু সম্বোধন করেননি, প্রশংসায় কার্যত ভাসিয়ে দিয়েছেন গান্ধি পরিবারের এই প্রজন্মের দেশের প্রধানমন্ত্রী পদের মুখকে! এরপরেই সব গুলিয়ে যাচ্ছে অনেকেরই।

বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার পর এতদিন ইন্ডিয়া জোটকে কার্যত পাত্তা না দেওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্যে অবস্থান বদল করছেন, এটা বোঝা যাচ্ছিল। বিজেপি বিরোধী আন্দোলনে কংগ্রেসের হাত ধরে ভেসে থাকতে চাইছেন, সেটা আগের বারের দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকের পর সাংবাদিক বৈঠকের পরই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। যেখানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে সরব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের মধ্যেই রাহুল গান্ধিকে হাসতে দেখা গিয়েছিল। এবার প্রশ্ন উঠছে, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ বা অপসারণের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলনে প্রথম সারিতে থাকতেই কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাক্তন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধির সঙ্গে তাঁর পুরোনো সম্পর্ক কাজে লাগাতে চাইছেন? কারণ, দিল্লির রাজনীতিতে সবাই জানেন, রাজীব গান্ধি সেই সময়ের তরুণ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে খুব পছন্দ করতেন আর সেই সুবাদে সোনিয়া গান্ধিও।

কিন্তু গত ১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকার সময় কংগ্রেসকে সেভাবে গুরুত্ব দেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কংগ্রেসের হাত ধরে ক্ষমতায় আসার একবছরের মধ্যে চোখের-নাকের জলে ভাসিয়ে ছিলেন এই রাজ্যের কংগ্রেস নেতাদের। তারপর এই রাজ্যের কংগ্রেস খারাপ, দিল্লির কংগ্রেস নেতৃত্ব ভাল— এমন একটা অবস্থান নিয়ে চলেছেন কিছুদিন। আবার ভোট এলেই দিল্লি-কলকাতা, কংগ্রেসের কোনও নেতাদেরই রেয়াত করেননি। খোদ রাহুল গান্ধিকে ভোট প্রচারে আসায়, বসন্তের কোকিল বলেছিলেন। শুধু বলে থামেননি, নির্বাচনের প্রচার মঞ্চ থেকে কোকিলের ডাকও ডেকে শুনিয়ে ছিলেন!

কংগ্রেসের সঙ্গে যাঁর এমন সম্পর্ক, সেই কালীঘাটের দিদির মুখে রাহুল গান্ধির প্রশংসা শুনে আতান্তরে এখনকার ভাইরা। আগের ভাইরা হলে হয়তো খুব একটা অবাক হতেন না। কারণ, তাঁরা এই দিদিকে দেখেছেন, বিজেপি-র সঙ্গে রাজনীতির ঘর করতে। আবার এখন দু’বেলার বিরোধিতাও। কিন্তু কংগ্রেস, দিল্লি তো বটেই, দেশের মাত্র ৫টা রাজ্যে যে দল ক্ষমতায়! সেই কংগ্রেসের সোনিয়া গান্ধিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাই লিডার বলছেন, হিসাব মেলাতে পারছেন না দিদির এখনকার জেন-জি ভাইরা! প্রশ্ন উঠেছে, শুধুই কি কংগ্রেসের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক, নাকি কালীঘাটের এখনও বেঁচে থাকা অংশের জন্যে গান্ধি পরিবারের শরণাপন্ন হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? আর কংগ্রেসও তা জানে বলেই, রাহুল গান্ধির সঙ্গে এক গাড়িতেই তোলা হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। রামলীলা ময়দান যাওয়ার জন্যে হুড খোলা গাড়িতে রাহুল গান্ধির পেছনেই বসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়!

এখানেই শেষ নয়, বামেদের যেভাবে প্রশংসা শোনা গেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায়, তাতে টেলিভিশন শো-তে তাঁকে কটাক্ষ করা আলিমুদ্দিনের জেন-জি-রা পড়েছেন বিপদে। না পারছেন হজম করতে, না পারছেন উগরোতে। বামেদের সম্পর্কে রামলীলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শব্দচয়ন শুনে চমকে ভিমরি খেয়েছেন অনেক পুরনো কমরেড। তাতে অস্বস্তিও বেড়েছে। ভোট চুরির অভিযোগে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বা বিজেপি সরকার হঠাতে একসঙ্গে আন্দোলন পর্যন্ত ঠিক ছিল, কিন্তু সিপিএম-সহ বামদলগুলির ভূমিকার প্রশংসা করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এতেই সন্দেহ আরও জোরদার হয়েছে কমরেডদের।

একইসঙ্গে চর্চায় আসছেন ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি-র ভূমিকাও। কারণ, যেভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠকের পরেই সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে বিরোধীদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েও সক্রিয় অংশ নেননি, তাতেই চর্চা আরও বেড়েছে। দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অতীতের ট্র্যাক রেকর্ড দেখেই কি এক ব্র্যাকেটের মধ্যে থাকতে রাজি হয়নি জেন-জি-রা? সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সিজেপি একটি স্বাধীন সংগঠন। এটা নিরপেক্ষ মঞ্চ। তাঁরা সেটা বজায় রাখতে চান।

কংগ্রেসের একটা মহলের মতে, এর জন্যে দায়ী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যেভাবে, জেন-জি-কে লক্ষ্য করে কদিন আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, আগে জ্ঞানেশ কুমারকে সরাও, তারপর বাকি সব কিছু— তা ভালভাবে নেননি দেশের ছাত্র-যুবদের একটা বড় অংশ। তাঁদের মনে হয়েছে, তাঁদের গড়ে তোলা আন্দোলনের ফায়দা তুলতে চাইছে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশের বিরোধী দলগুলোর নেতানেত্রীরা। সে জন্যেই ভোট চুরির বিরুদ্ধে যে দল বা যাঁরাই আন্দোলন করবে, তাঁদেরই সমর্থন— নিজেদের এই স্ট্যান্ডের বাইরে বের হতে চায়নি সিজেপি। তাঁদের একটা অংশের বক্তব্য, এবারের নির্বাচনে না হারলে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাঁর দল নির্বাচন কমিশন বা জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরব হতেন? নিশ্চিত করেই হতেন না, কারণ সেক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই মেনে নিতে হতো জালিয়াতি করেই ভোটে জিতেছেন তাঁরা। যে অভিযোগটা গত ১০ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে করে আসছিলেন কংগ্রেস এবং সিপিএমের নেতারা। প্রশাসন এবং পুলিশকে দিয়ে ভোট করাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস— এ তো খোদ রাহুল গান্ধি এবারের ভোট প্রচারে এসে কলকাতাতেই বলেছিলেন!

ফলে সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন অভিযোগ করেন, ক্ষমতায় না থেকেও পুলিশকে ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি, তখন সাধারণ ভোটারদেরই অপমান করা হয়।

Related Articles