রুপোলি পর্দার জাদুতে সাজছে মণ্ডপ! দুর্গাপুজোয় হাওড়াতে নস্টালজিয়ার ঝড় তুলবে ‘অতি উত্তম’
একসময় ছোট্ট একচালার প্রতিমা দিয়ে যে পুজোর পথচলা শুরু হয়েছিল, আজ সেই পুজোই নিজের ভাবনায় জায়গা করে নিয়েছে জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় দুর্গোৎসবের তালিকায়
সুমন আদক, হাওড়া: একদিকে গঙ্গার স্রোত, অন্যদিকে ইতিহাসের সাক্ষী বোটানিক্যাল গার্ডেন। তারই পাশে শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, সংসার আর স্বপ্নে গড়ে ওঠা হাওড়ার বি গার্ডেন আইএইচই আবাসন। সময় বদলেছে, বদলেছে চারপাশের চেহারা। কিন্তু বদলায়নি উৎসবের টান। একসময় ছোট্ট একচালার প্রতিমা দিয়ে যে পুজোর পথচলা শুরু হয়েছিল, আজ সেই পুজোই নিজের ভাবনায় জায়গা করে নিয়েছে জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় দুর্গোৎসবের তালিকায়। তবে এবার সেই পথচলায় যোগ হচ্ছে আরও এক নস্টালজিয়ার অধ্যায়। মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষকে সামনে রেখে বি গার্ডেন আইএইচই ওয়েলফেয়ার দুর্গাপুজো কমিটির এবারের ভাবনা ‘অতি উত্তম’। বাঙালির আবেগ, সিনেমার রুপোলি পর্দা এবং হারিয়ে যেতে বসা এক সময়কে মণ্ডপের পরতে পরতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন উদ্যোক্তারা। উত্তম কুমারের সেই ভুবনমোহিনী হাসি, অভিনয়ের বিভিন্ন মুহূর্ত, তাঁর স্বতন্ত্র শরীরী ভাষা—সবকিছুকেই মণ্ডপসজ্জার ভাবনায় ব্যবহার করা হচ্ছে।

শুধু মণ্ডপ নয়, আলোকসজ্জাতেও থাকছে পুরনো দিনের সিনেমা পাড়ার আবহ। মূল প্রবেশদ্বার থেকে পুজো প্রাঙ্গণ পর্যন্ত সাজানো হবে উত্তম কুমারের ছবির পোস্টারে। প্রায় ২০০ মিটার দীর্ঘ মূল ফটক আবাসিকদের হাতে আল্পনায় সেজে উঠবে। ফলে পুজোর কয়েকটি দিন গোটা আবাসনই যেন হয়ে উঠবে এক টুকরো পুরনো কলকাতা, যেখানে বর্তমানের ভিড়ের মধ্যে আচমকাই ফিরে আসবে ম্যাটিনি আইডলের সেই সোনালি সময়। বি গার্ডেনের এই পুজোর বিশেষত্ব অবশ্য শুধু উত্তম-কেন্দ্রিক ভাবনায় নয়। এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রাও। বোটানিক্যাল গার্ডেনের মতো ঐতিহাসিক এলাকার পাশে গড়ে ওঠা এই শ্রমিক আবাসনের পুজো বরাবরই স্থানীয় ইতিহাস ও ভারতীয় সংস্কৃতির নানা অধ্যায়কে মণ্ডপের ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। কখনও কেদারনাথ মন্দিরকে মণ্ডপ ভাবনায় ফুটিয়ে তুলে রীতির বাইরে গিয়ে থিম পুজোর সূচনা, কখনও যামিনী রায়ের শিল্পরীতির অনুপ্রেরণায় বাংলার হারিয়ে যেতে বসা কাঠের পুতুলকে মণ্ডপে ফিরিয়ে আনা—প্রতিটি ভাবনাতেই ছিল শিকড়ের সন্ধান। সেই ধারাবাহিকতাতেই এবার শিকড় খোঁজা হচ্ছে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে।
পুজো কমিটির সম্পাদক জিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, উত্তম কুমার বাঙালির আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক নাম। জন্মশতবর্ষে তাঁকে ঘিরে উৎসবের মাধ্যমে বাঙালিয়ানা উদযাপনই তাঁদের মূল লক্ষ্য। অপর সম্পাদক শুভ্রজিৎ দত্তের বক্তব্য, বাঙালির পরিচয়ের সঙ্গে দুর্গাপুজো, খাওয়াদাওয়া, রবীন্দ্রনাথ, ফুটবল এবং উত্তম কুমার—সবই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই নিজেদের শিকড় ও পরিচয়কেই এবার মণ্ডপে তুলে ধরতে চাইছেন তাঁরা। পুজোর সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহালয়ার দিন আবাসিকদের লেখা ও শুভানুধ্যায়ীদের লেখায় প্রকাশিত হবে পুজো বার্ষিকী ‘কাশফুল’। একই দিনে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ইন্ডিয়ান বোটানিক্যাল গার্ডেনের সহযোগিতায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং আশপাশের প্রান্তিক পরিবারের হাতে বস্ত্র তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পঞ্চমীর দিন পুজোর উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে বি গার্ডেন আইএইচই-র ‘অতি উত্তম’ শুধুমাত্র একজন মহানায়ককে স্মরণ করার আয়োজন নয়। পুরনো দিনের সিনেমা, বাঙালির আবেগ, শ্রমজীবী মানুষের তৈরি আবাসনের ইতিহাস এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা—সবকিছুকে এক সুতোয় বেঁধে এবারের দুর্গোৎসব হয়ে উঠতে চলেছে স্মৃতি ও ঐতিহ্যের এক অন্যরকম উদযাপন।






