দেশ

রণক্ষেত্র হরমুজ প্রণালী! ক্ষেপণাস্ত্রের তোপ এড়িয়ে ভারতে ফিরল ৬০টি জাহাজ, উদ্ধার ৩,৯৭২ নাবিক

হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতের চেষ্টা করা একাধিক পণ্যবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিযোগ ওঠে

Truth of Bengal: পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কার মধ্যেও হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে ভারতে পৌঁছেছে ৬০টি পণ্যবাহী জাহাজ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ৩,৯৭২ জন ভারতীয় নাবিককে। প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা আমেরিকা-ইরান সংঘাতের আবহে কীভাবে এই বিশাল উদ্ধার ও নিরাপদ জাহাজ চলাচল সম্ভব হল, এবার তার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করল কেন্দ্রীয় সরকার। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর গত মাসে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পশ্চিম এশিয়া। হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতের চেষ্টা করা একাধিক পণ্যবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিযোগ ওঠে। ভারতীয় নাবিক থাকা কয়েকটি জাহাজও হামলার মুখে পড়ে বলে জানা যায়।

এই অস্থিরতার মধ্যেই হরমুজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও কয়েকজন। ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দিল্লিতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ভারত। তেহরানের সঙ্গে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় নাবিকদের বহনকারী জাহাজে হামলা কেন হল, তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে কেন্দ্র। জাহাজ মন্ত্রক জানিয়েছে, ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছিল। পরিষেবা শুরু হওয়ার পর থেকেই সেখানে লাগাতার ফোন ও ইমেল আসতে থাকে। নাবিক ও তাঁদের পরিবারের কাছ থেকে মোট ১৫,৭৭১টি ফোন এবং ৩৬,৪৯৯টি ইমেল পেয়েছে ওই কন্ট্রোল রুম। নাবিকদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিল কেন্দ্র। জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক সহায়তার জন্য ওয়েলফেয়ার কাউন্সেলর ও অভিজ্ঞ মনোবিদদের প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। প্রয়োজন অনুযায়ী নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের পরামর্শ এবং মানসিক সহায়তা দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে ডিজি কমিউনিকেশন সেন্টার বা এমএমডিএসি-কে সার্বক্ষণিক সক্রিয় রাখা হয়েছিল। সমুদ্রে থাকা জাহাজের অবস্থান, নাবিকদের নিরাপত্তা এবং উদ্ধার সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত আদানপ্রদানের কাজে এই কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে জানিয়েছে জাহাজ মন্ত্রক। মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে অস্থিরতা বাড়তে শুরু করে। মার্কিন হামলার জবাবে ইরান ওই সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি করলে তার প্রভাব পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের মাঝের এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট অশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহণ করা হয়। ফলে হরমুজে অস্থিরতা তৈরি হতেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করে। তার প্রভাব পড়ে ভারতেও। দেশের প্রয়োজনীয় অশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। সেই আমদানির একটি বড় অংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। আমেরিকা এবং ইরান—দুই দেশের সঙ্গেই ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ভারতমুখী জাহাজগুলিকে নিরাপদে হরমুজ প্রণালী পার করানোর ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ককে কাজে লাগানো হয়েছে বলে আগেই জানা গিয়েছিল। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় অন্তর জাহাজের মালিক, পরিচালন সংস্থা এবং নাবিকদের উদ্দেশে সতর্কতামূলক নির্দেশিকাও জারি করে নয়াদিল্লি।

জাহাজ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আগেই সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে ভারতীয় নাবিকদের সতর্ক করা হয়েছিল। গত ১৪ জানুয়ারি ইরানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ইরানি বন্দরে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালী পার করা জাহাজগুলিকে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয়। এরপর সংঘর্ষ শুরুর দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত আরও ছয় দফা সতর্কতামূলক নির্দেশিকা জারি করা হয়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ভারতীয় নাবিক নিয়োগ না করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল জাহাজমালিকদের। কেন্দ্রের দাবি, কূটনৈতিক তৎপরতা, সার্বক্ষণিক নজরদারি, সতর্কতামূলক নির্দেশিকা এবং নাবিকদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ফলেই অশান্ত পরিস্থিতির মধ্যে হাজার হাজার ভারতীয়কে নিরাপদে দেশে ফেরানো সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে ৬০টি ভারতমুখী পণ্যবাহী জাহাজও নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে।