সম্পাদকীয়

“আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধশ্রম”, কেমন কাটছে দিন?

এ এক সামাজিক অবক্ষয়। স্নেহ মায়া কর্তব্যবোধ যেখানে উধাও। রোবটও বোধহয় এত নির্দয় নয়।

সুপ্রভাত লাহিড়ি: বৃদ্ধ–বৃদ্ধাদের এখন ঘরে বাইরে বিপদ। অশক্ত শরীরের কারণে তারা পরনির্ভরশীল হয়ে একপ্রকার গৃহবন্দি। তারা মরে বেঁচে আছেন বাড়ির পরিচারক-পরিচারিকা বা বিভিন্ন এজেন্সি মারফত সর্বক্ষণের জন্য নিযুক্ত সেবক-সেবিকা বা আয়াদের অনুগ্রহে। অনবরত মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার সহৃ করে চোখের জলে দিন গুজরান করে চলেছেন। সারারাত পুঁতিগন্ধময় বিছানায় বিনিদ্র রাত কাটে। ডেকে ডেকে শুধুই মুখ ঝামটা সঙ্গে অশ্রাব্য কিছু কটূক্তি হজম করতে হয়। কী দুঃসহ জীবন! এ এক অদ্ভুত সামাজিক অবক্ষয়।

স্নেহ মায়া কর্তব্যবোধ যেখানে উধাও। রোবটও বোধহয় এত নির্দয় নয়। এ তো গেল দৈনন্দিন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন প্রসঙ্গ। তার ওপর এদের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রটাও আজ একটা ভয়ঙ্কর জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। বাড়িতে পরিচারক-পরিচারিকারা বা বহুদিনের নিযুক্ত সাফাই কর্মীর হাতে নৃশংস ভাবে খুন হওযার বিবরণ পড়লে গা শিউরে ওঠে। সেবা, শুশ্রূষা, পার্শ্ব-চিকিত্‍সার জন্য নিযুক্ত মানুষজনদের চৌর্যবৃত্তি নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে চলে গেছে। এর কিছু ব্যতিক্রমী চিত্র অবশ্য দেখতে পাওয়া যায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য গঠিত পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে। ‘বৃদ্ধাশ্রম’ নামকরণে কিঞ্চিত আপত্তি রয়েছে (তাই পুনর্বাসন কেন্দ্রই উল্লিখিত হ’ল)।

সর্বক্ষেত্রেই যে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সংসার পরিত্যক্ত হয়ে ওই সব কেন্দ্রে জায়গা হয় তা বোধহয় নয়। উদাহরণস্বরূপ, একমাত্র পুত্র-পুত্রবধূ কর্মসুবাদে বিদেশে থাকে। বাবা-মা নিজেদের বসতবাটি ছাড়তে নারাজ। অগত্যা, উভয়পক্ষের সম্মতিক্রমেই সেই বাড়িতেই প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান, সহায়ক-সহায়িকা, ডাক্তার ইত্যাদির ব্যবস্থা করে তাদের শারীরিক, মানসিক ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা।

নতুবা তাদের পুনর্বাসন করা সেই সব কেন্দ্রগুলিতে যেখানে উল্লিখিত ব্যবস্থাপনা সুনিশ্চিত আছে। এতে হয়ত সমালোচনা হয়, তবে তাতে বাস্তব পরিস্থিতি সুবিবেচিত হয় না। ওটা হল মুদ্রার এক পিঠ দেখার মতো। পুনর্বাসিত বহু বৃদ্ধ-বৃদ্ধার এর জন্য কিছুটা আক্ষেপ থাকলেও অভিযোগ থাকে না। ছেলে-বউ, নাতি-নাতনিদের নিয়ে সংসার না করার আক্ষেপ। আর সেই সব ক্ষেত্রে অভাগা হয় সেই সব সংসারের নবাগতরা। প্রাচীন বটবৃক্ষের স্নেহছায়া থেকে যারা হয় বঞ্চিত!

যাই হোক, সেই সব পুনর্বাসিতদের ঘরে ও বাইরে নিরাপত্তা মোটামুটি সুরক্ষিত। কিন্তু সেই সংখ্যাটা খুবই নগণ্য। অধিকাংশ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আজ ঘরে বাইরে বিপর্যস্ত আতঙ্কিত হয়ে দিন গুজরান করে চলেছেন। বৃদ্ধাদের প্রাতঃভ্রমণ প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড়। রাস্তাঘাটে নিরাভরণ যাতায়াত অভ্যাস করে নিতে হচ্ছে।

পরিশেষে, এ কথা বলা যায় যে, ঘরের বাইরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সক্রিয়তা, তত্‍পরতা অতিমাত্রায় আবশ্যিক এবং সেটা অত্যন্ত জরুরি। আর ঘরের নিরাপত্তা একমাত্র নিশ্চিত করতে পারে আপৎকালীন সাহায্যকারী সুস্থ মানসিকতার উত্তরণ, সঙ্গে থাকবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা এবং হার না মানা মুষ্টিবদ্ধ হাত। আমরা যে সবাই বয়সের দাস, তাই না?

Related Articles