বিশ্বজিৎ বৈদ্যঃ কলকাতা— একসময় নদী, সবুজ আর সংস্কৃতির শহর। এখন তার রূপ বদলেছে; ঘন কংক্রিটের আবরণে ঢাকা পড়েছে পুরনো গাছের ছায়া, পুকুর হারিয়েছে, আর মাটির স্পর্শ ক্রমেই দূরে সরে গেছে। একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত শহরায়ন কলকাতাকে দিয়েছে নাগরিক সুবিধা, কিন্তু সঙ্গে এনেছে এক ভয়াবহ পরিবেশগত সঙ্কট— ‘তাপদ্বীপ প্রভাব’।
তাপদ্বীপ প্রভাব বলতে বোঝায় এমন এক নগর-বাস্তুতন্ত্র, যেখানে শহরের কেন্দ্রীয় অঞ্চল পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি উষ্ণ থাকে। এই উষ্ণতার কারণ শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি নয়; এটি মানুষের তৈরি অবকাঠামো, যানবাহনের ঘনত্ব, জ্বালানির ব্যবহার ও প্রাকৃতিক উপাদানের অভাবের মিলিত ফল। কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এই প্রভাব আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দুই দশকে কলকাতার গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৪০ সেলসিয়াস– এর কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। শহরের ‘কংক্রিট সারফেস’ তাপ শোষণ করে দিনে, আর রাতে তা ধীরে ধীরে নিঃসরিত হয়—ফলে কলকাতার রাতগুলোও হয়ে উঠছে অস্বস্তিকর গরম। এই পরিবর্তন শুধুমাত্র জলবায়ুর নয়, বরং নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলছে— স্বাস্থ্য, বাসস্থান, জ্বালানি, এমনকী মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যেও। শহরায়ন তাই এখন শুধু উন্নয়নের সূচক নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক দ্বিমুখী তরবারি— যেখানে একদিকে আধুনিকতার উজ্জ্বল আলো, অন্যদিকে তাপদ্বীপের ছায়া। প্রশ্ন উঠছে— কলকাতা কি এই উত্তাপের শহরে পরিণত হতে চলেছে?
কলকাতার ইতিহাসই শহর গঠনের ইতিহাস। ব্রিটিশ আমলে পরিকল্পিতভাবে শহরের কেন্দ্রীয় অঞ্চল গড়ে উঠেছিল বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য। স্বাধীনতার পরও শহরটি ক্রমে প্রসারিত হয়েছে দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম দিকে। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ঘনবসতি, রাস্তাঘাট, বহুতল আবাসন, শপিং মল ও পরিবহণ অবকাঠামো। কিন্তু এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শহরের প্রাকৃতিক পরিবেশ।
২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে কলকাতা মহানগর অঞ্চলে নির্মিত এলাকার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ, আর উন্মুক্ত সবুজ জায়গা ও জলাশয়ের পরিমাণ কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। একদিকে শহরের কেন্দ্রে পুরনো পুকুর, বাগান, মাঠ বিলুপ্ত হচ্ছে; অন্যদিকে শহরতলিতে কৃষিজমি ও জলাভূমি ভরাট হয়ে উঠছে নতুন আবাসন ও শিল্পাঞ্চল। এই পরিবর্তনের ফলেই তৈরি হচ্ছে ‘তাপদ্বীপ অঞ্চল’— যেখানে শহরের কেন্দ্র বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের তুলনায় গড়ে ৩–৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম থাকে। রাতের তাপমাত্রা কমে না, বাতাসের আর্দ্রতা কমে যায়, আর বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ বেড়ে শ্বাসকষ্টের প্রবণতা বাড়ে।
বিশেষ করে চেতলা, এক্সাইড মোড়, বালিগঞ্জ, গড়িয়াহাট ও দমদম অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে উপগ্রহ চিত্রে উল্লেখযোগ্য তাপমাত্রা পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। এমনকী দক্ষিণ কলকাতার নতুন গড়ে ওঠা এলাকা— রাজারহাট, নিউটাউন ও সল্টলেক— যা আধুনিক নগরায়ণের প্রতীক, সেখানেও তাপদ্বীপ প্রভাব দ্রুত বাড়ছে কারণ সেখানে প্রাকৃতিক ছায়া বা সবুজ আচ্ছাদন খুবই সীমিত।
তাপদ্বীপ কেবল শহরের আবহাওয়া বদলাচ্ছে না, এটি নাগরিক জীবনের ওপরও এক গভীর প্রভাব ফেলছে। গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে, এয়ার কন্ডিশনের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আবার বায়ুমণ্ডলে আরও তাপ নিঃসরণ করছে— এক প্রকার ‘স্বয়ং-প্রণোদিত চক্র’। ফলাফল— অধিক জ্বালানি খরচ, বায়ুদূষণ বৃদ্ধি ও পরিবেশগত ভারসাম্যের অবনতি। পরিবেশবিদরা বারবার সতর্ক করেছেন যে, এই অনিয়ন্ত্রিত শহরায়ণ যদি অব্যাহত থাকে, তা হলে কলকাতার জলবায়ু ধীরে ধীরে ‘উষ্ণমণ্ডলীয় তাপদ্বীপ নগরী’-তে রূপ নেবে— যেখানে প্রাকৃতিক শীতলতা কেবল স্মৃতি হয়ে যাবে।
শহর গরম হয় কেন— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের পৌঁছতে হয় নগরবিজ্ঞানের এক মৌলিক ধারণায়, যা হল ‘আরবান হিট আইল্যান্ড। সহজভাবে বললে, শহরের ঘন নির্মাণ, কংক্রিটের ব্যবহার, সবুজ এলাকার অভাব, এবং যানবাহনের নির্গমিত তাপ— সব মিলিয়ে শহরের বায়ু ও মাটির তাপমাত্রা আশেপাশের গ্রামের তুলনায় অনেক বেশি হয়।
তাপদ্বীপ গঠনের মূল কারণ হল শহরের তাপ ভারসাম্যের পরিবর্তন। দিনে সূর্যালোক শহরের ভবন, রাস্তা ও ছাদের ওপর পড়ে— যেগুলো প্রাকৃতিক ভূমির তুলনায় বেশি তাপ শোষণ করে। কিন্তু রাতে এই পৃষ্ঠতলগুলো সেই তাপ ধীরে ধীরে নিঃসরণ করে, ফলে শহরের তাপমাত্রা কমে না। এই প্রক্রিয়া প্রাকৃতিক নয়; বরং মানুষের তৈরি উপকরণ যেমন— সিমেন্ট, অ্যাসফাল্ট, টিন, কাচ— তাপ শোষণ ও প্রতিফলনের অনুপাত বদলে দেয়। ফলে দিনের গরম স্তরে স্তরে জমতে থাকে।
উপগ্রহ চিত্র ও তাপমাত্রা মডেল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শহরের ‘সারফেস আরবান হিট আইল্যান্ড’ সাধারণত দিনে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ও রাতে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উষ্ণতা বাড়ায়। কলকাতার ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রীষ্মকালের রাতে শহরের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকার তুলনায় গড়ে ৩–৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকে।
শহর বাড়ছে মানে বাড়ছে কংক্রিটের পরিমাণ ও সবুজের ক্ষয়। কলকাতায় ২০০০ সালের পর থেকে শহরের প্রতি মাথাপিছু সবুজ জায়গা কমে এসেছে প্রায় ৪.২ বর্গমিটার থেকে ২.৭ বর্গমিটারে। গাছপালা ও জলাশয় প্রাকৃতিক তাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে; এগুলো বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পরিবেশ ঠান্ডা রাখে। কিন্তু এগুলোর বিলুপ্তি শহরের ‘প্রাকৃতিক শীতলতা’ নষ্ট করছে। এছাড়া শহরের ঘনবসতি, উচ্চ-অট্টালিকার কারণে ‘আরবান ক্যানিয়ন এফেক্ট’ তৈরি হয়— যেখানে সূর্যের তাপ ভবনের দেওয়ালে আটকে থেকে তাপ প্রতিফলন বাড়ায়, বাতাস চলাচল ব্যাহত করে। এর ফলে শহরের বাতাস স্থির হয়ে পড়ে এবং তাপ জমে যায়।
কলকাতার যানবাহন সংখ্যা গত এক দশকে দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতিদিনের যানজট শুধু সময়ের অপচয় নয়, এটি শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণও। যানবাহন থেকে নিঃসরিত তাপ ও দূষিত গ্যাস সরাসরি বায়ুস্তরে উত্তাপ বাড়ায়। এয়ার কন্ডিশনার, জেনারেটর, শিল্প বয়লার— সবই মিলে এক ধরনের ‘অভ্যন্তরীণ তাপ উৎপাদন’ ঘটায়। শহরের ঘন অবকাঠামো ও তাপ উৎপাদন একে অপরকে প্রভাবিত করে— দিনে সূর্যের তাপ, রাতে মানুষের তৈরি তাপ— দুই মিলিয়ে শহর এক ‘তাপ সঞ্চয়ক’ হিসেবে কাজ করে। এই কারণেই গ্রীষ্মকালে এমন দিনও দেখা যায়, যখন কলকাতার রাতের তাপমাত্রা ভোর পর্যন্ত কমে না।
তাপদ্বীপ প্রভাবের সঙ্গে সবচেয়ে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয় হল ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন। কলকাতার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে (বিশেষত নিউটাউন, রাজারহাট ও ইএম বাইপাসের ধার ঘেঁষে) গত ২০ বছরে জলাভূমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এই জলাশয়গুলো ছিল শহরের ‘প্রাকৃতিক এয়ার কন্ডিশনার’— যেগুলো বাষ্পীভবনের মাধ্যমে স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখত। অন্যদিকে, শহরের কেন্দ্রে যেমন পার্ক সার্কাস, এক্সাইড মোড়, গড়িয়াহাট অঞ্চলে পুরনো গাছ কেটে পার্কিং বা রাস্তা প্রশস্ত করার কাজ হয়েছে, যা স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, তাপদ্বীপ ও জলবায়ু পরিবর্তন একে অপরকে ত্বরান্বিত করে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে শহরগুলিতে তাপদ্বীপ প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়, আবার শহরের অতিরিক্ত তাপ উৎপাদন বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে বাড়িয়ে দেয়। কলকাতার মতো ক্রমবর্ধমান শহরে এই ‘ডবল হিট বার্ডেন’ ভবিষ্যতের নগর নীতি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, তাপদ্বীপ কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং এটি শহরায়ন, ভূমি পরিবর্তন, জ্বালানি ব্যবহার ও নীতি পরিকল্পনার জটিল আন্তঃসম্পর্কের ফল। কলকাতার মতো পুরনো কিন্তু ক্রমবর্ধমান শহরে এই সমস্যার মূল কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত নগর বিস্তার ও সবুজের অবক্ষয়। যদি এখনই কার্যকর নীতি না নেওয়া হয়— যেমন ছাদে বাগান, নগরবনায়ন, জলাশয় সংরক্ষণ ও পরিবহণ সংস্কার— তা হলে আগামী এক দশকের মধ্যে কলকাতা ভারতের সবচেয়ে উষ্ণ মেট্রোপলিটন শহরগুলির অন্যতম হয়ে উঠতে পারে।
গত এক দশকে উপগ্রহচিত্রের তথ্য স্পষ্ট জানাচ্ছে— কলকাতা মহানগর ক্রমে পরিণত হচ্ছে এক বিশাল তাপফাঁদে। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো) ও নাসা–র টেররা এবং ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে শহরের গড় ল্যান্ড সারফেস টেম্পারেচার প্রায় ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত গ্রীষ্মকালে কলকাতার কেন্দ্রীয় ও পূর্বাঞ্চলীয় অংশে পৃষ্ঠ তাপমাত্রা ৪২–৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছয়, যা শহরতলির তুলনায় গড়ে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির মূল কারণ ভূমি ব্যবহার ও ভূমি আচ্ছাদনের দ্রুত রূপান্তর। স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ দেখায়, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কলকাতার বিল্ট-আপ এরিয়া বেড়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ এবং একই সময়ে ভেজিটেশন কভার কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। শহরের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের (যেমন নিউটাউন, রাজারহাট, কসবা, গড়িয়া) মতো নতুন আবাসিক এলাকায় এই পরিবর্তন সবচেয়ে তীব্র।
পূর্ব কলকাতার জলাভূমি অঞ্চল একসময় শহরের প্রাকৃতিক ‘কুলিং সিস্টেম’ হিসেবে কাজ করত— যেখানে জলাশয় তাপ শোষণ কমিয়ে আর্দ্রতা বজায় রাখত এবং বায়ুপ্রবাহকে সহায়তা করত। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে এই অঞ্চলেই সবচেয়ে দ্রুত ভূমি পরিবর্তন ঘটেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইস্ট কোলকাতা ওয়েটল্যান্ড– এর মোট জলাশয়ের পরিমাণ ২০০২ সালে ছিল প্রায় ১২,৫০০ হেক্টর, যা ২০২০ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৮,৯০০ হেক্টরে— অর্থাৎ প্রায় ২৯ শতাংশ হ্রাস। এর ফলে শহরের তাপ ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং স্থানীয় তাপমাত্রা ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে।
অন্যদিকে, উপগ্রহের এনডিভিআই (নরম্যালাইজড ডিফারেন্স ভেজিটেশন ইনডেক্স) মানে স্পষ্ট দেখা যায়, শহরের সবুজ আচ্ছাদনের সর্বাধিক ক্ষয় হয়েছে দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়া, যাদবপুর, এবং পূর্ব দিকের সল্টলেক–নিউটাউন অঞ্চলে। এনডিভিআই মান ২০০১ সালে ০.৩৫ থাকলেও ২০২০ সালে তা নেমে এসেছে ০.১৮-০.২২-এর মধ্যে। এর অর্থ, গাছপালা ও উদ্ভিদ আচ্ছাদন প্রায় অর্ধেক কমেছে, যা তাপদ্বীপ প্রভাবকে আরও তীব্র করছে।
এছাড়াও, কলকাতার পৃষ্ঠ তাপমাত্রার স্থানিক মানচিত্রে দেখা যায়— শহরের কেন্দ্রে (এসপ্লানেড, পার্ক সার্কাস, শিয়ালদা) ও পূর্বাঞ্চলে (সল্টলেক, নিউটাউন) হাইএলএসটি জোন ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে, যখন উত্তর কলকাতার পুরোনো অঞ্চল ও পশ্চিম তীরবর্তী অংশ তুলনামূলকভাবে কম উষ্ণ। এই স্থানিক বৈষম্য নগর পরিকল্পনার ভারসাম্যহীনতা নির্দেশ করে।
উপগ্রহ তথ্য শুধু তাপমাত্রাই নয়, ভূমি ব্যবহারের গতিপ্রকৃতি নিয়েও স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। মোডিস ডেটা অনুযায়ী, ২০০৫–২০২১ সালের মধ্যে কলকাতার গড়ে ইম্পারভিয়াস সারফেস এরিয়া বেড়েছে ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ, মাটির সেই অংশ এখন বৃষ্টির জল শোষণ করতে পারে না— ফলে একদিকে তাপ ধারণ বাড়ছে, অন্যদিকে বৃষ্টিপাতের সময় জলাবদ্ধতা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর পরিবেশে ৩০ শতাংশের নিচে সবুজ আচ্ছাদন থাকলে স্থানীয় জলবায়ুর স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। কলকাতায় এই হার বর্তমানে মাত্র ১২ শতাংশ–১৫ শতাংশ। অর্থাৎ, শহরটি ইতিমধ্যেই ‘তাপদ্বীপ সঙ্কটসীমা’-য় পৌঁছে গেছে।
তাপদ্বীপের এই স্থানিক বিস্তারের ফলে শহরে মাইক্রোক্লাইমেটিক হটস্পট তৈরি হচ্ছে— যেখানে তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় গড়ে ৪–৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। গড়িয়া, পাটুলি, কসবা, নিউ টাউন, সল্টলেকের মতো এলাকাগুলি এই তাপমাত্রা বৈষম্যের সবচেয়ে বড় শিকার। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনমান, স্বাস্থ্য, এমনকী শক্তি ব্যবহারের ধরনও পাল্টে যাচ্ছে; এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবহার বাড়ায় আবার বিদ্যুৎচাহিদা ও কার্বন নিঃসরণ বাড়ছে।
এইভাবে, উপগ্রহ বিশ্লেষণ প্রমাণ করছে যে কলকাতা মহানগর আজ এক স্পষ্ট তাপীয় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে— যেখানে উন্নয়ন, নির্মাণ, ও প্রকৃতির ক্ষয় একে অপরের সঙ্গে এক অনিবার্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। যদি অবিলম্বে সবুজ অবকাঠামো, জলাভূমি সংরক্ষণ ও শহর পরিকল্পনায় ‘ক্লাইমেট সেন্সিটিভ’ নীতি না নেওয়া হয়, তবে আগামী দুই দশকে কলকাতা ভারতের সবচেয়ে গরম মহানগরগুলির একটি হয়ে উঠতে পারে।





