সম্পাদকীয়

ছেঁড়া কাপড়ে জীবনের গল্প! বাংলার নারীমনের গোপন নকশা ও ‘নকশিকাঁথা’র ইতিবৃত্ত

শাড়ির পাড় থেকে সুতো তুলে দু-তিনটে সুতো নারীশিল্পী তার ঊরুদেশে হাত দিয়ে, পাক দিয়ে একটি সুতোয় পরিণত করেন।

সুপ্রভাত লাহিড়ী: আমাদের বাংলার লোকশিল্পে মহিলাদের অনন্য কীর্তি সম্বন্ধে আমরা কতখানি অবহিত? প্রায় তো কিছুই জানি না। যে কোনও সূক্ষ্ম, নান্দনিক শিল্পকীর্তিই বুঝি শুধুমাত্র পুরুষদেরই করলগত? দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলি। এপার বাংলার কর্ণসুবর্ণ আর ওপার বাংলার দিনাজপুরের মাঝে শুধুই একটা রেললাইন। যার এ প্রান্তে আমাদের সীমান্তরক্ষী আর ওপারে বাংলাদেশ রাইফেলস। ছোট্ট একতলা বাড়ি, কিন্তু গৃহস্থলি সমৃদ্ধ। সর্বত্র সুরুচির সাক্ষ্য বহন করছে। বসার ঘরের আলমারিটার আচ্ছাদনটা একটা অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে গৃহকত্রী সাবলীল ভাবে উত্তর করলেন ‘ওটা বেতন কাঁথা’। একে একে জানলাম আয়নার ঢাকনিটাও একটি কাঁথা। নাম ‘আরশিলতা’। চায়ের কাপ হাতেই রইল। ঘুরে ঘুরে সব দেখা আর গৃহকত্রীকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা। তিনি যেন এক মহা অপরাধ করে ফেলেছেন। সসঙ্কোচে মৃদুস্বরে তিনি এপক্ষের হাজার রকমের বিস্ময়হত প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন এবং যারপরনাই লজ্জিত হয়ে পড়ছিলেন। এরই মধ্যে গৃহকর্তা ভিতরের ঘর থেকে আনা কাগজের মোড়ক থেকে একটা নকশিকাঁথা বের করে চোখের সামনে মেলে ধরতেই দাঁড়িয়ে পড়তে হল। অপূর্ব অলঙ্করণের ফ্রেমে কটি কথা নকশা করে লেখা— ‘এই কাঁথা, বলে দেনা ওরে, সে যেন ভোলে না মোরে।’

এর পারে বহু ডাকাডাকিতেও গৃহকত্রী পর্দার এপারে আর আসেননি। ‘নকশিকাঁথা; তৈরির জন্য প্রাথমিক ভাবে প্রয়োজন হয় ব্যবহৃত ধুতি ও শাড়ি। শাড়ির পাড় থেকে সুতো তুলে দু-তিনটে সুতো নারীশিল্পী তার ঊরুদেশে হাত দিয়ে, পাক দিয়ে একটি সুতোয় পরিণত করেন। একই ভাবে তিনি নানা রঙের এক-একটি সুতো তৈরি করেন। আবার ওই ধুতি বা শাড়ি মেঝেতে পেতে তার ছেঁড়া অংশে, অন্য একটি কাপড়ের টুকরো দিয়ে ঢেকে দেন। ছেঁড়া অংশগুলি এভাবে ঢাকা হয়ে গেলে তার উপর আর একটি কাপড় বিছিয়ে দিয়ে শেষে আরও একটি কাপড়ের সংযোজন। এর পরে জল ছিটিয়ে জলভর্তি পেতল বা কাঁসার ঘটি দিয়ে অল্প চাপে কাপড়টিকে চারপাশ ‘মুড়ি’ সেলাই করে সেটিকে আড়াআড়ি ভাবে বড় বড় ফোঁড়ে একটি খণ্ডবস্ত্রে রূপ দেন। এইভাবে প্রাথমিক কাজ শেষ হলে শিল্পী সুচিশিল্পের মাধ্যমে তার প্রতিভার প্রকাশ ঘটান নকশার বর্ণনাময় উপস্থাপনে। সৃষ্টি যেমন একাধারে নান্দনিক আবার ব্যবহারিক জীবনের নানা কার্যকলাপের পরিচায়ক। এতে যেমন ব্রত, আলপনা দৃশ্যমান, তেমনই লোকগাথার টুকরো টুকরো স্মৃতিও বহন করে। এই কাঁথায় স্থান পেয়েছে রূপকথা, বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিকৃতি, নানা রকম ফুল, লতা-পাতা, কল্পিত-অকল্পিত নানা বিষয়বস্তু। সেখানে নারী মুক্তচিত্তে সর্বত্র বিচরণ করে বেড়াচ্ছেন। বাস্তবে চোখে দেখা ও কাল্পনিক দৃষ্টিতে ধরে রাখা সব কিছুই স্থান পেয়েছে এই সব নকশিকাঁথায়।

বাংলার মা-দিদিমা-ঠাকুমা-পিসিমাদের কোমল সৃষ্টিশীল ছোঁয়ায় ছেঁড়া ধুতি-শাড়ির এক অবিশ্বাস্য রুপান্তর। এ আমাদের লোকশিল্পের ধারক ও বাহক, যা বাংলার নারীসমাজের পক্ষেই সম্ভব। দৈনন্দিন সাংসারিক কাজের অবসরে বা বিভিন্ন আলাপচারিতার ফাঁকেই বাংলার নারীমনের সচল প্রকাশ। ‘নকশিকাঁথা’ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ব্যক্ত হয় তাদের জীবনের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা,কামনা-বাসনা।