সম্পাদকীয়

পেলে-মারাদোনা, শ্রীদেবী আর ঋতুদাদের স্মৃতিতর্পণে গৌতম ভট্টাচার্য

তবু সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর পোস্ট এবং ওইরকমই মধ্যরাতে টেলিফোনে যেটুকু কথাবার্তা হয়েছে, তাতে বুঝলাম গৌতমদার এবারের স্মৃতিতর্পণ অনেকটা অকপট।

সুমন ভট্টাচার্য: অফিস থেকে বেরিয়ে যাব-বেরিয়ে যাব করছি, এমন সময় ফোনে আনন্দবাজারের তৎকালীন ক্রীড়া সম্পাদকের গলা। গৌতম ভট্টাচার্য খুব ঠান্ডা গলায় বললেন, “তোমরা ভাবছ টেলিভিশনে ব্রেকিং নিউজ দেখিয়ে ক্রিকেট সাংবাদিকতায় আমাকে টেক্কা দেবে? কাল সকালের কাগজটা দেখো।” ফোনটা কেটে গেল বা উনি কেটে দিলেন। কিন্তু ২০ বছর আগের স্মৃতিটা এখনও আমার কাছে টাটকা আছে। আমি ফোন ছেড়ে দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, যে সেই রাতে আর বাড়ি ফিরব না। নিশ্চয়ই আনন্দবাজারের তৎকালীন ক্রীড়া সম্পাদক পর দিন সকালের জন্য এমন কিছু রেখেছেন, যা আমাদের অপ্রত্যাশিত চমক দেবে। এখনও মনে আছে, দুই যুগ আগে মাঝরাতে গিয়ে শিয়ালদা থেকে কাগজ সংগ্রহ করে দেখলাম আনন্দবাজার পত্রিকার আট কলমের ‘সুপার লিড’, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে ভারতীয় ক্রিকেট দল থেকে বাদ দিতে চেয়ে তৎকালীন কোচ গ্রেগ চ্যাপেল বোর্ডকে ই-মেইল করেছেন। সেই সময় সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের যা জনপ্রিয়তা, তাতে বুঝলাম যে, কী বিস্ফোরণ হতে চলেছে! চুপচাপ অফিসে ফিরে এসে, অর্থাৎ, যে টেলিভিশন চ্যানেলে, স্টার আনন্দে আমি তখন কাজ করতাম, সেখানে ঠিক করলাম ভোর বেলা থেকে টেলিফোন লাইন খুলে দেব আর দর্শকদের প্রতিক্রিয়া চাইব যে, সৌরভকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে লোকে কী ভাবছে? যে ‘ওভারবাউন্ডারি’ গৌতম ভট্টাচার্য ওই ‘এক্সক্লুসিভ স্টোরি’ দিয়ে করেছিলেন, তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে এর বেশি বা এর কম কিছুই আমার করার ছিল না বলে এখনও বিশ্বাস করি। ঠিক কত লাখ ফোন সারা দিনে এসেছিল, ঠিক কত হাজার ফোন আমরা স্টুডিওতে অ্যাঙ্করদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছিলাম, সেই হিসেব আমার মনে নেই। কিন্তু আমার বিশ্বাসে, যতটুকু সাংবাদিকতার পাঠ নিয়েছি, গত ৪০ বছরে ক্রীড়া সাংবাদিকতায় এর চাইতে বড় বা বিস্ফোরক ‘এক্সক্লুসিভ’ আর আসেনি।

সেই ‘আইকনিক’ ক্রীড়া সাংবাদিক, যিনি একই সঙ্গে বিনোদন এবং রাজনীতির জগতেও স্বচ্ছন্দে পা রাখেন, যিনি ইমরান খান এবং নেলসন ম্যান্ডেলার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তিনি যখন বইমেলায়, তাঁর নতুন বই, ‘তাহাদের শেষ তর্পণ’ নিয়ে আসেন, তখন কিছুটা আলাদা প্রত্যাশা তৈরি হয়ই। কিন্তু শুক্রবার সন্ধেবেলা পর্যন্ত দেখলাম, প্রকাশক দীপ্তাংশু মণ্ডলও খুব জানেন না যে, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের উপরে ওইরকম ‘এক্সক্লুসিভ’ করা সাংবাদিক এবং একইসঙ্গে ‘বেস্টসেলার’ লেখক গৌতম ভট্টাচার্য এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হতে চলা বইতে কী নতুন চমক রাখছেন! এতটাই হয়তো গোপনীয়তায় নিজের নতুন বইকে মুড়ে রেখেছেন গৌতম ভট্টাচার্য। তবু সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর পোস্ট এবং ওইরকমই মধ্যরাতে টেলিফোনে যেটুকু কথাবার্তা হয়েছে, তাতে বুঝলাম গৌতমদার এবারের স্মৃতিতর্পণ অনেকটা অকপট। এটা তারাদের নয়, তাহাদের শেষ কথা বা ‘তাহাদের শেষ তর্পণ’। অর্থাৎ, যে ‘তাহাদের’ সাংবাদিক হিসেবে, টেলিভিশন সঞ্চালক হিসেবে গৌতম ভট্টাচার্য অন্তরঙ্গভাবে চিনতেন এবং জানতেন তাঁদের জীবনের অনেক খুঁটিনাটি নিয়ে বইটি। সেইজন্যেই কেন অপারেশন করে ঋতুপর্ণ ঘোষ মারা গেলেন বা সুভাষ ভৌমিকের জীবনের নানা রহস্য এই বইতে উঠে আসে। সুভাষ ভৌমিকের গ্রেফতার হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে তাঁর জীবনে এশিয়ান কাপ জয় অনেক ঘটনার সাক্ষী গৌতম দা। এবং যেহেতু সুভাষ ভৌমিককে গ্রেফতারি থেকে বাঁচাতে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির সাহায্য নিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করেননি গৌতম দা, তাই অনুমান করে নিতে পারি, এবারও নতুন বইতে সুভাষ ভৌমিকের কোনও এমন অধ্যায় আসবে, যা আমাদের হতবাক করে দেবে।

খবরের কাগজের সাংবাদিক হন বা টেলিভিশন চ্যানেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক, গৌতম ভট্টাচার্য সবসময়ই খুঁতখুঁতে। আপনাকে মধ্যরাত অবধি জাগিয়ে রাখবেন কোনও পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য জানার জন্য। এই বইতেও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সম্পর্কে লিখবার জন্য বা ‘নিউ-লেফট’ হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম মুখ্যমন্ত্রীর মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি মধ্যরাত পর্যন্ত জেগে জেগে যেসব প্রশ্ন করেন, তা বুঝিয়ে দেয় লেখার বিষয়ে তাঁর খুঁতখুঁতানি বিন্দুমাত্র কমেনি। সেই খুঁতখুঁতানি, সেই সব কিছুকে নিয়েই হয়তো ‘তাহাদের শেষ তর্পণ’। দীপ প্রকাশন থেকে আসন্ন বইমেলায় গৌতম ভট্টাচার্যের লেখা নতুন বই, যা লেখক নিজেই কবুল করে নিয়েছেন এক মাসে ৬৭ হাজার শব্দ কীভাবে লিখলেন, তা তিনি নিজেই জানেন না! ধারাভাষ্যকার হিসেবে তাঁর বন্ধু এবং হয়তো কখনো-কখনো কমেন্ট্রি বক্সে তাঁর সহযোগী হর্ষ ভোগলের উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছেন, হর্ষ আর বই লিখতে চান, বরং রিল করে নিজের ঝামেলা বা নিজের বক্তব্য দুটোই সামলে নিতে চান। কিন্তু গৌতম ভট্টাচার্য রিল, টেলিভিশন সঞ্চালনা, এই সব কিছুর পাশাপাশি এখনও লেখার কথা ভাবেন এবং বইমেলায় তাঁর চেনাজানা সেলিব্রিটিদের সম্পর্কে লিখবেন বলে রাতের পর রাত জেগে ৬৭ হাজার শব্দ কম্পিউটার বন্দি করে ফেলতে পারেন! এই অধ্যবসায়, এই নিষ্ঠা, এই একাগ্রতাই বা কোথায় আজকের সমাজজীবনে এবং অবশ্যই সাংবাদিক জীবনে? এই জন্যই গৌতম ভট্টাচার্য অনুকরণীয় এবং বেস্ট সেলার লেখক।

কেন গৌতম ভট্টাচার্যের এই বই নিয়ে লিখছি? তিনি ‘বেস্টসেলার’ লেখক বলে নাকি তাঁর এই বইতে শ্রীদেবী থেকে ঋতুপর্ণ ঘোষ, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থেকে সুভাষ ভৌমিক, ইডেনের মাঠের কিউরেটর প্রবীর মুখোপাধ্যায় থেকে আরও অনেক চরিত্র উঠে এসেছে বলে? না, আমার কাছে এর চাইতে অনেক বেশি বিচার্য বিষয়, যেটা গৌতম ভট্টাচার্য মধ্যরাতে টেলিফোনে আলোচনা করতে করতে বলেছিলেন। সাধারণত যে-কোনও মানুষের মৃত্যুর পর আমরা তাঁকে প্রশংসায় ভরিয়ে তুলি। খুব কম লোক আছেন, যে তারপরেও তার বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করতে পারেন। আমার নিজেরই কতজনের ‘অবিচুয়ারি’ লিখতে গিয়ে মনে হয়েছে যে, এই প্রসঙ্গটা বাদ দিয়ে দিই। শুধু শুধু মৃত্যুর পর তাঁকে বিতর্কে টেনে আনব কেন? গৌতম ভট্টাচার্য কিন্তু এবারের বইমেলায় তাঁর বই ‘এক্সপেরিমেন্ট’-এর সময় সেই ঝুঁকিটা নিয়েছেন। অর্থাৎ, সেই প্রয়াত ব্যক্তির জীবনে বিতর্কিত অধ্যায় বা যে ঘটনাটা তাঁকে এবং সমাজকে নড়িয়ে দিয়েছিল, সেই ঘটনাটিকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। একজন পুরুষের শরীরে বাস করা নারী, এই পরিচয়টা ঋতুপর্ণ ঘোষকে কতটা ভোগাচ্ছিল বা ভাবাচ্ছিল, কেন তাঁকে বারবার শল্য চিকিৎসকের ছুরি-কাঁচির সামনে পড়তে হয়েছে—এইসব প্রশ্নগুলিকে মেলে ধরতে বা তুলে ধরতে কোনও দ্বিধা করেননি। কিংবা সুভাষ ভৌমিকের বিতর্কিত আত্মজীবনী, যে আত্মজীবনীরও সম্পাদনা তিনিই করেছিলেন। এই সব কিছুকে নিয়েই গৌতম ভট্টাচার্যের নতুন বই দীপ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলা ‘তাহাদের শেষ তর্পণ’। নিশ্চয়ই হয়তো ‘অবিচুয়ারি’ লেখার বা স্মৃতিচারণ লেখার এক নতুন ধারা তৈরি করবে গৌতম ভট্টাচার্যের এই বই।