সম্পাদকীয়

বাংলাদেশে কি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হবে?

দেখেছিলাম ছাত্রেরা, সাধারণ মানুষরা যদি রাস্তায় নেমে আসে, তাহলে জনপ্রিয় সরকারের কী হতে পারে!

সুমন ভট্টাচার্য (বিশিষ্ট সাংবাদিক): ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমরা আমাদের পুবের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এক উত্তাল পালাবদল আমরা দেখেছিলাম। যেসব দৃশ্য যে কোনও দেশের জন্য শুধুই কলঙ্কের, চিন্তার বার্তা বয়ে আনে। একবার নয়, বারবার। একই সঙ্গে আমরা দেখেছিলাম কোনও শাসক যদি মানুষের মতামতকে অপমান করে, সবাইকে ভোট না দিতে দেয় তাহলে তার কী দশা হতে পারে! দেখেছিলাম ছাত্রেরা, সাধারণ মানুষরা যদি রাস্তায় নেমে আসে, তাহলে জনপ্রিয় সরকারের কী হতে পারে!

দেশের প্রধানমন্ত্রীকে তড়িঘড়ি হেলিকপ্টারে দেশ ছেড়ে বেরিয়ে যেতেও আমরা দেখেছিলাম। যে ঘটনা ছাত্র আন্দোলনের নামে, কোটা বিরোধী বিক্ষোভের কারণে শুরু হয়েছিল, সেই আন্দোলন যখন সরকারে বসল, তখন তারা মৌলবাদী গোষ্ঠী জামাতের নিয়ন্ত্রণাধীন হতে শুরু করল। যাঁরা গণতন্ত্রের অপমানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে রাস্তায় নেমেছিল, তাঁরা নিজেরাই পরবর্তীকালে গণতন্ত্রের স্তম্ভগুলিকে ভাঙতে শুরু করল। বিপরীত ধর্ম, বিপরীত মতাবলম্বী মানুষের প্রাণ নিতে, নারীদের ধর্ষণ করতে, বাড়িতে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিতে এই মৌলবাদী শক্তিদের হাত এতটুকুও কাঁপেনি। হাসিনা সরকার পতনের পর যেমন আওয়ামি লিগের জনপ্রতিনিধি, নেতা কর্মীদের বাড়িতে আক্রমণ করা হয়, জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বহু ঘর, তেমনই সংখ্যালঘুদের উপরেও অত্যাচার বাড়তে থাকে।

হাসিনা সরকার পতনের পর বাংলাদেশে যে অন্তর্বর্তী সরকার চলছে, তা জামাতের নিয়ন্ত্রণেই চলছে। সেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুস। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনুসের এক বছরের শাসনপদ্ধতি দেখার পর এবং বাংলাদেশের বর্তমান পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দেখে মনে অনেক প্রশ্ন জেগে ওঠে। সেটা হল, শান্তিতে নোবেল পাওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনুসের রাজত্বে কি বাংলাদেশে শান্তি ফিরে এসেছে বা অদূর ভবিষ্যতেও কি আসতে পারে? সবারই বক্তব্য নেতিবাচক!

বাংলাদেশের শেখ হাসিনার সরকারের উপর যে অভিযোগ করা হয়েছিল, তা হল ভোটে কারচুপির। ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮, বাংলাদেশের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আওয়ামি লিগ সেই নির্বাচনে জেতে এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন। সমস্যা তৈরি হয় তার পরের নির্বাচন থেকেই। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা চিনের শি জিন পিং বা রাশিয়ার পুতিনের মতো ক্ষমতা ছাড়তে কোনওমতেই রাজি হলেন না, আস্তে আস্তে ভোট টাকে প্রহসনে পরিণত করে দিলেন। বাংলাদেশে ২০০৮ সালের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোনও নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই কোথাও কোনও রাষ্ট্রে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে, সেখানেই মাথাচাড়া দিয়েছে প্রতিবাদী শক্তি এবং সেই প্রতিবাদী শক্তির কাছে ক্ষমতাকে আত্মসমপর্ণ করতেই হয়েছে। এখনও শি জিন পিং বা পুতিনের বিরুদ্ধে সেরকম প্রতিবাদী শক্তি মাথাচাড়া দেয়, কিন্তু তারা একনায়ক বলে তা কঠোর হাতে দমন করেন। কিন্তু চিন বা রাশিয়ার মতো রাষ্ট্রে প্রতিবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিলেও তা দমন করার ক্ষমতা সেখানকার শাসকদের রয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা ভুলে গিয়েছিলেন যে তাঁর পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও একদিন মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জনসংগঠন তৈরি করে পশ্চিম পাকিস্তানের একনায়কতন্ত্রকে সমূলে উৎপাটিত করেছিলেন।

দীর্ঘদিন বাংলাদেশে নির্বাচন হতে না দেওয়া, জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া, বাংলাদেশের জনগণকে খেপিয়ে তুলতে সাহায্য করে, যার ফলশ্রুতি হিসেবে দেখা দেয় ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব। আর এই তথাকথিত জুলাই বিপ্লবের উপর ভর করে, জামাত এবং মার্কিন মদতের উপর আস্থা রেখে, বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মাথায় এসে বসলেন, বলা ভালো শাসন কুক্ষিগত করলেন ড. মুহাম্মদ ইউনুস। দুঃখের বিষয়, মুহাম্মদ ইউনুস বাংলাদেশের শাসনের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার পর বাংলাদেশে আরও বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, মৌলবাদের উত্থান হয়েছে গোটা বাংলাদেশ জুড়ে, তাঁর দেওয়া সমস্ত প্রতিশ্রুতি এখনও পর্যন্ত মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনুস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় যেসব প্রতিশ্রুতিগুলি দেশের সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে দিয়েছিলেন, গণঅভ্যুত্থানের ১৪ মাস কেটে যাওয়ার পরও সেগুলির কোনওটাই তিনি করে উঠতে পারেননি। না তিনি দেশের কোনও প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কার করতে পেরেছেন, না তিনি নির্বাচন করাতে পেরেছেন এত দিনে। উলটে বাংলাদেশের প্রশাসনিক পরিকাঠামো তো বটেই, সামাজিক পকিকাঠামো আরও ধসে গিয়েছে। বাংলাদেশের সংশোধনাগারে যেসব জঙ্গি, ধর্ষক, উগ্রবাদীরা বন্দি হিসেবে জেল খাটছিল, ইউনুস প্রশাসন তাদের মুক্ত করেছে। নির্বাচনের প্রশ্ন উঠলেই তিনি প্রতিবার এড়িয়ে গিয়েছেন, সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার চরম মাত্রায় পৌঁছেছে, আওয়ামি লিগ সহ আরও যে ১৪টি দল রয়েছে, সেইসব দলের সদস্যদের অধিকাংশকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের উপর ধর্ষণ, নির্যাতন, হত্যার ঘটনা মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। যদি নৈরাজ্য সৃষ্টিই মুহাম্মদ ইউনুসের প্রধান লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে এই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রয়োজনটা কোথায়?

যদি অনেক জল্পনার পর মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা করেছে, যে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন হবে। সেখানেও একটা প্রশ্ন উঠেই যায়, যে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও, সেটা কতটা নিরপেক্ষভাবে, কতটা সুষ্ঠুভাবে, কতটা অবাধ ভাবে সংগঠিত হবে তা আমরা কেউ জানি না। আওয়ামি লিগও বারবার এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কিন্তু তাঁদেরও মনে রাখা প্রয়োজন, যে, তাঁরা যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তাঁরা কী করেছিলেন? ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন তাঁরাও কি হতে দিয়েছিলেন ?

মার্কিনি ডলার ও জামাতের সক্রিয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান, মুহাম্মদ ইউনুস যে বাংলাদেশকে পূর্ব পাকিস্তানে পরিণত করতে চান, সেটা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মজার বিষয়, যাদের অঙ্গুলিহেলনে বাংলাদেশে গণ অভ্যুত্থান হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়, সেই আমেরিকা প্রভাবিত ওপিনিয়ন পোল অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত, নিষিদ্ধ বাংলাদেশে আওয়ামি লিগের কাছে ২০ শতাংশ ভোট রয়েছে। বাংলাদেশের ৮টি ডিভিশনের মধ্যে ১টি ডিভিশন অর্থাৎ, বরিশাল ডিভিশনে ইউনুসের কিংস পার্টির কোনও অস্তিত্বই নেই, সেখানে আওয়ামি লিগই এখনও প্রধান দল। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, আদৌ বাংলাদেশে ২০২৬ সালে নির্বাচন হবে কিনা?

তার থেকেও বড় কথা ড. মুহাম্মদ ইউনুস কি নির্বাচন চান নাকি তিনিই শাসনক্ষমতা ধরে রাখতে চান নিজের হাতে? এই মুহূর্তে যারা বাংলাদেশে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি, সেই বিএনপির প্রধান তারেক রহমানও কিন্তু লন্ডনে বসে আগেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন আদৌ বাংলাদেশে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হবে কিনা। কারণ, মুহাম্মদ ইউনুস তাঁর সঙ্গে বৈঠক করতে গিয়ে একরকম কথা বলছেন, বাংলাদেশে ফিরে এসে অন্য কথা বলছেন, সংবিধান সংশোধনের দাবি তুলছেন। তাই তারেক রহমানও হয়তো চিন্ত্বান্বিত। প্রশ্ন এখন একটাই, মুহাম্মদ ইউনুস কি সত্যিই ভোট চান? তিনি কি তাঁর প্রিয় পাত্র এনসিপি-র নাহিদ ইসলামের জায়গায় অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী রূপে দেখতে চান?

প্রশ্ন আরও একটা ওঠে এবং সেটা ভারতবর্ষের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, বাংলাদেশ এখন কোন পথে এগোতে চায়? আসলে আমরা জানতে চাই, মুহাম্মদ ইউনুস বাংলাদেশকে কোন পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান? তিনি যদি বাংলাদেশকে বাংলাদেশই রাখতে চান, তাহলে তাঁকে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনের সমস্ত প্রক্রিয়া করতে হবে এবং ভোটদান যাতে নিরপেক্ষভাবে হয় সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। নির্বাচনে বিরোধীদের জায়গা করে দিতে হবে এবং তাদের সঙ্গে ভোটপ্রচার সংক্রান্ত আলোচনাতেও তাঁকে বসতে হবে। কিন্তু তিনি যদি নির্বাচন না করেন, তাহলে বুঝে নিতে হবে তিনি নিজের একাধিপত্য কায়েম করতে চান এবং জামাতিদের হাত ধরেই বাংলাদেশকে পুনরায় পূর্ব পাকিস্তানে পরিণত করতে চান। আগামী বছর যদি বাংলাদেশে নির্বাচন সংগঠিত না হয় বা হলেও যদি সুষ্ঠুভাবে তা সম্পন্ন না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক অবস্থার দিকে মোড় নিতে পারে। বাংলাদেশে যদি অস্থিরতা বাড়ে, মৌলবাদ মাথা চাড়া দেয়, তাহলে বিপদ সবার।

Related Articles