Gaurkishore Ghosh: গৌরকিশোর ঘোষ: কলম ছিল যার প্রতিবাদের ভাষা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই ভয়ঙ্কর সময়ে গৌরকিশোর কেবলমাত্র ম্যাট্রিকুলেশন ডিগ্রি নিয়ে কোনও চাকরি জোগাড় করতে পারলেন না।
রাজু পারাল: স্বাধীনতার পর যে ক’জন মুষ্টিমেয় সাংবাদিক তথা ভাষ্যকার সাহসিকতার সঙ্গে মুক্তচিন্তার অনুকূলে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করেছেন, গৌরকিশোর তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বাংলা সাংবাদিকতার জগতে তিনি ছিলেন একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। গৌরকিশোর ঘোষ ছিলেন যুক্তিবাদী, প্রগতিবাদী এবং সর্বার্থে একজন উদার মনের মানুষ। রাজনৈতিক মতাদর্শে তিনি ছিলেন মানবেন্দ্রনাথ রায়ের অনুসারী। প্রকৃত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। বামপন্থী মতাদর্শে যেমন শ্রদ্ধা ছিল, তেমনই অনুরাগী ছিলেন গান্ধীজি ও রবীন্দ্রনাথের। আপামর মানুষের প্রতি রাখতেন পূর্ণ বিশ্বাস। সর্বস্তরের, সর্বধর্মের, সর্বলোকের মানুষই ছিল তাঁর কাছের মানুষ। সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের অনেক প্রতিষ্ঠিত মানুষের সঙ্গে ছিল তাঁর বন্ধুত্ব। কিন্তু কখনও কোন ও পক্ষপাত ছিল না। তাঁর পরিচিতদের আবর্তে ছিলেন সন্তোষকুমার ঘোষ, বরুণ সেনগুপ্ত, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, শচীন দেববর্মন, জ্যোতির্ময় দত্ত প্রমুখ (Gaurkishore Ghosh)।
সংবাদিক তথা সাহিত্যিক গৌরকিশোরের জন্ম ১৯২৩-এর ২০ জুন, বাংলাদেশের যশোর জেলার হাটগোপালপুরে। পরে তাঁরা চলে আসেন এই বাংলায়। গৌরকিশোরের প্রাথমিক পাঠ শুরু হয় শ্রীহট্ট জেলার এক চা বাগানে। পরবর্তীকালে নবদ্বীপ বকুলতলা হাইস্কুলে গৌরকিশোর ভর্তি হন পঞ্চম শ্রেণিতে। এখান থেকেই পাস করেন ম্যাট্রিকুলেশন। দারিদ্র ছিল পরিবারের নিত্যসঙ্গী। তাই আঠারো বছর বয়সে পড়াশোনা বন্ধ করে সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব নিতে হয়েছিল গৌরকিশোরকে। গৌরকিশোরের বাবা গিরিজাভূষণ ছিলেন স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক। আর মা সাধনাদেবী ছিলেন অবস্থাপন্ন দেওয়ান বাড়ির মেয়ে। তবে কখনও বিত্তশালী পিত্রালয়ের সাহায্য নেননি। প্রবল আত্মসম্মানবোধ এবং লড়াই করার মানসিকতা ছিল তাঁর মধ্যে। পরবর্তীকালে গৌরকিশোর সম্ভবত তাঁর মায়ের ওই গুণগুলি পেয়েছিলেন। দারিদ্র ছিল গৌরকিশোরদের পরিবারের নিত্যসঙ্গী। তাই গৌরকিশোরকে মাত্র আঠারো বছর বয়সেই সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব নিতে হয়। পুত্র গৌরকিশোরের লড়াইয়ের পাশে সর্বদাই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি (Gaurkishore Ghosh)।
আরও পড়ুন: Flood Alert: বন্যা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই ভয়ঙ্কর সময়ে গৌরকিশোর কেবলমাত্র ম্যাট্রিকুলেশন ডিগ্রি নিয়ে কোনও চাকরি জোগাড় করতে পারলেন না। তাই তিনি এমন সব কাজ বেছে নিলেন যেগুলির জন্য কোনও শিক্ষাগত শংসাপত্রের প্রয়োজন লাগে না। পয়সা রোজগারের তাগিদে ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, ফিটার, গৃহশিক্ষক, প্রুফ রিডার, জাহাজের খালাসি, হোটেলের ওয়েটার, নাচের গ্রুপের ম্যানেজার, কেরানি ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের কাজ তিনি করেছেন। এসব কাজ করতে করতে তিনি অসংখ্য মানুষের সান্নিধ্যে আসেন। তখন থেকেই শুরু হয়েছিল মানুষের প্রতি তাঁর টান। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সে টান তাঁর কমেনি। ধীরে ধীরে মানবকল্যাণে নিজেকে উজাড় করে দিলেন গৌরকিশোর। এক সময় নবদ্বীপ বকুলতলা হাইস্কুলের তরুণ ইংরেজি শিক্ষক গৌরীপ্রসাদ বসুর সংস্পর্শে আসেন গৌরকিশোর। তিনি গৌরকিশোরকে সমগ্র বিশ্বপাঠের সন্ধান দেন। সে সময়েই গৌরকিশোর মাস্টারমশাইয়ের উৎসাহে ও আগ্রহে যোগ দেন নিষিদ্ধ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনে। প্রশাসনের বিরোধিতা করার প্রাথমিক পাঠ গৌরকিশোর নিয়েছিলেন মাস্টারমশাই গৌরীপ্রসাদের কাছ থেকেই। ব্রিটিশ শাসনকালে নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য হয়ে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন গৌরকিশোর। তার জন্য গৌরকিশোর জেল খেটেছেন, মার খেয়েছেন, ব্রিটিশ পুলিশের তাড়া খেয়ে পালিয়ে বেরিয়েছেন। কাজের সূত্রে তিনি দেখেছিলেন, কীভাবে কমিউনিস্ট পার্টি স্বাভাবিক নেতৃতকে গলা টিপে হত্যা করে নিজেদের স্বার্থ কায়েম করার হিংস্র চেষ্টা চালিয়ে যায়। গৌরকিশোর তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘সাগিনা মাহাতো’-তে তুলে ধরেছেন কমিউনিস্ট পার্টি কীভাবে নিজেদের প্রয়োজন ফুরোলে কমরেডদের ছুড়ে ফেলে দেয়। গৌরকিশোর পার্টি ছেড়ে দিলেন একসময়। তবে পার্টি ছেড়ে দিলেও সারাজীবন আঁকড়ে ধরে রইলেন মানবতাবাদকে। তাই ১৯৭৫ সালের ১১ ডিসেম্বর জেলবন্দি থাকা অবস্থায় ডায়রিতে লিখেছিলেন, ‘‘চণ্ডীদাসের ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ এই সত্য আমাদের চিত্তে উদ্ভাবিত হোক, সদা ভাস্বর হয়ে উঠুক।’’ আজীবন গৌরকিশোরের এই মানবতাবোধই ছিল তাঁর চালিকাশক্তি (Gaurkishore Ghosh)।
পরে সাংবাদিকের জীবিকায় আসেন গৌরকিশোর। যোগ দেন ‘সত্যযুগ’ পত্রিকায়। তারও পরে যোগ দেন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য়। দ্রুত সেখানে উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত হন। অতঃপর সাংবাদিকতা সংক্রান্ত কাজই করেছেন, আর রচনা করেছেন ব্যতিক্রমী সব কথা সাহিত্য। ১৯৫২-তে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস। ১৯৬৯-এ চা বাগানের শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার আন্দোলন নিয়ে লিখেছিলেন ‘সাগিনা মাহাতো’। যে গল্পটিকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন পরিচালক তপন সিংহ। ১৯৭০-এ নকশালবাড়ি আন্দোলনের মতাদর্শের বিরুদ্ধে এবং তাদের হত্যার প্রবণতা ও বিভ্রান্তির বিপক্ষে লেখায় তাঁকে প্রাণনাশের ভয় দেখানো হলেও তিনি তা গ্রাহ্য করেননি। আবার নকশালপন্থী যুবকদের প্রতি পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধেও তিনি সরব হয়েছিলেন। দেশে জরুরি অবস্থা জারি হলে তার প্রতিবাদ করায় কারাদণ্ডও ভোগ করেন গৌরকিশোর। সেই পরিস্থিতিকে ধিক্কার জানিয়ে নিজের মাথা ন্যাড়া করেন। বাবরি মসজিদ ধংস হওয়ার পর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার কাজে কলকাতার স্পর্শকাতর অঞ্চলগুলিতে তিনি ঘুরে বেড়াতেন। তিনি দলমতের ধার ধারতেন না কোনওসময়েই। এক সময় তাঁকে সিআইএ-এর এজেন্ট বলা হয়েছে। জরুরি অবস্থার সময় তাঁর বাড়িও সার্চ করা হয়েছে (Gaurkishore Ghosh)।
Truth of Bengal fb page: https://www.facebook.com/share/1DpmwTbAnA/
আশির দশকের শুরুতে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ ত্যাগ করে কয়েকজন বন্ধু মিলে চালু করেন ‘আজকাল’ পত্রিকা। তার পরেও ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় বিভিন্ন লেখা লিখেছিলেন স্বাধীনভাবে। পুরোদস্তুর স্বপ্নদ্রষ্টা, নিজের বিশ্বাসে অনড় এই মানুষটি সারাজীবন লিখে গেছেন অসংখ্য গল্প ও উপন্যাস। লেখক জীবনে ব্যবহার করেছেন ‘রূপদর্শী’ ও ‘গৌড়ানন্দ কবি’ ছদ্মনাম দুটি। গৌরকিশোরের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গল্প ও উপন্যাস হল- সাগিনা মাহাতো, এই দাহ, কমলা কেমন আছে, মনের বাঘ, এক ধরনের বিপন্নতা, দুজনে, গড়িয়াহাট ব্রিজের উপর থেকে, জল পড়ে পাতা নড়ে, প্রতিবেশী, প্রেম নেই…ইত্যাদি। গৌরকিশোরের লেখা কাহিনি অবলম্বনে মহানায়ক উত্তমকুমার অভিনীত ‘ব্রজবুলি’ নির্মিত হয়েছিল (Gaurkishore Ghosh)।
জীবনে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জন্য অনেক স্বীকৃতি ও সম্মাননা পেয়েছেন গৌরকিশোর। তার মধ্যে ‘আনন্দ’ পুরস্কার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে প্রদত্ত আন্তর্জাতিক ‘ম্যাগসেসে’ পুরস্কার উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তাঁর যথেষ্ট ভাল যোগাযোগ ছিল। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ মহম্মদ ইউনুসের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ছিল। আজ তিনি স্বশরীরে না থাকলেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম থেকে যাবেন মানুষের অন্তরে।






