ভবেশ কালি থেকে বড়মার কালী নৈহাটির বড়মার মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্য ছাড়িয়ে দেশ
From Bhavesh Kali, the greatness of Barama Kali Naihati has spread beyond the state and country

Truth of Bengal, প্রশান্ত দাস গুপ্ত, নৈহাটি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মস্থান হিসাবে পরিচিত নৈহাটি। বিশিষ্ট গায়ক শ্যামল মিত্র থেকে শুরু করে একাধিক বিশিষ্টজন জন্মগ্রহণ করেছেন উত্তর ২৪ পরগনা জেলার এই শহরে। রাজ্য তথা দেশের অন্যতম প্রাচীন শহর হিসেবে পরিচিতি রয়েছে নৈহাটির। বর্তমানে এই নৈহাটির নাম রাজ্য তথা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে আরো একটি বিশেষ কারণে। এই নৈহাটিতেই জাগ্রত বড়মার মন্দির।
প্রতিদিন বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ আসেন মাকে পুজো দেওয়ার জন্য। মায়ের মাহাত্ম্য মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে চতুর্দিকে। মায়ের কাছে কোন বিষয়ে মানত করলে মা তা পূরণ করে দেন। আর সেই থেকেই দ্রুততার সঙ্গে বড়মার প্রচার সর্বত্রই। একটা সময় নৈহাটির বারোয়ারি পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল বড়মার কালী পুজো। তবে এই পুজো আগে এত জনপ্রিয় ছিল না। রাস্তার ধারে রক্ষাকালী মূর্তিতেই পুজো করতেন একদল যুবক।
নৈহাটির পুরনো বারোয়ারী পুজো গুলির মধ্যে অন্যতম এই পুজো। গঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকায় ঋষি অরবিন্দ রোডে এই পুজো আয়োজন হতো। ধীরে ধীরে এ প্রচার এমন পর্যায়ে পৌঁছায় স্থায়ী মন্দির নির্মিত হয়। মন্দিরে পুজোর আয়োজন হলেও বারোয়ারি পূজো বজায় রয়েছে। নৈহাটিতে বড়মায়ের একটি স্থায়ী মন্দির রয়েছে। সেখানে নিয়মিত পুজো হলেও পূর্বে যে জায়গায় রক্ষাকালী পুজো করা হত কালীপুজোয়, সেখানেই প্রতিবছর মৃন্ময়ী রূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেখানেই পুজো করা হয়। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় খুঁটিপুজো করা হয়।
তারপর স্থানীয়দের মতে, এই পুজো সার্বজনীন হলেও কারও কাছ থেকে কখনও চাঁদা বা দক্ষিণা নেওয়া হয় না। দেবীর গায়ের গয়না থেকে ভোগ, পুজোর সামগ্রী,পুজোর সমস্ত খরচ করে থাকেন সাধারণ ভক্তরা। বাংলায় আরও এক বিখ্যাত ও জাগ্রত দেবী কালী হলেন নৈহাটির বড়মা। এক অমোঘ টানে প্রতি বছর হাজার হাজার ভক্ত মানত করেন, পুজো দেন, ভিড় করেন একঝলক শুধু দেখার জন্য। নৈহাটির অরবিন্দ রোডের ধর্মশালা বড় কালী ঠাকুরকেই স্থানীয়রা বড়মা বলে ডাকেন।
সেই থেকেই চারিদিকে ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর কাহিনি। বড়মা কেন নাম? নৈহাটির বড়মার নামকরণ হয়েছে এক বিশেষ কারণে। এই কালী মূর্তির আকারে ও উচ্চতায় বিরাট, প্রায় ২১ ফুটের কাছাকাছি উচ্চতা। প্রায় ধরুন ১৪ হাত উঁচু একটি কালীমূর্তি। এই কারণে এই দেবীকে বড়মা বলে ডাকেন সকলে। কালীপুজোর সকাল থেকেই এই ঐতিহ্যবাহী পুজোয় হাজার হাজার মানুষের ভিড় হয়। বহু ভক্ত দণ্ডি কাটেন।
মনোবাসনা পূরণ করার জন্য গঙ্গাস্নান করে মন্দির পর্যন্ত দণ্ডি কাটেন। কবে থেকেই পুজোর সূচনা হল? কারা করলেন নৈহাটির বড়মার কালীপুজোর সূচনা? স্থানীয় বর্ষীয়ান নাগরিকরা জানান নৈহাটি চার যুবকের হাত ধরে এই পুজো প্রথম শুরু হয়েছিল। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে, ভবেশ চক্রবর্তী ও তাঁর চার বন্ধু মিলে নবদ্বীপে ভাঙা রাস দেখতে যান। সেখানে গিয়ে বড় বড় মূর্তি দেখে চোখ ওঠে কপালে। বিস্মিত হয়ে বড় বড় মূর্তি দেখে নৈহাটিতে একটি রক্ষাকালী মূর্তিকে বিশালাকার মূর্তি গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
কথিত আছে, এই পুজো ভবেশ চক্রবর্তী স্থাপন করেছিলেন, তাই এই দেবীকে ভবেশ কালীও বলা হয়। প্রথমে সকলে ভবেশ কালীই বলে ডাকতেন, তারপর বিশালাকার মূর্তিকে বড়মা বলে অভিহিত করেন। বড়মার মাহাত্ম্য যেভাবে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে তখন পূজো কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে একটি স্থায়ী মন্দির স্থাপনের। সেই মতো শুরু হয় সব ধরনের প্রস্তুতি। যেখানে বারোয়ারি পুজো আয়োজন হয় সেখানেই জমি মন্দিরের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়।
তারপর শুরু হয় মন্দির নির্মাণের কাজ। সেই কাজ এগোতে থাকে। ১৪ বছরের প্রয়াস অবশেষে বাস্তবায়িত হয়। নৈহাটির বড়মা কালীর নতুন মন্দিরে এসে পৌঁছায় কষ্টি পাথরের তৈরি বড়মার মূর্তি। তবে এই মূর্তি মন্দিরে এলেও তা দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয় আরো অনেক পরে। কয়েকদিন ধরে চলে শুদ্ধিকরণ ও প্রতিষ্ঠার কাজ। বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়েছিল। আর তারপরেই সর্বসাধারণের দর্শনের জন্য খুলে দেওয়া হয় নবনির্মিত মন্দির। কষ্টিপাথরের বড়মার মূর্তিও খুব অল্প সময়ের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ভক্ত সমাগম প্রতিদিন বাড়তে থাকে।
কালীঘাট, তারাপীঠ, দক্ষিণেশ্বর যেমন জনপ্রিয় কালী মন্দির গুলির মধ্যে অন্যতম তেমনি বড়মার মন্দির এখন সেই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে বলা যায়। অরবিন্দ রোড সকাল থেকেই ভক্তবৃন্দের ভিড়ে জমজমাট থাকে। সকাল থেকে সন্ধ্যা এই মন্দিরকে ঘিরে দর্শনার্থীদের মধ্যে এক উন্মাদনা দেখা যায়। যেমন তারাপীঠ, কালীঘাট বা দক্ষিণেশ্বর ধর্মীয় স্থান হিসেবে রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে এখন নৈহাটিও সেই একই জায়গা করে নিয়েছে
নৈহাটির বড়মা নামটাই এখন যথেষ্ট। এবর বছর নৈহাটির জাগ্রত এই বড়মার পুজো ১০১ বছরে পা দিতে চলেছে। সেই উপলক্ষে আগেই কাঠামো পুজো হয়ে গিয়েছে। মন্ত্রোচ্চারণ এবং ধর্মীয় আচার মেনে আয়োজিত হয় মায়ের কাঠামো পুজো। ভক্ত সমাগমে কার্যত মুখরিত হয়ে উঠেছিল বড়মার মন্দির সংলগ্ন অরবিন্দ রোড । ভক্তদের জন্য সকাল থেকেই ওইদিন মন্দিরের ফটক বন্ধ রাখা হয়েছিল।
মায়ের গয়না পরিবর্তন ও সংস্কার-সহ বেশ কিছু কাজের জন্য মন্দির কমিটি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ভাবছেন এবার কালীপুজোয় কোথায় বেড়াতে যাবেন। তাহলে চলে আসুন এবছর নৈহাটিতে বড়মার কালীপুজোয়। বড়মার এই জনপ্রিয়তা এবং বিখ্যাত হয়ে ওঠার পিছনে যে রহস্য তা সামনে থেকে অনুধাবন করুন। মায়ের মাহাত্ম্য দেখুন সামনে থেকে। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে রানাঘাট শাখার যে কোন ট্রেনে চেপে নৈহাটি স্টেশনে নামুন।
অথবা শিয়ালদহ থেকে নৈহাটি লোকাল ধরে নৈহাটি পৌঁছান। যারা হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরতে চান তাঁরা চুঁচুড়া স্টেশনে নামুন। সেখান থেকে অটো বা টোটো তে ফেরিঘাট পৌঁছান। নৈহাটি-চুঁচুড়া ফেরিঘাট। ঘাট পার হলেই বড়মার মন্দির পেয়ে যাবেন। এখন নৈহাটিতে থাকার জন্য একাধিক হোটেল নির্মিত হয়েছে। খাবারের জন্য রয়েছে ভালো ভালো রেস্টুরেন্ট। পুণ্যার্থীদের থাকার জন্য তৈরি হয়েছে লজ। তাহলে দেরি কেন, এবার কালীপুজো আপনার ডেস্টিনেশন হোক নৈহাটি বড়মার কালী।






