
বিকাশ ঘোষ: ২০২৪-এ লোকসভা নির্বাচন। তার আগে পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন রয়েছে। আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগঢ়, তেলঙ্গানা ও মিজোরামে ভোট। এই নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে অনেকটাই কোণঠাস অবস্থা বিজেপির। একাধিক রাজ্য হাতছাড়া হয়েছে কেন্দ্রের শাসক দলের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক। দক্ষিণ ভারতে আর কোন রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতাই নেই। দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ক্ষমতায় বিরোধীরা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, দিল্লি, পাঞ্জাব, কর্ণাটক, ঝাড়খন্ড, তামিলনাড়ু, রাজস্থান, ছত্রিশগড়, হিমাচল প্রদেশ, ওড়িশা, কেরালা।
মহারাষ্ট্রও বিজেপির হাতছাড়া হয়েছিল। গত বিধানসভা নির্বাচনে মধ্যপ্রদেশেও পরাজিত হয়েছিল বিজেপি। মহারাষ্ট্রে পদ্ম শিবির ক্ষমতায় ফেরে শিবসেনাকে ভাঙিয়ে। তার আগে মণিপুর, মধ্যপ্রদেশে একইভাবে ক্ষমতায় এসেছিল গেরুয়া শিবির। ২০১৮-তে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়-সহ পাঁচ রাজ্যে ভোট হয়। বিজেপি একটিতেও ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসের বিধায়ক ভাঙিয়ে ফের ক্ষমতা দখল করে। মধ্যপ্রদেশে তারা কংগ্রেস নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকে পাশে পেয়ে গিয়েছিল। একক ক্ষমতায় বিজেপির দখলে আছে উত্তর প্রদেশ, গুজরাট সহ হাতেগোনা কয়েকটি রাজ্য। উত্তর প্রদেশে বিজেপির সেই আগের শক্তি আর নেই। অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে যোগী আদিত্যনাথকে। সম্প্রতি উপনির্বাচনে সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী বিজেপিকে পরাস্ত করেছে। ভোটে জিতে একক শক্তিতে সরকার আছে শুধু ছয়টিতে।
কংগ্রেস মুক্ত ভারত গড়ার ডাক দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। অমিত শাহ, জে পি নাড্ডারা হুঙ্কার দিয়েছিলেন গোটা দেশে গেরুয়া পতাকা ওড়ানোর। কিন্তু একের পর এক রাজ্যে বিজেপির প্রতি মানুষ অনাস্থা জানিয়েছে। এরই মধ্যে ২০২৪ এর লোকসভা ভোটকে সামনে রেখে বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বিরোধী দলগুলি গড়ে তুলেছে ‘ইন্ডিয়া’ জোট। এই নয়া জোটে দলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ টি। এই জোটে রয়েছে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, জনতা দল ইউনাইটেড (জেডিইউ), রাষ্ট্রীয় জনতা দল(আরজেডি),এন সি পি, শিবসেনা (উধ্বভ ঠাকরে শিবির), সিপিএম, সিপিআই, সি পি আই (এম এল) লিবারেশন, ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চা, আম আদমি পার্টি, সহ দেশের অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে একের বিরুদ্ধে এক লড়াইয়ের প্রস্তুতি। ‘এনডিএ’-কে পিছনে ফেলে ক্রমশক্তি বাড়াচ্ছে ‘ইন্ডিয়া’। সদ্য শেষ হওয়া ছয় রাজ্যের সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের উপ নির্বাচনে বিজেপি জিতেছে মাত্র তিনটি আসনে। চারটি আসন গেছে ইন্ডিয়া জোটের দলগুলির দখলে। বিজেপির মান বাঁচিয়েছে ত্রিপুরার দুটি আসন। এই ফলাফল বিজেপির সামনে অশনি সংকেত বলা যায়।
সামনে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। বিজেপির ফলাফল এই পাঁচ রাজ্যে যদি বিরুদ্ধে যায় তাহলে ২৪ এর লোকসভা ভোটের আগে বেকায়দায় পড়ে যাবে গেরুয়া শিবির। ইতিমধ্যে ইন্ডিয়া জোট একের বিরুদ্ধে এক লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিরোধীদের জোটের নাম ‘ইন্ডিয়া’ হওয়ায় আরও অস্বস্তিতে পড়েছে বিজেপি। জঙ্গিগোষ্ঠীর নামের সঙ্গে ইন্ডিয়া আছে বলে আগেই আক্রমণ শানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এবার দেশের নাম ইন্ডিয়ার পরিবর্তে ভারত করতে তোড়জোর শুরু করেছে মোদি সরকার। নয়া দিল্লিকে অনুষ্ঠিত জি ২০ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যখন ভাষণ দিয়ে সূচনা করেন তখন প্রধানমন্ত্রীর সামনের নামফলকে জ্বলজ্বল করছিল ‘ভারত’।
‘ইন্ডিয়া’র কোনও স্থান নেই নামফলকে।সোশ্যাল মিডিয়ায় নামফলকের ছবি ছড়িয়েছে। ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই শুরু জোর চর্চা। রাষ্ট্রপতির তরফে আমন্ত্রণপত্রে লেখা হয়েছিল ‘প্রেসিডেন্ট অফ ভারত’। প্রধানমন্ত্রীও নামের পাশেও ‘প্রাইম মিনিস্টার অফ ইন্ডিয়া’র বদলে ‘প্রাইম মিনিস্টার অফ ভারত’ লেখা হয়। এবার সম্মেলনে নামফলকে জ্বলজ্বল করছে ‘ভারত’। দেশের নাম ইন্ডিয়া থেকে ভারত করার পক্ষে সওয়াল করেছে মোদি সরকার। যা নিয়ে তৈরি হয়েছে তুমুল বিতর্ক। আর সেই বিতর্কের আবহেই নয়াদিল্লিতে জি-২০ সম্মেলনে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
বিরোধীদের দাবি, বিরোধী জোটের নাম ‘ইন্ডিয়া’ হওয়ায় আশঙ্কায় ভুগছে মোদি সরকার। আর তাই এবার দেশের নাম শুধু ভারত করতে চাইছে। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোদি সরকারের এই নাম বদল নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন কেন্দ্রের মোদি সরকার এবার দেশের ইতিহাস বদল করতে চাইছে। রাহুল গান্ধী থেকে ইন্ডিয়া জোটের সকল শীর্ষ নেতা দেশের নাম বদল করার চেষ্টার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। স্পষ্ট বলেছেন বিরোধীদের অন্ধকারে রেখে নাম বদল করতে চাইলে তীব্র বিরোধিতা করা হবে। ইন্ডিয়া জোটের শক্তি বৃদ্ধিতে বিজেপি চোখে সরষে ফুল দেখছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধী নেতারা।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশ মনে করছে, ইন্ডিয়ার মোকাবিলা করবে কোন পথে তা নিয়ে দিশেহারা অবস্থা গেরুয়া শিবিরে। যেভাবে একের পর এক রাজ্যে পরাস্ত হতে হয়েছে বিজেপিকে তাতে করে ২৪ এর লোকসভা ভোটে বিরোধীদের মোকাবিলা করা যথেষ্টই কঠিন বলে মত তাদের। পাঁচ রাজ্যের ভোটে বিজেপি বিপর্যস্ত হলে ২৪ এর লোকসভা ভোটে দিল্লির ক্ষমতা পুনঃ দখল যথেষ্টই কঠিন তেমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।






