স্বাস্থ্য

কোভিড পরবর্তী সময়ে অল্পবয়সীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা বেশি!

Heart attacks are more common among young people in the post-Covid era!

Truth Of Bengal: হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রথম থেকেই নজর দিন লাইফস্টাইল ম্যানেজমেন্টের দিকে। আধুনিক জীবনযাত্রায় বাইরে খাওয়ার অভ্যাস, শরীর চর্চা না করা, স্থূলতা, ধূমপান, মদ্যপানের অভ্যাস, অপরিমিত ঘুম এবং মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের কারণে অল্প বয়সেই বাড়ছে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা। তাই নতুন বছরের শুরু থেকে হার্ট ভালো রাখতে মেনে চলুন কিছু নিয়ম। পরামর্শ দিলেন বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর বিনায়ক দেব।

প্রশ্ন: কম বয়সে হার্টের অসুখ, হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু সত্যিই কতটা চিন্তার, কতটা আলার্মিং?

উত্তর: শুধু ভারতবর্ষেই নয়, গোটা বিশ্বের ক্ষেত্রেই পরিসংখ্যান বলছে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। বাড়ছে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও। একটা সময় পর্যন্ত আমাদের ধারণা ছিল শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদেরই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু বিগত ১০ থেকে ২০ বছর ধরে মধ্যবয়স্কদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা বেড়েই চলেছে। এখন কম বয়সেই অনেকেই হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হচ্ছেন। যা সত্যিই আলার্মিং।

প্রশ্ন: এই যে খুব কম বয়সে হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা বাড়ছে, এর কি বিশেষ কোন কারণ আছে?

উত্তর: নিশ্চিতভাবে কারণ বলতে গেলে আরও বেশ কয়েক বছরের পর্যবেক্ষণ দরকার। তবে কোভিড পরবর্তী সময়ে এই অল্পবয়সীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা বেশ খানিকটা বেড়েছে। করোনা হওয়ার আগে যাদের কোনও হৃদরোগের সমস্যা ছিল না তাদেরও হৃদযন্ত্রের সমস্যা এবং হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বেড়েছে। সেক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাধা জনিত সমস্যা একটা কারণ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, কোভিড সময়কালে অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনও একটা বড় কারণ হতে পারে।

প্রশ্ন: হার্ট অ্যাটাক শব্দটার সঙ্গে আমরা পরিচিত। হার্ট অ্যাটাকের কারণ আপনারা বলেন মাল্টিফ্যাক্টরিয়াল। সেই রিস্ক ফ্যাক্টর গুলো কি কি?

উত্তর: ধূমপান, হাই ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল এবং সর্বোপরি পরিবারের কারো হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা থাকলে রিস্ক অনেকটাই বেড়ে যায়। এই ট্রাডিশনাল রিস্ক ফ্যাক্টরের বাইরেও স্থূলতা বা ওবিসিটি, উদ্বেগ বা স্ট্রেস, যে স্ট্রেসের কারণে কিছু ব্যাড হরমোন নির্গত হয় যা হাই ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিসের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও অপর্যাপ্ত ঘুম একটা প্রধান কারণ। ঘুমের সময় আমাদের শরীর রিপেয়ারেটিভ মুডে থাকে। সঠিকভাবে ঘুম না হলেও হার্ট অ্যাটাক বা হার্টের সমস্যার প্রবণতা বেড়ে যায়।

প্রশ্ন: হার্ট অ্যাটাকের আগে কি শরীর কোন সিগন্যাল দেয়?

উত্তর: হার্ট অ্যাটাক হবার আগে আমাদের শরীর জানান দেয়। কিন্তু ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও অনেক ক্ষেত্রে আমরা বুঝতে পারি না। সব সময় যে বুকে ব্যথা অনুভব হবে এমনটা নয়। মহিলা বা যাদের ডায়াবেটিসের সমস্যা আছে তাদের ব্যথা নাও হতে পারে। ৭০শতাংশ ক্ষেত্রে অন্যান্য নানা উপসর্গ দেখা যায়। চোয়ালে বা পিঠে ব্যথা, বাঁ হাতে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অল্পতেই হাঁপিয়ে যাওয়া, বুক ধরফর করা, অস্বাভাবিক ঘাম, মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যদি দেখেন দরদর করে ঘামছেন, তাহলে কখনই উপেক্ষা করবেন না। আর যাদের কার্ডিও ভাসকুলার রিস্ক ফ্যাক্টর আছে এবং সাথে এইসব উপসর্গ দেখা দিচ্ছে তাহলে অবশ্যই সচেতন হন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

প্রশ্ন: মেডিকেল সায়েন্স তো এখন অনেক অ্যাডভান্সড, কী কী উপায়ে হার্ট অ্যাটাক ট্যাকেল করা সম্ভব?

উত্তর: ইসিজি, ট্রোপনিন জাতীয় রক্ত পরীক্ষা এবং ইকোকার্ডিওগ্রাফিতে যদি হার্ট অ্যাটাক ধরা পড়ে তাহলে মূলত তিন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি হতে পারে। থ্রম্বোলাইসিস, ইমার্জেন্সি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করা হয় লক্ষণ অনুযায়ী। একাধিক ব্লকেজ থাকলে পরবর্তীতে বাইপাস সার্জারির প্রয়োজন হয়।

প্রশ্ন: এই যে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, বাইপাস সার্জারি, রোবটিক সার্জারি, অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির মাধ্যমে কত শতাংশ মানুষ উপকৃত হন।

উত্তর: গত বছরের পরিসংখ্যান বলছে ১৩০ কোটির দেশে সাড়ে চার লাখ অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি এবং ৬০ হাজার বাইপাস সার্জারি হয়েছে যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় শতাংশের হিসাবে নগন্য। এই সব চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যয়বহুল এবং ওষুধও যথেষ্ট দামি। তাই আমাদের দেশের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো অনুযায়ী অনেক মানুষের পক্ষেই এই খরচ বহন করা সম্ভব হয়না। তার থেকে অনেক সহজ লাইফ স্টাইল ম্যানেজমেন্ট।

প্রশ্ন: তাহলে লাইফস্টাইল ম্যানেজমেন্ট বা ডায়েটেরি চেঞ্জ কতটা জরুরি হৃদয়ের স্বাস্থ্যের জন্য?

উত্তর: লাইফস্টাইল ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত জরুরি। এই কর্মব্যস্ততা এবং কম্পিটিশনের যুগে যে কোন বয়সের মানুষেরই স্ট্রেসের সমস্যা আছে। তাই ছাত্রজীবন থেকেই এই লাইফ স্টাইল ম্যানেজমেন্টের দিকে নজর দেওয়া দরকার। তার সাথে সঠিক খাদ্য তালিকা, মদ্যপান, ধুমপানের অভ্যাস থেকে বিরত থাকা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত শরীর চর্চা করা, সর্বোপরি হাটার অভ্যাস। এই বিষয়গুলির নজর দিলে এবং সচেতন হলে সুস্থ থাকা সম্ভব।

প্রশ্ন: অর্থাৎ একবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেলে, কোন সার্জারি বা চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যাবার পরও কি লাইফস্টাইল ম্যানেজমেন্ট, রুটিন ট্রিটমেন্ট বা মেডিসিনের থেকে অনেক বেশি কার্যকর?

উত্তর: নিঃসন্দেহে, কারণ এই চিকিৎসগুলির দ্বারাএকটি পদ্ধতির মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের ব্লকেজকে সরিয়ে দেওয়া হয়। যা একটি সাময়িক চিকিৎসা পদ্ধতি। এরপর আপনার জীবন শৈলী কি হবে তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে হৃদয়ের সুস্বাস্থের চাবিকাঠি। নজর রাখতে হবে ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে। এবং তার সাথে অবশ্যই লাইফ স্টাইল ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলিা কথা আলোচনা করলাম তাতে অভ্যস্থ হতে হবে।

প্রশ্ন: বুকে জ্বালা বা চাপ ধরলে বা পেটের উপরের অংশে ব্যথা,অস্বস্তি হলে অনেকেই ধরে নেন গ্যাসের সমস্যা। এই ধারণাটা কতটা ভুল?

উত্তর: এই ধরনের উপসর্গকে গ্যাসের সমস্যা ভাবা সবময় ঠিক নয়। কারণ পরিসংখ্যান বলছে প্রতি ১০০ জন অ্যাকিউট হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের মধ্যে মাত্র ১০ জন জীবিত অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছতে পারেন। তাই এই ধরনের উপসর্গ হলে অবশ্যই অবহেলা না করে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রশ্ন: সবে নতুন বছরে আমরা পা দিয়েছি, হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে বা হার্ট অ্যাটাকের পর লাইফ স্টাইল ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে কি কি রেজোলিউশন নেওয়া উচিত?

উত্তর: সতর্কতা এবং সচেতনতার কোন বিকল্প নেই। পাশাপাশি যে দিকগুলিতে নজর রাখতেই হবে।

১. সঠিক খাদ্যাভ্যাস।
২. উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস,কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা।
৩. মদ্যপান ও ধূমপানের অভ্যাস থেকে বিরত থাকা।
৪. পরিমিত ঘুম ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।
৫. নিয়মিত শরীর চর্চা, কমপক্ষে সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন ১৫ মিনিট ঘাম ঝরিয়ে হাঁটা।
৬. মন ভালো রাখা এবং সর্বোপরি স্ট্রেস বা মানসিক চাপ সবার জীবনে থাকবেই কিন্তু তা সঠিকভাবে ম্যানেজ করা।

Related Articles