Vidyasagar: বাংলা ভাষার যথার্থ শিল্পী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ভারতীয় জীবনপ্রবাহের বর্ণনা রক্ষার হেতু বিদ্যাসাগর মহাশয়ের শাস্ত্রজ্ঞানপাঠ, যুক্তিভিত্তিক মতবাদ ও চালচলনের মহানুভবতা থেকে শিক্ষাগ্ৰহণ আবশ্যক।
এমএ নাসের: উনিশ শতকের বাঙালি জাতিকে অত্যধিক মানবীর গুণাবলি প্রদান যারা করেছেন, তার মধ্যে উত্তম ঈশ্বরচন্দ্র। ভারতীয় জীবনপ্রবাহের বর্ণনা রক্ষার হেতু বিদ্যাসাগর মহাশয়ের শাস্ত্রজ্ঞানপাঠ, যুক্তিভিত্তিক মতবাদ ও চালচলনের মহানুভবতা থেকে শিক্ষাগ্ৰহণ আবশ্যক। ২০০৪ সালের বিবিসি বাংলার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি সমীক্ষায় অষ্টম স্থানে নির্বাচিত হয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঘাটাল মহকুমার বীরসিংহ গ্ৰামে ১২ আশ্বিন ১২২৭ বঙ্গাব্দ, (১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর) মঙ্গলবার দ্বিপ্রহরের সময় ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় জন্মগ্ৰহণ করেন। প্রপিতামহ ভুবনেশ্বর বন্দোপাধ্যায় (তর্কালঙ্কার) সংস্কৃত পণ্ডিত মহাশয়ের পাঁচ পুত্র নৃসিংহরাম, গঙ্গাধর, রামজয়, পঞ্চানন, রামচরণ সকলেই সংস্কৃত পণ্ডিত। রামজয় বন্দোপাধ্যায় বীরসিংহের পণ্ডিত উমাপতি তর্কসিদ্ধান্তের কনিষ্ঠ তনয়া দুর্গাদেবীকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। রামজয়ের দুই পুত্র- ঠাকুরদাস, কালিদাস। কন্যা মঙ্গলা, কমলা, গোবিন্দমণি, অন্নপূর্ণা। পিতা ঠাকুরদাস বাংলা, সংস্কৃত, শাখতি ও জমিদারি শিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করেন। অতঃপর পিতার সঙ্গে কলকাতা পাড়ি দিয়ে ইংরেজি শিক্ষা করার পর বড়বাজারের দোয়েহাটাল ভাগবত সিংহের বাড়িতে অবস্থান করে তার অফিসে মাসিক দুই টাকা বেতনে চাকরিতে যোগ দেন (Vidyasagar)।
আরও পড়ুন: Bengal Weather: ঘূর্ণাবর্ত ও মৌসুমি অক্ষরেখার জোড়া প্রভাবে রাজ্যে ফের বৃষ্টির দাপট
আরামবাগ মহকুমার গোঘাট গ্ৰামের রামকান্ত চট্রোপাধ্যায় ও গঙ্গামণি দেবীর কন্যা ভগবতী দেবীর সঙ্গে ঠাকুরদাসের বিবাহ হয়। সংসারে অভাব বিরাজ করায় ঈশ্বরচন্দ্রের জননী ভগবতী দেবী গ্ৰামের বাড়িতে চরখায় সুতো কেটে বস্ত্র তৈরি করে পুত্রদের মোটা বস্ত্র পরিধানের জন্য দিতেন। ঠাকুরদাসের সাত পুত্র-ঈশ্বরচন্দ্র, দীনবন্ধু, শম্ভুচন্দ্র, হরচন্দ্র, হরিশচন্দ্র, ঈশানচন্দ্র, শিবচন্দ্র। কন্যা-মনোমহিনী, দিগম্বরী, মন্দাকিনী। ১৮২৫ সালে ঈশ্বরচন্দ্রের পাঠচর্চা শুরু হল। বীরসিংহ গ্ৰামের কালীকান্ত চট্রোপাধ্যায়ের পাঠশালায় পিতা কর্তৃক ভর্তি হন। তিন বছর শিক্ষা গ্ৰহণ করে বাংলা ভাষা ও গণিত শিখলেন। তার হস্তাক্ষর ছিল অতি সুন্দর। এহেন সময় প্লীহা ও উদরাময়ে পীড়িত হন। ছয় মাস মাতার মাতুলের গ্ৰামে অবস্থান করে চিকিৎসার পর সুস্থ হন। ১২৩৫ সালের কার্তিক মাসে, ১৮২৮ সালে গুরু মহাশয় কালীকান্ত চট্রোপাধ্যায় ও পিতা ঠাকুরদাসের সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র কলকাতা যাত্রা করেন। কলকাতায় বড়বাজারে বাবু জগদ্দুর্লভ সিংহের বাড়িতে (বর্তমানে সত্যনারায়ণ পার্কের সন্নিকটে দিগম্বর জৈন টেম্পল রোড) উপস্থিত হলেন। ১৮২৯ সালের ১ জুন পিতা কলকাতার পটলডাঙার সরকারি সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করে দিলেন। এই শ্রেণিতে ঈশ্বরচন্দ্র তিন বছর ছয় মাস ছিলেন। শেষ ছয় মাস অমর কোষের মনুষ্যবর্গ ও ভট্রিকাব্যের পঞ্চম সর্গ পাঠ করেছিলেন। ১৮৩১ সালে মাসিক পাঁচ টাকা বৃত্তি পেয়েছেন। ১৮৩২ সালে তিনি সাহিত্য শ্রেণিতে প্রবিষ্ট হন। বার্ষিক পরীক্ষায় তিনি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম পুরস্কার পান। ১৮৩৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অলঙ্কার শাস্ত্রের শ্রেণিতে প্রবেশ করেন। ১৮৩৬ সালে বেদান্ত শ্রেণিতে উন্নীত হন। ১৮৩৭ সালে কলেজের মাসিক আট টাকা বৃত্তিপ্রাপ্ত হন। এরপর স্মৃতি শ্রেণিতে প্রবিষ্ট হয়ে মনুসংহিতা, মিতাক্ষরা, জীমৃতবাহন কৃত দায়ভাগ প্রভৃতি পড়াশোনা করেন (Vidyasagar)।
Truth of Bengal fb page: https://www.facebook.com/share/1ADtx3ZZeU/
১৮৩৯ সালে ঈশ্বরচন্দ্র ন্যায় শ্রেণিতে প্রবেশ করেন। রচনা প্রতিযোগিতা-সহ ন্যায় শ্রেণিতে পরীক্ষায় প্রথম হয়ে পুরস্কৃত হন। ১৮৩৯ সালের ২২ এপ্রিল ল’ কমিটির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশংসাপত্র পান। তাতেই প্রথম তার নামের সঙ্গে বিদ্যাসাগর উপাধিটি ব্যবহৃত হয়। ১৮৪০ সালে তিনি জ্যেতিষ শ্রেণিতে পড়েন। পরে বীরসিংহে ফিরে যান। ১৮৪১ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৫০ টাকা বেতনে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান পণ্ডিত পদে চাকরিতে যোগ দেন। ১৮৪৬ সালের ৬ এপ্রিল একই বেতনে তিনি সংস্কৃত কলেজের সহকারি সম্পাদকের দায়িত্ব ভার নেন। ১৮৪৯ সালের ১ মার্চ ৮০ টাকা বেতনে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের হেডরাইটার ও কোষাধ্যক্ষ পদে পাঁচ হাজার টাকা জামিনে চাকরিতে যোগ দেন। ১৮৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজে ৯০ টাকা মাসিক বেতনে সাহিত্য শাস্ত্রের অধ্যাপক হন। ১৮৫১ সালের ৫ জানুয়ারি সংস্কৃত কলেজের অস্থায়ী সেক্রেটারি হন। ১৮৫৪ সাল থেকে বেতন হয় তিনশো টাকা। ১৮৫৫ সালের ১ মে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদ-সহ মাসিক অতিরিক্ত দুশো টাকা বেতনে দক্ষিণবঙ্গে সহকারি বিদ্যালয় পরিদর্শকের পদে নিযুক্ত হলেন। ১৮৫৮ সালের ৩ নভেম্বর শিক্ষা অধিকর্তার সঙ্গে মতবিরোধ হলে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৮৫৯ সালের ১ এপ্রিল পাইকপাড়ার রাজাদের অধীনে লা স্কুলের অবৈতনিক তত্ত্বাবধায়ক হন। ১৮৬১ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতা ট্রেনিং স্কুলের সেক্রেটারি হন বিদ্যাসাগর মহাশয়। ১৮৬৩ সালে সরকার কর্তৃক ওয়াউস ইনস্টিটিউটের পরিদর্শক নিয়োগ হন। ১৮৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি বেথুন বালিকা বিদ্যালয়ের সম্পাদক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৮৭০ সালের ১১ আগস্ট পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে কৃষ্ণনগরের শম্ভুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের বিধবা কন্যা ভবসুন্দরীর বিবাহ দেন। ১৮৭১ সালের ১২ এপ্রিল মাতা ভগবতী দেবী কাশীতে প্রয়াত হন। স্বাস্থ্যের অবনতি হেতু জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বর্তমান ঝাড়খণ্ডের কর্মাটাড়ে বাগানবাড়ি ক্রয় করেন। ১৮৭২ সালে সেখানে একটি স্কুল ও হোমিওপ্যাথি দাতব্য চিকিৎসালয় তৈরি করেন। ১৮৭৩ সালে বেঙ্গল থিয়েটারের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হন। ১৮৭৫ সালের ৩১ মে বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজের উইল প্রস্তুত করেন। বাংলা নবজাগরণের অন্যতম পুরাধা, বাংলা গদ্য সাহিত্যের যথার্থ শিল্পী ১৩ শ্রাবণ ১২৯৮ বঙ্গাব্দ, ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই কলকাতার বাসভবনে পরলোকে পাড়ি দেন (Vidyasagar)।






