Speed Culture: সময়ের দ্রুতগতিতে কি হারিয়ে যাচ্ছে মানবিকতা ও নিয়ন্ত্রণ?
ছুটতে শিখেছে কিন্তু কোথায়, কখন থামতে হবে সেই গতির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা তাদের একেবারেই নেই।
সুপ্রভাত লাহিড়ী: মোটর সাইকেলটা ঝড়ের বেগে ছুটে এল। আমাদের পাড়ার মুখার্জী বাড়ির মেজ বউ ও তার ষোড়শী কন্যা রাস্তার দু-ধারে ছিটকে পড়ল। সমান গতিতে তীব্র হর্ন সমেত ওদের মাঝখান দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল মোটর সাইকেল আরোহী। দুকানে মোবাইলের তার ঝুলছে। তিনি এখন স্বপ্নরাজ্যে। আমি ছুটে গেলাম মা ও মেয়ের কাছে। তাদের আঘাত যতখানি না দেহে, তার শতগুণ মানসিক। দু’জনেই রাস্তা থেকে উঠে আমাকে দেখে কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠল, ‘দেখলেন আমাদের গায়ের ওপর দিয়েই চালিয়ে দিচ্ছিল। আমরা দুজনে দু-দিকে ছিটকে না গেলে কী হতো বলুন তো? আমি উত্তেজিত, ‘সবটাই তো আমার চোখের সামনে ঘটল। আমারই তো হাত-পা কাঁপছে। এরা সব কোন গ্রহের মানুষ? কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। একই গতিতে বেরিয়ে গেল! কালে কালে কি সব হচ্ছে বলো তো মেজোবউ?’ এ তো গেল দু-চাকায় উপবিষ্ট দানবের কীর্তিকলাপের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা। আছে, আরও আছে।
এবার আসা যাক ত্রিচক্র যানের চালকদের গতির প্রকৃতি। গড়িয়া থেকে বারুইপুর যাচ্ছি অটোতে চেপে। প্রথমে কিছুটা ধীর গতি, অবশ্যই যাত্রী ধরতে। তারপর সিটে বসে থাকাই দায়। সাঁই সাঁই করে করে এপাশ ওপাশ দিয়ে বড়, ছোটো সব গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে আর আমি ভয়ে শিউরে শিউরে উঠছি। সহযাত্রীরা অবাক বিস্ময়ে পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছেন। প্রতিবাদের ভাষা স্তব্ধ। আমি আর থাকতে না পেরে আস্তে চালানোর কথা বলতেই বেশ জোরেই হেসে উঠল অটোচালক। হাসতে হাসতেই ওর কটাক্ষ, ‘কাকু, ভয় পেলে চলে! গতিই না থাকলে ঠিকঠাক পৌঁছবেন কী করে? আর আমারও তো ট্রিপ বাড়বে না।’ বুঝলাম বর্তমান গতিময় জীবনের ছোঁয়াচে রোগে এও সংক্রামিত। তারপর সেই একই গতিতে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে ভাড়া মেটাতে যেতেই আবার তার হাসি। বাকি পয়সা ফেরত দিতে দিতে আমাকে এই বলে আশ্বস্ত করল, ‘একদম ভয় পাবেন না। এ শর্মার হাতে পড়লে গাড়ি আলাদা প্রাণ পায়।’ ওই বাঁধনছাড়া গতিতে সেই গাড়ি বিশেষ প্রাণ পেলেও এর ঠিক দু-দিন বাদেই রাজপুরের কাছে এক দুর্ঘটনায় বেঘোরে প্রাণ গেল দুই অটোযাত্রীর, বাকিরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় আহত। ঘটনাটা এ ক্ষেত্রে কাকতালীয় হলেও এটাই এখন বাঁধনছাড়া গতির নিত্যনৈমিত্তিক ফসল।
চারচাকা গাড়ির বিশেষ করে পয়সাওয়ালা বাবাদের ইচড়ে পাকা ছেলেদের হাতে গাড়ি পড়লে কী হয়, তা ইএম বাইপাসের দুর্ঘটনার সালতামামি থেকেই পরিষ্কার। এই প্রসঙ্গে চারচাকা, ছয়চাকা গাড়ির গতি-প্রকৃতির একটি অভিজ্ঞতা প্রসূত উদাহরণ না দিলেই নয়। বেলেঘাটা বাইপাস থেকে এখন রাস্তায় যে সাদা ছোট গাড়িগুলো বেরিয়েছে তাতে চড়েছিলাম। গন্তব্য গড়িয়া বাস ডিপো। গাড়িতে ওঠার পর থেকেই আমি আর হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়াতেই পারছি না। বাসের সমস্ত যাত্রী এ ওর গায়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছেন। সামনের সিটে বসে থাকা এক ভদ্রমহিলা, কোলে ছোট্ট শিশু, জানালার রড আঁকড়ে নিজেদের স্থির রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আর ক্রমাগত আর্তনাদ করছেন, ‘ভাই, একটু আস্তে চালান-পড়ে যাব যে।’ এর পর আমি এবং বাকী যাত্রীরা হইচই করে উঠলাম। একজন যাত্রী ভিড় সরিয়ে ড্রাইভারের পেছনে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে বলে উঠল, ‘এক্ষুনি বাস থামান বলছি।’ কিন্তু কে কার কথা শোনে। স্টপ আসলে প্রায় ধাক্কা দিয়ে রাস্তার মাঝখানে যাত্রী নামিয়েই আবার সেই দুরন্ত গতি। টার্গেট সামনের আর একটি সাদা বাস। হয় সেটি একই রুটের নয় অন্য রুটের হলেও যাবে প্রায় একই রাস্তা ধরে। বাসের ভেতরে সমস্বরে প্রতিবাদী ঝড়ের মুখে বাসের ঝোড়ো গতি স্তিমিত হল। স্তিমিত হতে হতে শম্বুক গতিতে পরিণত হ’ল। আবার বাসে ঝড় উঠল, ‘কী হ’ল দাদা, এই ভাবেই কি বাস চলবে নাকি?’ ড্রাইভার সাহেব সামনের দিকে তাকিয়ে চড়া সুরে বলতে লাগলেন, ‘বাসসুদ্ধ হার্টের পেশেন্ট থাকলে বাস এই ভাবেই চলবে।’ বুঝুন, দু’দিন আগেই ইএম বাইপাসের ধারের খালে বাস পড়ে যাওয়ার ঘটনা ইতিমধ্যেই অবসৃত। ওদের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমার আপনার গতিকে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে। শুধু দ্রুতগতি ও অস্থিরতা সমাজের একটা শ্রেণির প্রতিটি কার্যকলাপকে কী ভয়ঙ্কর ভাবে কব্জা করে ফেলেছে! শুধু ছুটে চলো নইলে পিছিয়ে পড়তে হবে এই অজানা ভয়ই তাদের ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে ধীর গতি, হার মানা? নৈব নৈব চ। আমিই এক নম্বরে থাকবো তাই আমাকে প্রাণপণে ছুটে চলতে হবে। চলার পথের সঙ্গীদের কথা ভাববার সময় কোথায়? পুজোর সময় বাবা, মা, ভাই-বোনেদের ধুতি-পাঞ্জাবি, শাড়ি, জামা-কাপড় দেওয়াটাই আমাদের সমাজে চলে এসেছে। এখন আমার ভাইপো, আইটি সেক্টরের বড় চাকুরে, তার কাকিকে গেল পুজোতে একটা প্লাজমা টিভিই উপহার দিয়ে ফেলল। আমার স্ত্রী বিগলিত হয়ে সে কথা বলতেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছিল, ‘আর্ন মানি, বার্ন মানি।’
আর একটি অভিজ্ঞতার কথা বলেই সময়ের দ্রুতগতির উদাহরণের ইতি টানবো। এ নিয়ে সহস্র পৃষ্ঠার রচনার অবকাশ থাকা সত্ত্বেও। বাবার অকালমৃত্যুতে নিয়মমাফিক ভাবে তাঁর মেয়ের চাকরির ব্যবস্থা হল। ভাল মেয়ে। বাংলায় অনার্স গ্রাজুয়েট। সংসারে মা ও ছোটবোন। মায়ের চাকরির বয়স পেরিয়ে যাওয়ার দরুন মেয়েরই চাকরি প্রাপ্য হল। যেহেতু মেয়েটির বাবা ছিলেন আমার পূর্বপরিচিত তাই স্বাভাবিক কারণেই আমি বেশ খুশি। কিন্তু আমার এই খুশি যে এত ক্ষণস্থায়ী হবে তা কে জানত! ড্রেসকোড নিয়ে আমি অতি সচেতন না হলেও সচেতন। চাকরিতে জয়েন করার দু-চার মাসের পর থেকেই ওর পোশাক-আশাক, চালচলন-এর বহর দেখে অফিসের সবার চক্ষু চড়কগাছ। অফিসের কাজে কাগজপত্র, ফাইল নিয়ে আমার ঘরে ঢুকলে আমিও অপ্রস্তুত হই। ওইটুকু মেয়েকে আমি কী বলব? এর মধ্যেই ওর মায়ের ফোন এল। ওর চালচলন নিয়ে বাড়িতে অশান্তি চলছে। ও নাকি বাড়ি ছাড়ার প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিয়েছে। তাই বাধ্য ওকে ঘরে ডেকে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই ও একটা ইংরেজি দৈনিকের পাতা খুলে আমার চোখের সামনে মেলে ধরে বলল, ‘দেখুন স্যর, আমি পেজ-কোর এর মেম্বার হয়ে গেলাম।’ কিছুই বুঝলাম না। চোখের সামনে ঘুরতে লাগল কিম্ভুতকিমাকার স্বল্পবসনা কিছু উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের ছবি। সেই ভিড়ে ওকে না খুঁজেই আমি ‘ও তাই বুঝি’ বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে প্রায় এক ছুটেই অফিসের বাইরে চলে এলাম, অত্যন্ত দ্রুতগতি ও অস্থিরতার সঙ্গে।
অফিসের সামনের বাগানে পায়চারি করতে করতে মনটা একটু শান্ত হল। সত্যিই তো, সবাই তো ছুটছে ভবিষ্যতের জন্যে। ছুটছে তো ছুটছেই। ছুটতে শিখেছে কিন্তু কোথায়, কখন থামতে হবে সেই গতির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা তাদের একেবারেই নেই। তাই হুমড়ি খেয়ে পড়ার বহু দৃষ্টান্ত আছে। মনে পড়ে যায় টিএ॰এলিয়টের সেই বিখ্যাত লাইন কটির কথা, ‘What shall i do now? What shall i do? I shall rush out as I am, and walk the street with my hair down so? What shall we do tomorrow? What shall we ever do? The hot water at ten and it rains, a closed car at four and we shall play a game of chase pressing lidless eyes and waiting for a knock upon the door.’
আরও মনে পড়ে যায় কবি নীরেন চক্রবর্তীর জীবনের যাত্রাপথের বিখ্যাত ও সময়োচিত কয়েকটি লাইন, ‘প্রশ্ন জাগে কিসের জন্যে এতটা পথ ছুটে এলাম। বুঝি না ঠিক কার বিরুদ্ধে এত যুঝি? উড়িয়ে দিয়ে সকল পুঁজি কাকে পেলাম? প্রশ্ন জাগে কিসের জন্যে এতটা পথ এমন করে ছুটে এলাম।’
প্রতিবেদকের মনেও এ প্রশ্ন জাগে। এ প্রশ্ন নিশ্চয়ই জাগে আরো অনেকের মনে। উত্তর-ও বোধ হয় একটাই। সেটা হ’ল এ ‘সময়ের কান্না’।


