কুসংস্কার: এক সামাজিক ব্যাধি
প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে না পারায় সে হয়ে ওঠে অন্ধবিশ্বাসের প্রভাবে আবদ্ধ
Truth of Bengal: মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: মানুষ প্রকৃতির অনুসন্ধিৎসু। সে অজানাকে জানতে চায়, অদেখাকে দেখতে চায়। প্রতিটি ঘটনার পেছনে নিগূঢ় কারণ আবিষ্কার করার জন্য তার অন্তহীন উৎসাহ থাকে। আর যখন সে সঠিক রহস্য উপলব্ধি করতে পারে না, তখন তার মনে সঞ্চিত হয় ভ্রান্তির ছলনা, যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস, কল্পনা আর অনুমান। প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে না পারায় সে হয়ে ওঠে অন্ধবিশ্বাসের প্রভাবে আবদ্ধ। আর সেই বিশ্বাসের জন্ম দেয় কুসংস্কার (Superstition), যা এক সামাজিক ব্যাধির মতো সমাজকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে কুসংস্কার ছিল মানুষের চিন্তার প্রধান বাঁধা। তখন মানুষ প্রকৃতির ঘটনাগুলোকে দেব-দেবী, অসুর-প্রেতাত্মার মিথ্যাবিশ্বাসের আলোকে দেখত। অন্ধ বিশ্বাসের এই যুগ পেরিয়ে আধুনিক সভ্যতা বিজ্ঞানের আলোকে স্বাগত জানালেও, আপামর জনসাধারণের মাঝে আজও সেই পুরনো কুসংস্কার মুছে যায়নি। সভ্যতার আলোক-উজ্জ্বলিত যুগেও আমরা ঘরের চালে কাক বা শকুন বসলে অমঙ্গল ডাকি, সকালে খালি কলসি দেখলে যাত্রা বিরক্ত মনে করি, পরীক্ষার আগে ডিম, কলা বা রসগোল্লা না খেয়ে বিশেষ রীতি পালন করি।
রাস্তায় কালো বিড়াল দেখা মানেই দুর্ঘটনার শঙ্কা, পথ চলতে পথে থামিয়ে গাড়ির কাচে ক্রস কাটার মত অযৌক্তিক প্রথা এখনও বিদ্যমান (Superstition)। পরীক্ষার সময় ডিম, কলা, রসগোল্লা খাওয়া থেকে বিরত থাকার পেছনে কোনও বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই, তবু অনেক শিক্ষিত পরিবারও এই কুসংস্কারের শিকার। আবার, জন্ডিস বা অন্য কোনো অসুখ হলে ঝাড়ফুঁক, তাবিজ, কবচ ব্যবহারের মাধ্যমে রোগমুক্তির আশায় ভরসা রাখি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি সত্ত্বেও এসব প্রথা এখনও রয়ে গিয়েছে।
সমাজে কিছু কুসংস্কার এতটাই ভয়াবহ যে তা মানবতা ও সভ্যতার প্রতি আঘাত করে। যেমন, স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে তার মৃত স্বামীর চিতায় জীবন্ত দগ্ধ করা হয়, যেখানে নারীর মৌলিক অধিকার ও জীবন নিরাপত্তা বিহীন হয়ে পড়ে। আবার দরিদ্র ও অসহায় বৃদ্ধাদের ‘ডাইনি’ বা জাদুকরী সন্দেহ করে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনাও সমাজে ঘটে। এইসব ঘটনা আমাদের সামাজিক উন্নয়নের এক কলঙ্ক।
কুসংস্কারের (Superstition) অপকারিতা শুধু ব্যক্তির জীবনে নয়, সমগ্র সমাজের উপর প্রভাব ফেলে। প্রথমত, এটি মানুষের মস্তিষ্ককে বন্ধ করে দেয়। যুক্তি ও বিবেচনার পরিবর্তে অন্ধ বিশ্বাস ও ভয়ে জড়িয়ে পড়ে মানুষ। ফলশ্রুতিতে, শিক্ষার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং নতুন ধারণার গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ, যে সব মানুষ চিকিৎসা ছেড়ে ঝাড়ফুঁক বা ওঝার উপর নির্ভর করে, তারা প্রকৃত রোগ নিরাময়ের সুযোগ হারায়। শিশুরা ভ্রান্ত কুসংস্কার থেকে মুক্ত না হলে তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
[আরও পড়ুনঃ Monsoon Update: বাড়বে বৃষ্টির দাপট? কী বলছে হাওয়া অফিস]
দ্বিতীয়ত, কুসংস্কার (Superstition) সমাজে বিভাজন তৈরি করে। বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মাঝে কুসংস্কার তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। যেমন, কোনও সম্প্রদায়ের প্রতি অন্য সম্প্রদায়ের অবিশ্বাস বা আঘাত হানে ‘অশুভ ছায়া’ বা ‘শাপে’ বিশ্বাসের কারণে। এর ফলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয় এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সুযোগ কমে যায়।
তৃতীয়ত, কুসংস্কার অর্থনৈতিক উন্নয়নেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অযৌক্তিক ভয়ের জন্য নতুন উদ্যোগ গ্রহণে অনীহা দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ তাদের সম্পদ বা সময় অপচয় করে অনাবশ্যক জাদুবিদ্যার ওপর। যেমন, ব্যবসায় ক্ষতির ভয়ে বা পরীক্ষায় খারাপ ফলাফলের আশঙ্কায় মন্ত্রপাঠ, তাবিজ-তুলা ব্যবহার করা। এর ফলে ব্যক্তি ও সমাজ দুটোই পিছিয়ে পড়ে।
তবে দুঃখজনক বিষয়, আজকের আধুনিক সময়ে এমনকী অনেক শিক্ষিত ও বিজ্ঞানচিন্তাবিদের মধ্যেও কুসংস্কারের (Superstition) ছায়া দেখা যায়। বিজ্ঞানের অধ্যাপক, শিক্ষক বা ছাত্র-ছাত্রীরাও কুসংস্কারের শিকার। এঁরা আঙুলে নীলা রিং, গোমেদের আংটি, মাদুলি বা কবচ পরে। এতে বোঝা যায়, শিক্ষার অভাবের চেয়ে সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করা এই কুসংস্কারের ক্ষমতা কতটা গভীর।
[লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/truthofbengal]
কুসংস্কার নির্মূলের জন্য একমাত্র পথ হল বিজ্ঞানমনস্কতা বিস্তার। মানুষকে যুক্তি, তথ্য ও পরীক্ষিত প্রমাণের মাধ্যমে চিন্তা করতে শেখানো। প্রত্যেক স্তরে শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান ও যুক্তির গুরুত্ব বাড়ানো। ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কার থেকে মুক্তি পেতে দরকার সমাজের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা। ধর্মব্যবসায়ীদের মুনাফাখোরি বন্ধ করতে হবে, যারা অশিক্ষিত মানুষের ভয় দেখিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে। বিশেষ করে শিক্ষকদের ও বিজ্ঞানীদের দায়িত্ব অগ্রাধিকার পাবে। কারণ, তারা জাতি গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। যদি এই শ্রেণির লোকরাই কুসংস্কারের শিকার হন, তা হলে সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞান ও যুক্তির আলো পৌঁছনো কত কঠিন হয়, তা সহজেই বোঝা যায়। তাই শিক্ষিত ও বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিদেরই এগিয়ে এসে এই সামাজিক ব্যাধি সারাতে হবে।
শেষে বলি, কুসংস্কার (Superstition) শুধু ব্যক্তিগত মানসিক বিকৃতি নয়, এটি সামাজিক ও মানবিক অগ্রগতির পথে বড় একটি বাধা। আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব একত্রে কাজ করে এই অন্ধকার দূর করা। কারণ, একটি অন্ধকারমুক্ত সমাজে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সত্যিকার উন্নয়নের সূচনা হয়। বিজ্ঞান ও যুক্তির আলোয় অন্ধবিশ্বাসের অন্ধকারকে চিরতরে সরিয়ে ফেলতেই পারে আমাদের সচেতনতা, সাহস ও জ্ঞান।






