সজনীকান্ত দাস ছিলেন বাংলা সাহিত্যের নীরব শাসক, স্মরণে বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য
ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী (রাষ্ট্রপতি পুরস্কার ও শিক্ষারত্ন পুরস্কারপ্রাপ্ত, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও রবীন্দ্র গবেষক): বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু সাহিত্যিক এমন আছেন, যাঁরা সরাসরি সৃষ্টির চেয়ে সমালোচনা, ব্যঙ্গ, রসবোধ এবং সাংগঠনিক ভূমিকার মধ্য দিয়ে সাহিত্যের ধারা বদলে দিয়েছেন। সজনীকান্ত দাস (Sajanikanta Das) তাঁদেরই একজন। তিনি ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, সমালোচক এবং ব্যঙ্গকার—সব মিলিয়ে এক বহুমুখী সাহিত্য ব্যক্তিত্ব।
তাঁর রচনায় তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, প্রাঞ্জল ভাষা, যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা ও সাহিত্যসেবার অদম্য স্পৃহা মিলেমিশে এক অনন্য ধারা সৃষ্টি করেছে। বিশেষত ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে এক নতুন প্রজন্মের সাহসী সমালোচনার দরজা খুলে দেন। শুধু সাহিত্য নয়-সমকালীন সমাজ, রাজনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রের সমস্যা সম্পর্কেও তিনি সমালোচকের ভূমিকা নিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ রচয়িতা হিসাবেও তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল।
সজনীকান্ত দাস (Sajanikanta Das) ২৫ আগস্ট ১৯০০ সালে অবিভক্ত বর্ধমান জেলার বেতালবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বীরভূম জেলার রায়পুরে। পিতা জগবন্ধু দাস ছিলেন স্বভাবতই সাহিত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমী, যা শৈশব থেকেই সজনীকান্তের মানসে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি দিনাজপুর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেও রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে। পরে বাঁকুড়ার ওয়েসেলিয়ান মিশনারি কলেজ থেকে আই.এস.সি. এবং ১৯২২ সালে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বি.এসসি. সম্পন্ন করেন। এই সময় থেকেই তিনি লেখালেখির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে শুরু করেন।
বিশ শতকের তৃতীয় দশকে বাংলা সাহিত্য নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছিল—রবীন্দ্রপ্রভাব, ‘নবযুগ’, ‘প্রবাসী’, ‘কালীকলা’ ও ‘শনিবারের চিঠি’-র মতো পত্রিকার উত্থান, এবং নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনার আবির্ভাব। সজনীকান্ত দাস প্রথমদিকে কবিতা রচনা দিয়ে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করলেও তাঁর প্রকৃত পরিচিতি আসে ব্যঙ্গ ও সমালোচনার মাধ্যমে।
১৯২৪ সালে তিনি “শনিবারের চিঠি” পত্রিকার সাথে যুক্ত হন। প্রথমদিকে পাঠকের কাছে তাঁর (Sajanikanta Das) পরিচয় ছিল “ভাবকুমার প্রধান” ছদ্মনামে লেখা ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধের মাধ্যমে। তাঁর রচনায় তীক্ষ্ণ ভাষা, তথ্যনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ও হাস্যরসের মিশেল ছিল, যা পাঠককে যেমন আনন্দ দিত, তেমনি ভাবনার খোরাকও জোগাত।
১৯২৪ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত “শনিবারের চিঠি” তাঁর সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডের প্রধান ক্ষেত্র ছিল। এখানে তিনি সম্পাদক হিসেবে শুধু প্রবন্ধ, ব্যঙ্গ, সমালোচনা প্রকাশ করতেন না—তিনি ছিলেন সাহিত্যের রুচি নির্ধারক, সামাজিক ব্যঙ্গচিত্রকর, এবং প্রায়শই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
তাঁর সমালোচনা কখনওই নির্দয় ঠাট্টা ছিল না; বরং তা সাহিত্যিকের দুর্বলতা বা সামাজিক অসঙ্গতিকে লক্ষ্য করে সজাগ করার প্রচেষ্টা ছিল। নজরুল ইসলাম, কাজী মোতাহার হোসেন, প্রেমেন্দ্র মিত্র, এমনকি রবীন্দ্রনাথকেও তাঁর ব্যঙ্গ-সমালোচনার লক্ষ্য হতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে তাঁর স্মরণে লেখা প্রবন্ধে সজনীকান্ত এমন কিছু সরল অথচ গভীর পর্যবেক্ষণ দেন যা তখনকার সমকালীন সাহিত্যে বিরল।
সজনীকান্ত (Sajanikanta Das) ‘শনিবারের চিঠি’ ছাড়াও ‘প্রবাসী’, ‘বঙ্গশ্রী’, ‘দৈনিক বসুমতী’ ইত্যাদি পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’-এর তিনি সহ-সভাপতি ও পরে সভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করেন। সম্পাদকীয় কাজে তিনি সাহিত্যের মান ও শৃঙ্খলা বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ‘নিখিলবঙ্গ সাময়িকপত্র সংঘ’, ‘সাহিত্যসেবক সমিতি’, ‘পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রভাষা প্রচার সমিতি’, ‘পরিভাষা সংসদ’, ‘অ্যাডাল্ট এডুকেশন কমিটি’, ‘ফিল্ম সেন্সর বোর্ড’ প্রভৃতির সহ সভাপতি ও সভাপতি ছিলেন সজনীকান্ত। তিনি ‘শনিরঞ্জন প্রেস’ ও ‘রঞ্জন পাবলিশিং হাউস’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
সজনীকান্ত দাসের রচনায় কবিতা, প্রবন্ধ, সমালোচনা, সাহিত্য-ইতিহাস, জীবনী, নাটক, অনুবাদ—সবই আছে। তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল—
1. মনোদর্পণ
2. পথ চলতে ঘাসের ফুল
3. অজয়
4. ভাব ও ছন্দ
5. বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস
6. বঙ্গরঙ্গভূমি
7. পঁচিশে বৈশাখ
8. মধু ও হুল
9. অঙ্গুষ্ঠ
10. রবীন্দ্রনাথ : জীবন ও সাহিত্য
11. কেড্স ও স্যান্ডাল
12. আত্মস্মৃতি
তাঁর বাংলা গদ্যের প্রথম যুগ বাংলা গদ্যের ইতিহাসে একটি প্রামাণ্য গবেষণাধর্মী গ্রন্থ। এখানে তিনি ১৮০০ থেকে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত বাংলা গদ্যের বিকাশপথ সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। সজনীকান্ত দাসের সমালোচনা ও ব্যঙ্গ সমসাময়িক সাহিত্যিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। অনেকেই তাঁর সাহসিকতাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ আঘাত পেয়েছেন। নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘ আলোচিত একটি অধ্যায়।
তাঁর (Sajanikanta Das) মৃত্যুর পরে “শনিবারের চিঠি” ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়, কিন্তু তাঁর ব্যঙ্গ-সমালোচনার ধারা বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় আজও প্রভাব বিস্তার করছে। সাহিত্য সমালোচনাকে জনসমাজে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অসামান্য। ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা দিবসে রেডিওতে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ গানটি বাজানো হয়নি-হয়েছিল সজনীকান্তের লেখা গান-‘বন্দেমাতরম বন্দেমাতরম / চক্রশোভিত ওড়ে নিশান / নবভারতের বাজে বিষাণ / কে আছ কোথায় ছুটে এস সবে / জ্ঞানী ও কর্মী ধনী কিষাণ / নতুন যাত্রা শুরু এবার’… গানটি গেয়েছিলেন সুকৃতি সেন।
সজনীকান্ত দাস (Sajanikanta Das) শুধু একজন ব্যঙ্গকার বা সমালোচক নন—তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের নীরব শাসক, যিনি কলমের মাধ্যমে সাহিত্যিকদের শৃঙ্খলায় আনতে চেয়েছেন। তাঁর সাহিত্য, সমালোচনা, সম্পাদকীয় কাজ ও সাংগঠনিক অবদান মিলিয়ে তিনি বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের এক অবিচ্ছেদ্য নাম।






