Bihar Assembly Election: বিহারের ভোটে ‘গণতান্ত্রিক শঙ্কা’, কমিশন কি অঙ্কের ভুলে না অন্য কিছু লুকোচ্ছে?
এই অঙ্কের গণ্ডগোল শুধু গাণিতিক ভাবেই বিপজ্জনক নয়— এটি গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্ন তোলে।
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: বিহারের সাম্প্রতিক বিধানসভা ভোটে ভোটসংখ্যা এবং ভোটারের তালিকায় প্রকাশিত অঙ্কের গভীরে লুকিয়ে রয়েছে গণতান্ত্রিক শঙ্কার এমন এক চিত্র, যা শুধু ভুলভ্রান্তিতে সীমাবদ্ধ নয় বরং জনগণের আস্থা, আইনগত স্বচ্ছতা ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার ওপর গভীর প্রশ্ন তুলছে।
ভারতীয় নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের বিহার ভোটার তালিকা চূড়ান্ত ঘোষণায় বলেছিল, মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৪২ লাখ। কিন্তু ভোটগ্রহণ শেষে তারা বলেছে, মোট ভোট কাস্ট হয়েছে ৭ কোটি ৪৫ লাখেরও বেশি। সহজ অঙ্ক— ভোটার সংখ্যার চেয়ে তিন লাখ বেশি ‘ভোট’! এবং একই কমিশন দাবি করছে ভোট পড়েছে ৬৭ শতাংশ (বা এর আশপাশের সংখ্যা)।
এই অঙ্কের গণ্ডগোল শুধু গাণিতিক ভাবেই বিপজ্জনক নয়— এটি গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্ন তোলে। কারণ, যদি ভোটারের সংখ্যা ৭.৪২ কোটি হয়, তাহলে ৬৭ শতাংশ ভোট হওয়া মানে প্রায় ৪ কোটি ৯৭ লাখ ভোট পড়ার কথা। তা হলে ৭.৪৫ কোটি ভোট ‘অতিরিক্ত’ কীভাবে পড়ল? এটা কি ভুল বোঝাবুঝি? নাকি অঙ্কের ইশারা কোনও ছায়াময় পরিকল্পনার দিকে?
এই গণ্ডগোলের পেছনে একাধিক ধাপে উঠে এসেছে এলোপাথাড়ি পারস্পরিক তথ্য এবং বিভিন্ন ব্যাখ্যার সংঘর্ষ;
প্রথমত, আসল কারণ হিসেবে উঠেছে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের নামে ভোটার তালিকার এক বড় শুদ্ধিকরণ অভিযান। এই এসআইআর-এ নির্বাচন কমিশন বলেছে যে তারা প্রায় ৬.৯ মিলিয়ন পুরাতন, অচল বা অবাস্তব ভোটার নাম মুছে দিয়েছে। মৃত, মাইগ্রেটেড এবং ডুপ্লিকেট (নকল) ভোটারদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি একদিকে মানানসই শোনা যেতে পারে— ভোটার তালিকা ঝাড়াই বাছাই হয়, তা হলে ভোটদানের শতাংশ বেশি দেখাবে, কারণ অপ্রচলিত বা বাইরে থাকা ভোটারের সংখ্যা কমে যাবে। যেমনটি আমদের গণিত শেখায়– নিবন্ধিত ভোটার কমলেও সক্রিয় ভোটারের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকলে টার্নআউট শতাংশ বাড়ে।
তবে, এই এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা উঠেছে। বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ দাবি করেছে যে এই শোধনাভিযান গরিব, মাইগ্র্যান্ট শ্রমিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের অবিচার করেছে। তারা বলেছে, অনেকেই পরিচয় যাচাইকরণের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট জমা দিতে পারেনি, বা তাদের নাম তাড়াতাড়ি মুছে ফেলা হয়েছে, তাদের প্রতিবাদ বা আপত্তি জানানোর পদ্ধতি কঠিন করা হয়েছে।
প্রথমত, এই এসআইআর-এ অন্তর্ভুক্ত সমস্যা একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে গড়িয়েছে। ভোটার নাম মোছা একটি ‘শুধু তালিকা পরিষ্কার করা’ প্রক্রিয়া কি, নাকি নির্বাচনের ফলাফল প্রভাববিস্তার করার উদ্দেশে পরিচালিত একটি পরিকল্পিত চাল?
দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন বলেছে যে তাদের এসআইআর-চেষ্টা এবং তালিকা শুদ্ধিকরণই ভোট দেওয়ার হার বা নির্বাচন অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মূল কারণ। জানা যায়, এসআইআর চালু করার পরই আগের ৭ কোটি ৮৯ লাখ ভোটার থেকে নাম কমে ৭ কোটি ৪২ লাখে নামে। যদি ধরা হয় যে ভোটদাতার সংখ্যায় এই হ্রাস বাস্তব হয়, তা হলে ৬৭ শতাংশের কাছাকাছি টার্নআউট হওয়া সম্ভব হতে পারে।
তবে এই ব্যাখ্যার উপরেও প্রশ্ন উঠেছে। কিছু বিশ্লেষক এবং রাজনৈতিক বিরোধী বলছেন, শুধুমাত্র এসআইআর পুরো ব্যাখ্যা দিতে পারে না। কারণ, ভোটদানের হার আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এবার দুটি পর্যায়ে মিলে ৬৬.৯ শতাংশ রেকর্ড ভোট পড়ে, যা বিহারের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। প্রথম দফায় কমিশন বলেছে, ৬৫.০৮ শতাংশ টার্নআউট হয়েছে, যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
এই ধরনের রেকর্ড অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই গণতন্ত্র উৎসাহপ্রদ, কিন্তু একই সঙ্গে সংখ্যার পাঁজি ও ত্রুটিপূর্ণ তালিকা সংশোধন পদ্ধতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে সন্দেহও জন্মায়— বিশেষ করে যখন নির্বাচন কমিশন এবং ক্ষমতাসীন দলের বখাপ্রা নিয়ে অভিযোগ উঠছে।
তৃতীয়ত, সমালোচনাকারীদের মতে, এসআইআর-এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াতে তথ্যগত স্বচ্ছতার অভাব ছিল। প্রতিবাদে দাবি রয়েছে— অনেক অঞ্চল থেকে অভিযোগ এসেছে যে এলআরও বা বিএলও পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উপযুক্ত মিটিং বা প্রশিক্ষণ পাননি। আবেদন ও আপত্তি জানাতে উপযুক্ত প্রক্রিয়া ও সময় পুরোপুরি দেওয়া হয়নি। বিশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, অনেক বিএলএ বা দলে যুক্ত নেতা বলছেন— তাদের আপত্তি গৃহীত করা হয়নি বা ভুলভাবে উত্তর দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও, ইন্টারনাল সোর্সে এমন দাবি উঠেছে যে কমিশন তাদের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য থাকা প্রতারণা-নির্ধারণ সফটওয়্যার পুরোপুরি ব্যবহার করেনি। যদি সত্য হয়, তা হলে নির্বাচন কমিশন যে তালিকা শুদ্ধিকরণের কথা বলেছে, তার পেছনে সম্ভাব্য বড় ত্রুটি বা পক্ষপাতিত্বও থাকতে পারে। সূত্র বলেছে, এই সফটওয়্যার ব্যবহারে দীর্ঘদিন অভ্যস্ত ছিল কমিশন, কিন্তু এবার সেটি পুরোপুরি মিনিমাইজড বা বাদ দেওয়া হয়েছে। যার ফলে কিছু পুরনো ডুপ্লিকেট এন্ট্রি বা সন্দেহজনক প্রবেশ এখনও তালিকায় রয়ে যেতে পারে।
চতুর্থত, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাহীনতা বাড়াতে কাজ করেছে এমন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব। অনেক বিরোধী নেতা এবং সমালোচক এই এসআইআর-কে এক পরিকল্পিত ভোট অপচয় বা ভোট ব্যর্থতার কৌশল হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও দরিদ্র সম্প্রদায়গুলির মধ্যে, যাদের ভোটদানের ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তাবতা তাদের ক্ষতির আশঙ্কা জাগিয়েছে। তারা বলছেন, নির্বাচনী শুদ্ধিকরণের নামে যে সব নাম মুছে ফেলা হয়েছে, সেগুলি সরাসরি নির্বাচনী লড়াইতে ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা দিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ ভোটারের দৃষ্টিকোণ থেকেও বড় প্রশ্ন ওঠে— আস্থা ফেরানো যাবে কি? কারণ গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার সংখ্যা বা শতাংশ নয়; এটি বিশ্বাস এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ওপর গড়ে ওঠে। যদি ভোটাররা মনে করে তাদের নাম ভুলভাবে মুছে ফেলা হচ্ছে, তাদের অভিযোগ সঠিকভাবে শুনছে না নির্বাচন কমিশন বা সংশোধন চাহিদা গৃহহীনভাবে বাতিল হচ্ছে— তা হলে স্রেফ শতাংশ বা অঙ্ক বেশি হওয়ায় গণতন্ত্র মাথা তুলে দাঁড়াবে কি?
অবশেষে, আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে– নির্বাচন কমিশনকে এই গণতান্ত্রিক শঙ্কাগুলির উত্তর দিতে হবে— তার কেবল উত্থাপিত তথ্য ভুল নয়, পূর্ণ স্বচ্ছতা এবং প্রক্রিয়াসমূহের লজিক্যাল ব্যাখ্যা দিতেই হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও ব্যস্ত থাকতে হবে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আপত্তি গ্রহণ ও দ্রুত সমাধান প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে। সাধারণ জনগণ ও সামাজিক সংগঠনগুলোরও তাদের নাগরিক অধিকার সচেতনভাবে ব্যবহার করতে হবে— নাম যাচাই করা, আপত্তি দাখিল করা এবং পরিসংখ্যান পরীক্ষা করা এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রয়োজন হলে আইনি পথ নেওয়া।
গণতন্ত্র বহু মাত্রিক— শুধু ভোটদানের সংখ্যাগত অংশগ্রহণ নয়, তার আস্থা, স্বচ্ছতা ও উত্তরদানও গুরুত্বপূর্ণ। বিহার নির্বাচন যে শুধুমাত্র ‘ভোটের হিসাব’ হিসেবেই নয়, বরং গণতান্ত্রিক স্বাভাবিকতার পরীক্ষাও হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা নিয়ে আমাদের সব পক্ষের— নাগরিক, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলের এক সঙ্গে কথা বলার সময় এসেছে। কারণ, যদি ভোটের অঙ্কই বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, তা হলে গণতন্ত্র শুধু সংখ্যা নয়, ন্যায়বিচারও হারাতে পারে।






