সম্পাদকীয়

আতঙ্কের ৪০ সেকেন্ড: বাংলার মাটির নিচে কি বড় কোনও বিপদের সঙ্কেত?

পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপীয় অববাহিকাগুলির একটি— 'বেঙ্গল বেসিন'-এর ওপর। এই অববাহিকার সৃষ্টি হয়েছে কোটি কোটি বছর ধরে পলিসঞ্চয়ের মাধ্যমে।

ড. রাম কৃষ্ণ সেন (লেখক— অধ্যাপক): শুক্রবার হঠাৎ করেই কেঁপে উঠল পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ। রিখটার স্কেলে ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প প্রায় ৪০ সেকেন্ড স্থায়ী হয় যা সময়ের হিসেবে হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু অনুভূতির দিক থেকে যেন এক অনন্তকাল। কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা-সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মানুষ আতঙ্কে বহুতল ভবন থেকে নেমে রাস্তায় আশ্রয় নেন। এই কম্পন কেবল একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের ভূ-প্রকৃতির অন্তর্লীন বাস্তবতার একটি তীব্র স্মারক। মাটির নিচে কোটি কোটি বছরের ভূ-তাত্ত্বিক বিবর্তনের যে জটিল ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তারই ক্ষণিক বহিঃপ্রকাশ এই ৪০ সেকেন্ডের কম্পন।

ভূমিকম্পের প্রকৃতি, মাত্রা ও ‘Elastic Strain’ মুক্তির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা, যা ভৌগোলিকভাবে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ অঞ্চলের অন্তর্গত। ভূ-তাত্ত্বিক পরিভাষায় এটি একটি ‘Shallow Focus Earthquake’, অর্থাৎ অগভীর ভূমিকম্প, যার উৎসস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৩.৪ কিলোমিটার নিচে। সাধারণত ভূমিকম্পকে গভীরতার ভিত্তিতে তিন ভাগে ভাগ করা হয়— শ্যালো (০-৭০ কিমি), ইন্টারমিডিয়েট (৭০-৩০০ কিমি) এবং ডিপ ফোকাস (৩০০-৭০০ কিমি)। এই ক্ষেত্রে গভীরতা অত্যন্ত কম হওয়ায় ভূকম্পীয় তরঙ্গ ভূ-পৃষ্ঠে পৌঁছাতে খুব কম সময় নেয় এবং শক্তির অপচয় তুলনামূলকভাবে কম হয়। ফলে কম্পনের তীব্রতা বেশি অনুভূত হয়।

রিখটার স্কেলে ৫.৪ মাত্রা একটি ‘মডারেট’ ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত। তবে বর্তমানে ভূমিকম্প পরিমাপে ‘Moment Magnitude Scale (Mw)’ বেশি ব্যবহৃত হয়, যা ভূমিকম্পে নির্গত মোট শক্তির পরিমাণকে আরও নির্ভুলভাবে প্রকাশ করে। ৫.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আনুমানিকভাবে ১০¹³–১০¹⁴ জুল শক্তি নির্গত করতে পারে। তুলনামূলকভাবে এটি ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের চেয়ে প্রায় ৩০ গুণ বেশি শক্তিশালী, কারণ রিখটার স্কেল লগারিদমিক প্রকৃতির। ভূমিকম্পের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করে কেবল মাত্রার ওপর নয়; বরং কেন্দ্রস্থলের গভীরতা, ভূত্বকের প্রকৃতি, ফল্টের ধরণ এবং জনবসতির ঘনত্বের ওপরও। অগভীর ভূমিকম্পে ‘P-wave’ (Primary wave) ও ‘S-wave’ (Secondary wave) দ্রুত পৃষ্ঠে পৌঁছে যায়, এবং পরবর্তীতে ‘Surface Waves’ (Love ও Rayleigh waves) অধিক ক্ষতিকর কম্পন সৃষ্টি করে। এই ভূমিকম্প প্রায় ৪০ সেকেন্ড স্থায়ী হওয়ায় বোঝা যায় যে ফল্ট বরাবর একটি উল্লেখযোগ্য দৈর্ঘ্যে স্লিপ বা স্থানচ্যুতি ঘটেছিল।
এই শক্তি নির্গমনের মূল কারণ ‘Elastic Rebound Theory’। ভূত্বকের শিলাস্তরগুলো দীর্ঘদিন ধরে টেকটোনিক চাপের ফলে বিকৃত হতে থাকে এবং স্থিতিস্থাপক শক্তি সঞ্চয় করে। যখন শিলার সহনসীমা অতিক্রম করে, তখন হঠাৎ ভেঙে গিয়ে সঞ্চিত শক্তি মুক্তি পায়— এটাই ভূমিকম্প। সাতক্ষীরা অঞ্চলে জমে থাকা এই ‘Elastic Strain’ সম্ভবত স্থানীয় কোনও ফল্ট লাইনে হঠাৎ স্লিপের মাধ্যমে মুক্ত হয়েছে।

বেঙ্গল বেসিন, ইওসিন হিঞ্জ লাইন ও টেকটোনিক প্রেক্ষাপট

পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপীয় অববাহিকাগুলির একটি— ‘বেঙ্গল বেসিন’-এর ওপর। এই অববাহিকার সৃষ্টি হয়েছে কোটি কোটি বছর ধরে পলিসঞ্চয়ের মাধ্যমে। হিমালয় থেকে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ অবক্ষেপ দক্ষিণে সঞ্চিত হয়ে প্রায় ১৫-২০ কিলোমিটার পুরু সেডিমেন্টারি স্তর গঠন করেছে, যা ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত অস্থির।
এই বেসিনের নিচ দিয়ে বিস্তৃত রয়েছে ‘ইওসিন হিঞ্জ লাইন’— একটি প্রাচীন কাঠামোগত দুর্বল অঞ্চল, যা ইওসিন যুগে (প্রায় ৫৬-৩৪ মিলিয়ন বছর আগে) গঠিত হয়। এটি মূলত একটি টেকটোনিক সীমারেখা, যেখানে বেসিনের অবনমন ও উত্তোলনের পার্থক্য দেখা যায়। কলকাতা ও সাতক্ষীরা এই রেখার খুব কাছাকাছি অবস্থিত, ফলে অঞ্চলটি ভূকম্পীয়ভাবে সংবেদনশীল।

ভারতীয় প্লেট বর্তমানে প্রায় ৫ সেন্টিমিটার/বছর গতিতে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। এই সংঘর্ষের ফলেই হিমালয়ের উদ্ভব এবং আজও তার উত্তোলন অব্যাহত। একই সঙ্গে পূর্বদিকে ভারতীয় প্লেট বার্মা মাইক্রোপ্লেটের নিচে স্লাইড করছে, যা ‘ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোন’ নামে পরিচিত। এই জটিল প্লেট গতিবিদ্যার ফলে বেঙ্গল বেসিনে বহুবিধ ফল্ট ও ফ্র্যাকচার গঠিত হয়েছে। সাতক্ষীরা অঞ্চলটি সুন্দরবনের নিকটবর্তী হওয়ায় এখানে অসংখ্য ক্ষুদ্র ‘লোকাল ফল্ট’ বিদ্যমান। এগুলি মূলত সেডিমেন্টারি স্তরের ভেতরে গঠিত দুর্বল অঞ্চল, যেখানে টেকটোনিক চাপ জমা হতে পারে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্প সম্ভবত এমন কোনো ফল্টে ‘strike-slip’ বা ‘normal faulting’-এর মাধ্যমে ঘটেছে। যদিও এটি বৃহৎ প্লেট সীমান্তে সংঘটিত হয়নি, তথাপি স্থানীয় কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে উল্লেখযোগ্য কম্পন সৃষ্টি হয়েছে।

দক্ষিণবঙ্গের পলিমাটি, সয়েল অ্যাম্পিফিকেশন ও লিগুইফ্যাকশন ঝুঁকি

কেন্দ্র সাতক্ষীরায় হলেও কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গে কম্পন তীব্রভাবে অনুভূত হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ ‘Soil Amplification’। দক্ষিণবঙ্গ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদ ব্যবস্থার দ্বারা সৃষ্ট নবীন পলিমাটি দিয়ে গঠিত। এই মাটি সাধারণত আলগা, জলপূর্ণ এবং কম ঘনত্বসম্পন্ন। ভূমিকম্পের তরঙ্গ যখন কঠিন শিলা থেকে নরম পলিস্তরে প্রবেশ করে, তখন তরঙ্গের গতি কমে যায় কিন্তু অ্যাম্পিটিউড বৃদ্ধি পায়— ফলে কম্পন বেশি অনুভূত হয়।

বিশেষত কলকাতার বহু অংশে ৩০-৫০ মিটার পুরু নরম পলি স্তর রয়েছে। এই স্তর ‘Site Response’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির কম্পনকে বাড়িয়ে তোলে। ফলে বহুতল ভবনগুলিতে ‘Resonance Effect’ দেখা দিতে পারে, যেখানে ভবনের প্রাকৃতিক কম্পাঙ্ক ও ভূমিকম্পের তরঙ্গের কম্পাঙ্ক মিললে দুলুনি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এর পাশাপাশি রয়েছে ‘Liquefaction’-এর ঝুঁকি। যখন জলপূর্ণ আলগা বালুকাময় মাটিতে ভূমিকম্পের কম্পন ঘটে, তখন ছিদ্রজলের চাপ হঠাৎ বেড়ে যায় এবং মাটির কণাগুলির মধ্যে ঘর্ষণ কমে যায়। ফলে মাটি অস্থায়ীভাবে তরলের মতো আচরণ করে। এর ফলে ভবনের ভিত্তি বসে যেতে পারে, রাস্তা ফেটে যেতে পারে, এমনকি মাটির নিচ থেকে বালু ও জল বেরিয়ে আসতে পারে। যদিও এই ভূমিকম্পে বড় ধরনের কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তথাপি ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা স্পষ্ট— দক্ষিণবঙ্গের নরম বদ্বীপীয় ভূপ্রকৃতি ভূমিকম্পের প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম। ভবিষ্যতে বৃহত্তর মাত্রার ভূমিকম্প ঘটলে এই সয়েল কন্ডিশন একটি বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সুন্দরবন ও উপকূলীয় পরিবেশের সম্ভাব্য প্রভাব

সাতক্ষীরা সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার। এই অঞ্চল কেবল মানব বসতির দিক থেকে নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও অত্যন্ত সংবেদনশীল। অগভীর ভূমিকম্প মাটির নিচের স্তরে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যার ফলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ওঠানামা করতে পারে বা নোনা জলের অনুপ্রবেশ বাড়তে পারে। ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। মাটির রাসায়নিক গঠন বা জলস্তরে পরিবর্তন হলে তা দীর্ঘমেয়াদে উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি কাঁচা ঘরবাড়ি ও দুর্বল অবকাঠামোর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে বেশি।

ভবিষ্যৎ ঝুঁকি; ‘মেগা থ্রাস্ট’ আশঙ্কা

কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গ ‘সিসমিক জোন ৩’-এর অন্তর্গত, যা মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা করছেন যে বেঙ্গল বেসিনের গভীরে একটি ‘মেগা থ্রাস্ট ফল্ট’ থাকতে পারে। যদি কখনো সেই ফল্টে বৃহৎ পরিসরে শক্তি নির্গমন ঘটে, তবে ৮ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আজকের ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প হয়তো সেই বৃহৎ শক্তির একটি ক্ষুদ্র বহিঃপ্রকাশ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— প্রকৃতি হঠাৎ করে বড় বিস্ফোরণ ঘটায় না; বরং ছোট ছোট সংকেতের মাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তা দেয়।
নগর পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির অপরিহার্যতা

কলকাতার মতো জনবহুল মহানগরে বহু পুরনো ও জীর্ণ অট্টালিকা এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে। এদের অধিকাংশই আধুনিক ভূমিকম্প-প্রতিরোধী নকশা অনুযায়ী নির্মিত নয়। ফলে মাঝারি মাত্রার কম্পনেও বড় ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। ‘আর্থকোয়েক রেজিস্ট্যান্ট’ নির্মাণ এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিক নিরাপত্তার মৌলিক শর্ত। পুরনো ভবনের ‘রেট্রোফিটিং’, বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে প্রয়োগ, স্কুল-হাসপাতালে মহড়া চালু করা— এসব পদক্ষেপ অবিলম্বে নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, কীভাবে আতঙ্ক এড়াতে হবে— এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ জীবন বাঁচাতে পারে।
সতর্কতার বার্তা, আতঙ্ক নয়

প্রকৃতি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়— মাটির নিচে যে শান্ত স্তর আমরা দেখি, তার গভীরে জমা থাকে বিপুল শক্তি। ৪০ সেকেন্ডের সেই কম্পন আমাদের নিরাপত্তা-ভাবনার ভিত নড়িয়ে দিয়েছে। আমরা হয়তো ভূমিকম্প থামাতে পারব না। কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সঠিক নগর পরিকল্পনা, এবং কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এই ঘটনাকে আতঙ্কের উৎস না ভেবে সতর্কতার বার্তা হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ প্রকৃতি সংকেত দেয়— শোনার দায়িত্ব আমাদের।

Related Articles