সম্পাদকীয়

বাঙালি জাতির মহান শিক্ষক রামকৃষ্ণদেব

দিন দিন ভারতীয় সমাজ নানান রাজনৈতিক বিভিন্নতা, কুটকৌশল ও ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং রক্ষণশীলতার জন্য যেন এক বদ্ধ জলাশয়ের রূপান্তরিত হয়ে পড়েছিল।

সুকান্ত পাল: ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৮ তারিখে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জন্ম নিছক একটি মানব সন্তানের জন্ম নয়। ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলার আরও এক মহাপুরুষ চৈতন্যদেবের জন্মদিনের মতোই বাঙালির জীবনে এই দিনটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। পঞ্চদশ শতকে যে নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল শ্রীচৈতন্যের নেতৃত্বে, পরবর্তীকালে তিনশো বছর পর রামকৃষ্ণদেব সেই মহান কাজের মশালকে বয়ে নিয়ে গেছেন। এখানে লক্ষ্যণীয় এই দুই মহান ব্যক্তির জন্ম তারিখ ছিল ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮ ফেব্রুয়ারি। ইতিহাসের এ এক আশ্চর্য সমাপতন। যাই হোক, উনিশ শতকীয় নবজাগরণের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে রামকৃষ্ণদেবের আবির্ভাব।

নবজাগরণের সময় কালকে একটু ব্যাখ্যা করলে আমরা দেখতে পাই যে প্রাচীনকালের শিক্ষা সংস্কৃতি একসময় সমগ্র বিশ্বে বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে বহির্জগতের আক্রমণে ভারতবর্ষ তার প্রাচীন গৌরব হারিয়ে ফেলেছিল। দিন দিন ভারতীয় সমাজ নানান রাজনৈতিক বিভিন্নতা, কুটকৌশল ও ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং রক্ষণশীলতার জন্য যেন এক বদ্ধ জলাশয়ের রূপান্তরিত হয়ে পড়েছিল। ভারতীয় বৈদিক সনাতন ধর্ম বিভিন্ন কুসংস্কারে জর্জরিত হয়ে একেবারে চলৎ শক্তিহীন হয়ে পড়েছিল। ফলে বিভিন্ন অন্ধবিশ্বাস, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, হিংসা, দ্বেষ ভারতীয় সমাজ জীবনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। এর সুযোগ নিয়েছিল বিভিন্ন গোঁড়া, রক্ষণশীল ধর্মব্যবসায়ী ও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা এবং তাদের সঙ্গে সমানভাবে সঙ্গত করেছিল বিদেশি শক্তি। এর ফলে সমাজ এক বিচ্ছিন্নতাবাদের শিকার হয়।

এই বাংলায় যখন পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে বিভিন্ন সংস্কারপন্থী আন্দোলন চলছে তখনও কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে অধিকাংশ সনাতনপন্থী ছিলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন শাখা যেমন শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব প্রভৃতিদের মধ্যে রেষারেষি। অথচ সবাই সনাতনপন্থী। এই এক অদ্ভুত ও জটিল পরিস্থিতি। শুধু তাই নয়, এই সময়ে বিভিন্ন ধর্ম সংস্কারক গোষ্ঠীর মধ্যেও ছিল কলহ। এর ফলে বাঙালি ধর্ম ভাবনা ও সমাজ ভাবনা আরও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করল। ফলে বাঙালি জাতি এক চিত্ত সঙ্কটের সম্মুখীন হল। এই প্রেক্ষাপটে রামকৃষ্ণের আবির্ভাব। শুধু ধর্মের গণ্ডিতে এবং আলোকে রামকৃষ্ণকে বিচার-বিশ্লেষণ করার সঠিক না। তাঁর বাণী এবং নির্দেশনা ছিল একটি সুস্থ জীবনচর্চার আরাধনা মাত্র। এদিক থেকে দেখতে গেলে তিনি অবশ্যই নবজাগরণের একজন অভিভাবক।

নবজাগরণের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে আছে মানুষ। মানব কল্যাণই তার উদ্দেশ্য। মানবতার জয়গানই ছিল নবজাগরণের বীজ মন্ত্র। রামকৃষ্ণ কিন্তু এই বীজ মন্ত্রটিকেই তাঁর চেতনা ও হৃদয় দিয়ে শুধু গ্রহণই করেননি, তাকেই আত্মস্থ করে তাঁর জীবন চর্যা ও বাণীকে ছড়িয়ে দিতে, মানুষের মনের মধ্যে বপন করতে চেয়েছিলেন।

এখানেই তিনি হয়ে ওঠেন সাধারণ হয়েও এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। নবজাগরণের মূল সুরটি অর্থাৎ মানবতাবাদ এখানেই ধ্বনিত হয়ে উঠেছে। আসলে তিনি কখনওই এক ধর্ম থেকে অন্য ধর্মকে পৃথক করে দেখেননি। বাহ্যিকভাবে যারা প্রতিটি ধর্মকে পৃথক করে ভাবে এবং দেখে তারাই ধর্ম সমন্বয়ের কথা বলে। রামকৃষ্ণ এই পৃথক সত্তার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন। এক অভেদ চেতনার দিকে মানুষকে পথ নির্দেশ করেছেন। এই অভেদ চেতনা শুধু ধর্মকে কেন্দ্র করেই নয়, জাতিবর্ণ নির্বিশেষে যে কোনও মানুষকেই কখনও কখনও এই বিশ্বসংসারের সব প্রাণীকেই তিনি তাঁর এই অভেদ চিন্তার বৃত্তের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তাঁর এই অভেদ চিন্তাকে আমরা আজও আয়ত্ত করতে পারলাম না। যতদিন পর্যন্ত আমরা তাঁকে আয়ত্ত করতে না পারব, ততদিন পর্যন্ত রামকৃষ্ণের শিক্ষার চর্চা আমাদের করে যেতেই হবে। সেই উনিশ শতক থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত বাঙালি জাতির মহান শিক্ষক রূপে তিনি এখনও বিরাজমান। তাঁকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

Related Articles