হাসিনার মৃত্যুদণ্ড: এই উপমহাদেশে বিচারের প্রহসন
বিচারকের ভাষায়, রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন এবং গণবিদ্রোহের সময় বৃহৎ পরিসরে মানবাধিকার লঙ্ঘন— এই অভিযোগগুলিই তাঁদের বিরুদ্ধে অপরিবর্তনীয়ভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
সত্যগোপাল দে (সাংবাদিক, শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং সাইকোলজিকাল কাউন্সেলর): আগের বছর জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলিতে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যে ঐতিহাসিক রায় দিল, তা বাংলাদেশের রাজনীতিকে নতুন এক সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামি লিগ নেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড এই উপমহাদেশের বিচার প্রহসনের অন্যতম নির্দশন হবে কিনা সময় বলবে। একই সাজা পেয়েছেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও।
বিচারকের ভাষায়, রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন এবং গণবিদ্রোহের সময় বৃহৎ পরিসরে মানবাধিকার লঙ্ঘন— এই অভিযোগগুলিই তাঁদের বিরুদ্ধে অপরিবর্তনীয়ভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তিন নম্বর অভিযুক্ত, বাংলাদেশ পুলিশের প্রাক্তন প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন অবশ্য তুলনামূলক ভাবে শিথিল দণ্ড পেয়েছেন; কিছু ক্ষেত্রে ‘ক্ষমা প্রদর্শন’ করে তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কারণ তিনি রাজসাক্ষী হয়েছেন।
তবে এই রায়ের আরে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক— হাসিনা ও কামাল দু’জনেই বাংলাদেশের বাইরে। ট্রাইব্যুনাল স্পষ্ট জানিয়েছে, পলাতক অভিযুক্তদের কাছে অর্ডার কপি প্রেরণ করা হবে না। তিরিশ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ করে তারা রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাভিক্ষা করতে পারেন বা আপিল করতে পারেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই রায়ের অভিঘাত আগামী দিনে স্পষ্ট হবে।
শেখ হাসিনা নির্দোষ একথা বলেতে চাই না, তিনি আরও সংযত হতে পারতেন কিন্ত যে আন্দোলন ছিল কোটা বিরোধী এককেন্দ্রিক আন্দোলন, সেটাই রুপান্তরিত হল ক্ষমতা দখলের লড়াইতে। সেই অনেকটা ‘ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল’ গোছের। যারা আন্দোলন করেছিলেন তাদের হাতে একটাও শান্তিশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের হত্যা হয়নি? নষ্ট হয়নি রাষ্ট্রের সম্পত্তি? আন্দোলনকারীদের আসল উদ্দেশ্য ইতিমধ্যে প্রমাণিত। তারা ক্ষমতা দখলের লড়াইতে এগিয়েছে অনেক দূর, গঠন করেছে রাজনৈতিক দল। তাদের দুর্নীতি নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ইতিমধ্যে মুখরিত।
মহম্মদ ইউনুসের রাজনীতিতে আসার অভীপ্সা দীর্ঘকালীন। এই মৃত্যুদণ্ড রাজনৈতিক স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়ার ধাপ। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি সত্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে— মহম্মদ ইউনুস নিজেকে রাজনীতির বাইরে বলে দাবি করলেও, বাস্তবে তাঁর অবস্থান দিন দিন রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের দিকেই ইঙ্গিত করছে।
ইউনুস দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ‘নিরপেক্ষ উন্নয়নভাবনা’-র প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি দেখায়, তিনি শুধু পরামর্শদাতা নন— বরং রাষ্ট্রক্ষমতার ওপরে এক ধরনের নীরব প্রভাব বিস্তারের আগ্রহ তাঁর মধ্যে প্রবল। এই উচ্চাভিলাষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে খাপ খায় না।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের স্বল্পমেয়াদি প্রশাসনিক ম্যান্ডেটকে কেন্দ্র করে যদি কেউ নতুন বাংলাদেশ গঠনের নামে কোনও ব্যক্তির একক উচ্চাশা জনগণের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশাকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
পাকিস্তানের সঙ্গে ডঃ ইউনুসের দোস্তি বাংলাদেশের আপামর জনগণ কি মেনে নিয়েছেন? ১৯৭১-এ মা-বোনেদের ইজ্জত লুন্ঠনকারী পাকিস্তানের অন্তরঙ্গ বন্ধু পাকিস্তান। এই পাকিস্তানের মাটিতে আরও এক মৃত্যুদণ্ডের দিকে তাকান যাক।
প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর পর পাকিস্তান আবার ফিরে তাকাচ্ছে ইতিহাসের এক অন্ধকারতম অধ্যায়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর ফাঁসি কি ন্যায়সঙ্গত ছিল, নাকি ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সাজানো মঞ্চ? পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায় এই প্রশ্নকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে— ভুট্টোর বিচার প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্তগুলো লঙ্ঘিত হয়েছিল; প্রক্রিয়াগত ত্রুটি, রাজনৈতিক চাপ এবং বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার অভাব পুরো মামলাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।
২০১১ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি যে প্রেসিডেন্সিয়াল রেফারেন্স দাখিল করেছিলেন, তা নিয়ে অনেক শুনানি হয়েছে। প্রধান বিচারপতি কাজী ফয়েজ ঈসার নেতৃত্বে নয় সদস্যের বেঞ্চ সাতটি ধারাবাহিক শুনানি শেষে মতামত দেয়; এরপরই ঘোষিত হয় বহুল আলোচিত এই রায়। রায় ঘোষণার সময় প্রয়াত ভুট্টোর নাতি বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারির চোখে জল দেখা গেছে— তবু তার অভিব্যক্তিতে ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পাওয়া স্বস্তির নিশ্বাস।
আমরা জানি ভুট্টো ভারতের সঙ্গে হাজার বছর লড়াই করতে চেয়েছিলেন, এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান ছিনতাই করে পাকিস্তানের মাটিতে বিস্ফোরণ সব কিছুতেই ছিল তার হাত কিন্ত শান্তিকামী ভারত শত্রু দেশে বিচারের প্রহসন হোক সেটা চায় না।
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা হয়েছে। এই রায় বাস্তায়িত হওয়া নিকট ভবিষ্যতে যে সম্ভব নয় সেটা সবাই জানেন। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞগণ বলবেন ভারত সরকারের হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার কোনও দায় আছে কিনা?
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মজবুত সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক সরকারের ভূমিকা অপরিহার্য। বিচার ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য হওয়া উচিত। তদারকি সরকার তড়িঘড়ি হাসিনার বিচারের দিকে হাত না বাড়িয়ে একটি নির্বাচিত সরকার গঠেন ত্বরান্বিত করলে আরও বেশি বাহবা পেতেন। ডঃ ইউনুস একজন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, ছাত্র আন্দোলনকারীরা তাঁকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। কিন্ত তিনি ক্ষমতায় এসে উন্নয়নের কি রূপরেখা দিয়েছেন সেটা না জানা গেলেও হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া তিনি ত্বরান্বিত করেছেন। কারণ তাকে যে নিষ্কন্টক হতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন প্রধান প্রশ্ন হল জাতীয় সংসদ নির্বাচন কবে? এ ইস্যুতে এখন পর্যন্ত মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনও সুস্পষ্ট অবস্থান নেই। নির্বাচনের বদলে দেশে চলছে সংস্কার সংস্কার খেলা বরং বলা ভাল সংস্কারের লুকোচুরি।
বাংলাদেশের সংবাদপত্রে প্রকাশ জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এক মাস ধরে বৈঠক করে বলল, ‘এখন দ্বিতীয় রাউন্ড বৈঠক হবে’। বৈঠকের নামে এ তামাশার মানে যে কালক্ষেপণ তা বুঝতে কারও অসুবিধা নেই।
মহম্মদ ইউনুস কথা দিয়েছিলেন, ‘আগামী ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ নির্বাচন আদৌ হবে কি না তা নিয়ে এখন সন্দেহ ক্রমে ঘনীভূত হচ্ছে।
বিএনপি-র পক্ষ থেকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে, না হলে বাংলাদেশে নির্বাচন হবে না।’
২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকা বর্তমান ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে চলমান বিক্ষোভ ইঙ্গিত দেয় যে, তাঁর দীর্ঘ শাসন আমলে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক সূচক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির বিপরীতে নাগরিক স্বাধীনতা ও অধিকারের স্পষ্ট অবক্ষয়ের পরে ক্ষোভের মাত্রা বাড়তে থাকে। ধরে নেওয়া যেতে পারে তার কিছু সিদ্ধান্ত অগন্ত্রাতিক, তা হলে হাসিনা ছাড়া যারা মসনদে বসেছেন ইউনুস সহ সবাই গণতান্ত্রিক। বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে। এই সময়ে দৈনিক ২.১৫ ডলারের নিচে বসবাসকারী লোকের সংখ্যা ১৮.২ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ প্রতি ৫ বছরে প্রায় ৫ শতাংশ হ্রাস। সুতারাং হাসিনা সরকার কাজ করেনি তা কি বলা যাবে?
বিগত ১৫ বছরের উন্নয়নের পরিসংখ্যানকে এক পাশে রেখে ইউনুস এবং তাঁর অনুরাগীরা অনেক কথাই বলতে পারেন। কিন্ত হাসিনার আমলে পরিকাঠামো উন্নয়ন, মেট্রো রেল, পদ্মা সেতু এগুলি উন্নয়নের কি সূচক নয়? তত্ত্বাবধায়ক সরকার হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার খেলার পাশাপাশি এই সব উন্নয়নের স্মারকগুলি কি গুঁড়িয়ে দেবে?
আমি একথা বলতে চাইছি না যে, শেখ হাসিনা ভুল করেননি। এটাও বলছি না যে, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। তা হলে ইউনুস তাড়াতাড়ি নির্বাচন করে রাজনৈতিক সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে এত দেরি করছেন কেন? এত তড়িঘড়ি হাসিনার বিচার, পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব ভারতের সঙ্গে বৈরিতা আন্তর্জাতিক মহল ভাল চোখে দেখছে না।
পৃথক পৃথক বিবৃতিতে মানবাধিকার নিয়ে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই জনের অনুপস্থিতিতেই বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং তাদের পছন্দের আইনজীবী দেওয়ার সুযোগ ছিল না যেটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়, এই মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরোধিতা করেছে, কেন না দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের সাজা বাতিলের আহ্বান জানিয়ে আসছে জাতিসংঘ।
এছাড়া, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দুই জনের অনুপস্থিতিতে বিচারের ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ গতি এবং রায় এই মামলার ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ‘উল্লেখযোগ্য ন্যায় নীতি লঙ্ঘিত হয়েছে।
এই কাগুজে রায় কোনওদিন বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম। মানুষ চাইলে হাসিনা এবং তার আওয়ামী লিগকে কোণঠাসা করা ভোটের ব্যালটেই সম্ভব, ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে নয়। এখনও সময় আছে। তদারকি সরকারের প্রধান উপদেষ্টা যথার্থ গণতন্ত্রের লক্ষ্যে ইতিহাস সৃষ্টি করুক। বিচারের প্রহসন না করে বাংলাদেশকে একটা নতুন কিছু উপহার দিন ইউনুস সাহেব।






