সম্পাদকীয়

শিল্প সংস্কৃতিকে করুন প্যাশন, প্রফেশন নয়!

মানে আমরা এ কথা বলতেই পারি যে- কোনও শিল্প প্রয়োজন ছাড়া তৈরি হয়নি।

বাবুল চট্টোপাধ্যায় (প্রাবন্ধিক): হ্যাঁ, কথাটা একেবারে বাস্তব। আমরা জানি বাঙালি মাত্রই ভাবুক। আবেগ আমাদের সঙ্গী। বেঁচে থাকার রসদ। শুধু বাঙালি কেন অন্য অনেক জাতির মধ্যেও এই একই সমন্তরাল ভাবধারা দেখা যায়। আর সফট, রোমান্টিক আবেগ থেকে আমাদের মধ্যে একটি শিল্প চেতনা ধরা দেয়। অজান্তেই। অনেকে আগে থেকে যার বীজ পোঁতা হয়েছিল প্রয়োজনের তাগিদে। মানে আমরা এ কথা বলতেই পারি যে- কোনও শিল্প প্রয়োজন ছাড়া তৈরি হয়নি।

প্রাচীন কালে ধান ভর্তি গোলার ছবি আঁকলে জমিতে ফসল উপছে পড়বে, বাঘের ছবি সকলে বাঘ শিকার সহজ হবে, বৃষ্টির প্রার্থনা করে গান গাইলে পর্যাপ্ত বৃষ্টি আসবে— এমন বহু ধারণা থেকে শিল্প-সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। লোকসংস্কৃতি সেই কথা বলে। তবে শিল্প বা নান্দনিকতা সবটাই নিপাট আনন্দের জন্যে। এর সঙ্গে বাণিজ্যের খুব একটা ভাল রসায়ন নেই। মানে চলতি কথায় এই সৃষ্টিমূলক শিল্প কর্মে অধিকাংশের পেটের ভাত জোগানো খুবই কষ্টকর। তবে সাফল্য পেলে ভাগ্য খোলে। তো আপনি যতই মন দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করুন না কেন আপনার ভাগ্য সঙ্গ না দিলে আপনার কিছুই করার থাকে না। তাই বিনোদনের জগৎ অর্থাৎ শিল্প সংস্কৃতিকে প্যাশন হিসাবে ভাবা ভাল, কখনও প্রফেশন নয়। তবে একটা সময় যদি সংঘর্ষে আপনার ভাগ্য আপনার সঙ্গ দেয় তবেই আপনার এটা প্রফেশন হতে পারে।

আমরা দেখেছি আমাদের মধ্যমানের ছেলেমেয়েদের অভিনয়, নাচ, গান নিয়ে বিপুল উন্মাদনা। রুপোলি জগৎ বা পরিচিতি ও পয়সা বোধহয় খুব সহজে হয়। কিন্তু দেখা গেল আপনার বিপুল নাম হলেও পয়সা তেমন হল না। এবার আপনি পড়লেন মহা বিপদে। আপনার স্ট্যাটাস বেড়ে গেছে। সুতরাং খরচও বেড়েছে। পরিচিতি বেড়ে গেছে। ভাবও বেড়ে গেছে। আপনি এখন সেলফি দিয়ে বেড়ান। আপনার কাছে অনেকেই একটু প্রমোট করার জন্যে সুপারিশ করেন। মানে ইউ আর অ্যা সেলিব্রেটি। এই অবধি ঠিকঠাক। এরপর তো জ্বালা বুজবেন।

উদাহরণ এ যাই। ধরা যাক আপনি কোনও টেলি সিরিয়ালের মুখ্য চরিত্র। আপনার ভীষণ নাম। টিভি খুললেই আপনাকে দেখা যায়। আপনার মা বাবার বিরাট গর্বের জায়গা আপনি। আপনি বেজায় মজে আছেন। উল্টোদিকে দেখা গেল আপনার পড়াশুনো ততদিনে গোল্লায় গেছে। ভাবলেন এই তো বেশ আছি। হয়তো দেখা গেলো ছত্রিশ এপিসোডের পরে আপনি জানলেন আপনি ওই টেলি চরিত্র থেকে বাদ। কারণ সিরিয়াল লসে রান বা আর সময় নেই। ফলে নেক্সট এপিসোডে আপনাকে মরতে হবে। টেলি চরিত্রে প্রডিউসার আর টানতে পারছেন না। সুতরাং ওই সিরিয়াল বন্ধ। আপনার মাথায় হাত। এবার পরীক্ষার ফাইনাল ছিল। তা দেওয়া হল না। ওদিকে আপনার হাতে জন্যে কাজও নেই। কিন্তু হাজারও প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে আপনাকে। পড়াশুনো গেল, খরচা বাড়ল, নাম গেল, ডিপ্রেশন এল। এমন কত!

অনেকেই আছেন বহু চলচ্চিত্রে ও সিরিয়ালে কাজ করেছেন। বর্তমানে কোনও কাজ নেই। এমনকী কোনো পার্শ্বচরিত্রেও ডাক পান না। এখন সম্পূর্ণ ডিপ্রেশন চলে গেছেন। এমন অনেক ঘটনা বর্তমানে টিভি, সোশ্যাল মিডিয়ায় দৌলতে জানতে পারি। আবার এমন অনেককেই জানি না যাদের এই খ্যাতির অঘোরে জীবন যাচ্ছে। বাবা-মা হাজারও বারণ করলেও এমন অনেকে আছেন যারা কোনও কর্ণপাত করেন না। কোনওভাবেই নিজেদের গ্ল্যামার জগৎ থেকে সরাতে পারছেন না। হয়তো দেখা গেল মরিয়া চেষ্টা করে ওই জায়গায় পৌঁছে বর্তমানে আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। কী করবেন কিছুই ভেবে উঠতে পারছেন না। তবে ওই ফিল্ডে এমন অনেকেই আছেনা যারা কিনা ভাল চাকরি বা ব্যবসা করে দিব্যি আছেন। এমন নাট্যকর্মী আছেন যিনি সফল নাট্যকার আবার তিনি কলেজের অধ্যাপক। ওই নাট্যকার যদি সঠিক সময়ে ঠিকমতো পড়াশুনো না করতেন তা হলে কি কলেজে চাকরি করতে পারতেন? না পারতেন না। এমন চিকিৎসক আছেন যিনি সফল কবিও। উদাহরণ আর না বাড়িয়ে একথা বলতে পারি, সঠিক সময়ই সঠিক কাজ করে অনেক সুন্দর ভাবে জীবন কাটানো যায়। যাতে অর্থের জোগান ও মনের আনন্দ দুইই বজায় থাকে।

তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। আমরা আবার সেটাকে বেশি করে দেখি। কিন্তু এটা ভুলে যাই যে সেটা হল ব্যতিক্রম। তাদের ওপর ভগবানের প্রভূত আশীর্বাদ থাকে।  আর এতা উধাহরণ ভেবে যারা সামান্য ট্যালেন্ট নিয়ে বিরাট কোনও আশা করে বসে তাদের কপালে থাকে মহা বিপদ। মানে সব দিক থেকে বিপদ। এমনকী সাধারণ জীবনযাপনে প্রবল অসুবিধা হয়। এটা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে মৃত্যু খুব স্বাভাবিক মনে হয়। শিল্প সংস্কৃতি মনের খিদে মেটায় আর্থিক খিদে নয়। তাই তার জন্যে নিজের পায়ের নিচে মাটিকে শক্ত করে রাখা জরুরি। প্রথম জীবনে এই হতভাগা কবিতা দিয়ে শুরু করলেও এক স্বনামধন্য অধ্যাপক কবি বলেছিলেন যে চল্লিশের পর তুমি কবি।

এখানে দুটি কথা। এক, চল্লিশ বছর বয়সের পর তোমার লেখার শৈলী জেগে আছে কিনা, দুই তুমি আর্থিক প্রতিষ্ঠা পেলে কিনা। পেলেও তুমি কি এখনও কোনও লেখায় আগ্রহী কিনা। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্য। এই অবস্থা থেকে এখন অনেক এগিয়ে ছেলেমেয়েরা। এমনও জানি কবিতা লেখে বললে বলে ‘গেল’! মানে এখনকার ছেলেমেয়েরা যে খুব সচেতন। অনেক ক্ষেত্রে দেখি নিজের কাজ গুছিয়ে ভালোই মনের আনন্দে কাজ করে চলেছেন বহু মানুষ। সাফল্যও আসে। তারাই ও জীবনে জিতে যায়। তাই প্রফেশন নিয়ে শিল্পকর্মকে না ভেবে প্যাশন হিসাবে ভাবলে জীবন সামন্তরাল হবে। নইলে জীবনেরও ঝুঁকি।