সম্পাদকীয়

মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে পালাচ্ছে সন্তান, স্বার্থের বলি সম্পর্ক

কী পরিস্থিতি তার! কী অনুভবই বা তার! তার বা তাদের মানসিক অবস্থানই বা কি এ রকম সাত সতেরো হাজার সমস্যায় তাঁরা।

বাবুল চট্টোপাধ্যায় (লেখক—প্রাবন্ধিক): সন্তান জন্মের জন্য হাজারও যন্ত্রণা সহ্য করেন মা। সন্তানের জন্যে ত্যাগ করেন বহুকিছু। আদর, আবদার অনেক জুগিয়েছিলেন সন্তানের। ইচ্ছে ছিল সেই সন্তান যেন মানুষের মতো মানুষ হয়। হ্যাঁ, হয়েছে। সন্তান বাইরে। পিতা মাতার গর্বের শেষ নেই। তবে যন্ত্রণার কাণ্ডটা বড়ই গোলমেলে। তিনি বৃদ্ধাশ্রমে। কী পরিস্থিতি তার! কী অনুভবই বা তার! তার বা তাদের মানসিক অবস্থানই বা কি এ রকম সাত সতেরো হাজার সমস্যায় তাঁরা।

ঘটনা ১—  ছেলেও আছে। মেয়েও আছে। তাও বৃদ্ধাশ্রমে। বৃদ্ধা সব সময় সেজেগুজে থাকেন। ছেলেমেয়ের প্রতি অপার বিশ্বাস। সবাইকে বলে বেড়ায় আমি এখানে স্বেচ্ছায় এসেছি। আমার বাবু, বুবিন খুব ভাল। ওরা আমাকে তাড়ায়নি। প্রতি মাসে পয়সা পাঠায়। তার হাতে একটা ব্যাগ থাকে। খেতে গেলেও সেটা সে নিজের থেকে আলাদা করে না। কিন্তু জানলে অবাক হবেন আসল রহস্য! বৃদ্ধা সেজে ও ব্যাগ নিয়ে থাকেন, কারণ সব সময় ভাবে তার ছেলে বা মেয়ে কেউ এসে তাকে নিয়ে যাবে। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় এই সাত বছরে কেউ আসেননি।

ঘটনা ২— ছেলে ফেলে গেছে মাকে। হ্যাঁ, বৃদ্ধাশ্রমে। একটা চার্জ লাগে। হ্যাঁ সেই অবধি। একবার মাকে ফেলে রেখে আর আসেননি। মানে যেদিন মাকে নিয়ে এখানে আসা সেদিনই শেষ আসা। এরপর বার পঁচিশ অসুস্থতার কথা জানলেও ছেলে আর আসেননি। বলেছেন আমি কি ডাক্তার। বরং ডাক্তার ডাকুন। সে গেলেই কাজ হবে। পয়সার জন্যে চিন্তা করলে হবে না।

ঘটনা ৩— মাকে নিয়ে এসেছে সন্তান। বেশ আয়োজন। কথাবার্তা হয়ে গেছে বৃদ্ধাশ্রমে। সমস্ত আয়োজন জেনে নিয়েছে সন্তান। বেশ খুশিই মনে হল। এখনকার পরিবেশ বেশ ভাল। মোটামুটি যা যা নিয়ম আছে সব হয়ে দেখে নিয়েছে। এবার একটা ফ্রম ফিলআপ করলেই হল। অর্ধেক করতে না করতেই একটা ফোন এল। না, টাওয়ার পাচ্ছে না। এমত অবস্থায় একটু বাইরে গেল। একটু দেরি হচ্ছে। এবার কর্মকর্তা অবাক হলেন। এক ঘণ্টা হয়ে গেছে ওই ব্যক্তির কোনও খবর নেই। অগত্যা ফোন।  অপর প্রান্ত থেকে শোনা গেল– ওই পাঠটা আপনারাই সামলান। আমার আর টাইম হবে না। না, সেই সন্তান মাকে ফেলে রেখে পালিয়েছেন। আর এমুখো হননি।

ঘটনা ৪— একটা খরচা দিতে হয় বৃদ্ধাশ্রমে। না, এই মাসে তো এখনও এল না! কেন এল না— বিষয়টি এখনকার কর্তৃপক্ষ জানেন না। আসলে তিন ছেলের ভাগাভাগিতে এবার এক ছেলে মায়ের খরচা দিতে অস্বীকার করেন। সুতরাং আরও দু’জনও বেঁকে বসে। ফলে স্বচ্ছল অবস্থার তিন ছেলের অসভ্যতার ফলে মায়ের নাজেহাল অবস্থা। ভাবুন একবার!

এ রকম হাজার হাজার ঘটনা আমাদের সমাজে ঘটে থাকে। আপনি হয়তো দেখে থাকবেন কোন বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে স্টেশনে ফেলে রেখে অনেকেই পালিয়েছেন। এমন কতই আছে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছেন। এরপর আর কোনওদিনই খোঁজ খবর রাখেননি। আবার ভুল নম্বর দেওয়া বা জেনে বুঝে কাউকে বিপদে ফেলার জন্যে অন্যের নম্বর দেওয়া আমরা আকছার দেখেছি। আমরা দেখেছি আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা কিনা প্রথম প্রথম নিজের মা বাবাকে কেয়ার করলেও পরে আর খোঁজ রাখেন না। এমনকী অপারেশনের খরচ দেওয়ার ভয়ে পালিয়ে বেড়ান। আমরা দেখেছি আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা মাকে কোনও বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে বা হাসপাতালে ফেলে রেখে একটু আসছি বলে পালিয়ে যান। না, আর কোনও খোঁজ খবর পাওয়া যায় না।

আসলে মানুষ খুব স্বার্থপর। আজকের দিনে মানুষ স্বার্থ শেষ হলেই সম্পর্ক শেষ করে দেয়। দেখা গেছে এই স্বার্থ অনেকটাই অর্থনৈতিক কারণে গড়ে উঠে। মানে আপনার যদি পর্যাপ্ত অর্থ থাকে তবে আপনি শেষ বেলায় সেবা যত্ন পাবেন, নইলে নয়। আপনার অর্থ থাকলেই তবেই আপনার সেবা হবে। উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে অর্থপ্রাপ্তি। আমরা অবাক হই আমাদের বিবেক কোথায় হারিয়ে গেছে! আমাদের সুস্থ বোধ অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। আমাদের মধ্যে থেকে মানবিকতা অনেক আগেই উধাও হয়ে গেছে। আমরা সবাই জানি আমরা কেউ টাকা পয়সা সম্পত্তি নিয়ে চলে যেতে পারব না। তাও আমরা চেষ্টা করে চলি অনবরত। আমাদের লোভ-লালসা এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে আমরা তার থেকে কিছুতেই বের হতে পারি না। শেষ জীবন অবধি আমাদের লোভ আমাদের পিছু ছাড়ে না। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা আমাদের এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়েছে।

আমরা অর্থকে জীবনের সব কিছু ধরে নিই। আর সেটাই হয় কাল। আমরা আমাদের উপযুক্ত অবস্থা থাকা সত্ত্বেও আমাদের বাবা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিই। আমরা তাদের মানসিক পরিস্থিতি কখনই জানতে পারি না। জানার চেষ্টা করি কি? আসলে আমাদের মধ্যে একটা অস্থির হিংস্র প্রবৃত্তি কাজ করে। আর সন্তান যদি বাইরে থাকে তবে তো কোনও ছুতোর অভাব থাকে না। এখনকার মনোভাবে আমরা এটাও শুনেছি যে  বাবা-মায়েরাও ঠিকমতো অ্যাডজাস্ট করতে পারেন না। তাই বৃদ্ধাশ্রমে। আবার অনেকেই ছেলে ছেলের বউকে স্পেস দিয়ে স্বেচ্ছায় বৃদ্ধাশ্রমে। তবে কারণ যাই থাকুক না কেন আমরা এটা বলতেই পারি যে এই পরিবেশ যতই ভাল থাকুক না কেন একটা আপনজনের অভাব ঠিকই দেখা যায়। বৃদ্ধাশ্রমে যতই ভাল পরিবেশ পাই না কেন তা কখনও ঘরোয়া পরিবেশ হতে পারে না।

অনেক আশা, প্রত্যাশা, ভাব-ভালোবাসায় আমাদের জীবন গড়ে উঠে। আমরা এক জীবনে অনেক কিছু পেতে চাই। আমরা একটা সুস্থ জীবন সবাই চাই। আমরা ভাল পরিবেশে ঘরোয়া আঙ্গিকে আমরা বাঁচতে চাই। তবে আমার তা পাই না। আমরা ঘরের বউদের কথা বলি। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তাদের দোষ দেওয়াটাও ঠিক নয়। আমরা গৃহের পরিবেশকে শান্ত রাখার জন্যে অনেক সময় অনেক ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজকে মেনে নিই বা নিতে বাধ্য হই। কিন্তু আমরা কি এটা বলতে পারি না যে এদিন আবার আমার হবে না!  ঠিক এই ভাবনাটা আসে আমাদের জীবনের শেষ সময়ে। আমরা দেখি যে আমাদের সচেতন সময়ে আমরা তেমন কিছু ভাবিই না। আমদের ভাবনা আমাদের পরবর্তী জীবন শেষ সময়ে চলে আসে। অথচ তখন আর কিছু করার থাকে না। তবে এটা মানতেই হবে যে আপনার কর্মফল আপনাকে এই জন্মেই পেয়ে যেতে হবে। তাই সঠিক সময়ে সঠিক ভাবনার সময় এসেছে।