রন্তিদেব সেনগুপ্ত: এই লেখাটি যখন লিখছি তার ঠিক আগের দিন, গত শনিবার, নদিয়ার কৃষ্ণনগরে এক বুথ লেভেল অফিসার ( বিএলও) আত্মঘাতী হয়েছেন। তার সুইসাইড নোটে তিনি লিখে গিয়েছেন, ‘‘আমি কোনও রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করি না। খুবই সাধারণ মানুষ। কিন্তু এই অমানুষিক কাজের চাপ আমি নিতে পারছি না।… বিএলও কাজ তুলতে না পারলে কোনও প্রশাসনিক চাপ এলে তা আমার পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়।’’ এই সুইসাইড নোটটিই বলে দিচ্ছে কী অস্বাভাবিক আতঙ্ক গ্রাস করেছিল এই বিএলও-কে। শনিবারের এই মৃত্যুর ঘটনাটি ধরলে এসআইআর শুরু হওয়ার পর থেকে এই রাজ্যে এসআইআর-জনিত আতঙ্কে মৃত্যুর সংখ্যা তিরিশ ছাড়িয়েছে।
এদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মঘাতী হয়েছেন। কেউ কেউ নিজেদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন। শুধু এই রাজ্যে নয়। রাজস্থান, কেরল, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্য থেকেও কাজের চাপ সামলাতে না পেরের বিএলও-দের মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন ওঠা খুব জরুরি এবং সঙ্গত– এতজন সহনাগরিকের মৃত্যুর দায় কে নেবেন? কার নেওয়া উচিত? কার অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের ফলে এতগুলি মানুষের প্রাণ চলে গেল? কাদের রাজনৈতিক লিপ্সা এতগুলি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিল? এই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় দেশের নির্বাচন কমিশন, বিশেষ করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের।
এর উত্তর দেওয়ার দায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপি নেতাদের, যারা প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্তে এসআইআর-এর নামে এই পরিকল্পনাহীন অমানবিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করছেন। সেই কর্মকাণ্ডের হয়ে সাফাই গাইছেন। এবং যাদের রাজনৈতিক বাসনা চরিতার্থ করতে কার্যত এই অমানবিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে নির্বাচন কমিশন। গত এক মাসে এসআইআর-এর কারণে আমাদের এতজন সহনাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন, শুধু এই বাংলাতেই যার সংখ্যা তিরিশ ছাড়িয়েছে, সেই সব মৃত্যু সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন কমিশনার সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। সামান্য শোকপ্রকাশ করার প্রয়োজনও তাঁরা দেখাননি। নিশ্চুপ দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁদের দলের নেতারা ব্যঙ্গ করে বলছেন, ‘রোগের নাম আত্মহত্যা’। প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দলের নেতারা দেশের মানুষকে কী চোখে দেখেন এইসব আচরণ এবং মন্তব্যে তা-ও পরিষ্কার। ফলে এ প্রশ্নও কিন্তু উঠবে, এত অমানবিক শাসক এই দেশ এর আগে আর কখনও দেখেছে কি? উত্তর একটিই, না।
এর আগে সত্যিই এত অমানবিক শাসক এই দেশ আর দেখেনি। গত ১১ বছরের ঘটনা পরম্পরা বিচার করলেই তা বোঝা যাবে। ভাবুন নোটবন্দির ঘটনা। রাতারাতি প্রধানমন্ত্রী নোটবন্দির ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। নোটবন্দির ঘোষণা করে আত্মতৃপ্ত প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, এর ফলে দেশের কালো টাকা বাজেয়াপ্ত করা যাবে। সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বন্ধ করাও সহজ হবে। উল্লসিত বিজেপি নেতারা হাততালি দিয়ে সেদিন প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কার্যত কী হল? নোটবন্দির ঘোষণার পর আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ ব্যাঙ্কে লাইন লাগালো। লাইনে দাঁড়ানো ওই আতঙ্কিত মানুষগুলির মধ্যে অনেকেই অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন। অনেক ছোট-মাঝারি ব্যবসায়ীর ব্যবসা চিরকালের জন্য চৌপাট হয়ে গেল। কিন্তু কালো টাকা উদ্ধার হল না। ব্যাঙ্কে কয়েক লক্ষ কোটি টাকা মেরে কয়েকজন শাসক দল ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি-ব্যবসায়ী বিদেশে পালিয়ে গেলেন। শাসক দলের ঘনিষ্ঠ শিল্পগোষ্ঠীদের কুড়ি-পঁচিশ হাজার কোটি টাকার ব্যঙ্কঋণ মকুব করে দেওয়া হল। সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করা গেল না। সন্ত্রাসবাদীরা এই সেদিনও খোদ দিল্লির বুকে হামলা চালিয়ে গেল। সেদিনও, ওই নোটবন্দির সময়ও প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে মৃত মানুষগুলির জন্য সামান্য সহানুভূতিসূচক বাক্যও আমরা শুনিনি। যা শুনেছি, তা হল, বিজেপি নেতাদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ।
আসি কোভিড কালের লকডাউনের কথায়। রাতারাতি লকডাউন ঘোষণা করে দিয়েছিল সরকার। কিন্তু লকডাউন ঘোষণার সময় একবারও তারা ভাবেননি বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকের দল, প্রান্তিক গরিব মানুষ এই লকডাউনের দিনগুলিতে কাজকর্ম হারিয়ে দিন গুজরান করবেন কী করে? কোনও বিকল্প ভাবনা এদের জন্য কেন্দ্র সরকারের ছিল না। লকডাউনে কাজকর্ম হারিয়ে আতঙ্কিত পরিযায়ী শ্রমিকের দল নিজের নিজের রাজ্যে ফিরে আসার সময় ট্রেন লাইনে কাটা পড়ে মারা গিয়েছিলেন। সেই ভয়াবহতা দেখে শিহরিত হয়েছিলাম আমরা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা বিচলিত হননি। প্রধানমন্ত্রী তখন দেশের মানুষকে থালা বাজিয়ে করোনা তাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। লকডাউনের সময়ও বহু ছোট মাঝারি ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত পড়েছিল। প্রান্তিক গরিব মানুষের অর্থের জোগান ছিল না। তাদের জন্য কী পরিকল্পনা ছিল কেন্দ্র সরকারের? কিছুই না। একটি সরকারের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের কী বিষময় ফল হতে পারে সেদিনও দেখেছিলাম আমরা।
এবার আসুন এনআরসি প্রসঙ্গে। অনুপ্রবেশকারী বিতাড়নের ধুয়ো তুলে এনআরসি চালু করেছিল কেন্দ্র সরকার। এর ফল সব থেকে বেশি ভুগতে হয়েছিল অসমকে। সেই সময়ও এই এনআরসি আতঙ্কে বেশ কিছু বৈধ ভারতীয় নাগরিক হয় আত্মঘাতী হয়েছিলেন, নয়তো অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিলেন। অসমে ডিটেনশন ক্যাম্প চালু হয়েছিল। সেই ডিটেনশন ক্যাম্পে এখনও ১২ লক্ষেরও বেশি মানুষ আটকে রয়েছেন। তাদের মধ্যে আবার গরিষ্ঠাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের। এমন বহু পরিবারও আছে অসমে, যে সব পরিবারের কিছু কিছু সদস্য ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক, আবার কয়েকজন বাইরেই রয়েছেন। সরকারের এই খামখেয়ালি আজগুবি কর্মকাণ্ডের ফলে অসমের বহু মানুষ এখনও এনআরসি আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র তার নাগরিককে নিরাপত্তা দেবে, তার জীবন-জীবিকাকে সুরক্ষিত রাখবে, তার গণতান্ত্রিক এবং সংবিধান স্বীকৃত অধিকারসমূহকে মর্যাদা দেবে— এটাই আমরা এতদিন জেনে এসেছি। স্বাধীনতার পর এই দেশ যে সংবিধানটি পেয়েছিল, সেটিও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের এই ভাবনাকে মাথায় রেখেই রচিত হয়েছিল। এর আগে যাঁরা দিল্লির শাসন ক্ষমতায় এসেছিলেন, তাঁরা সকলেই মোটামুটি এই ভাবনাটিকেই মাথায় রেখেছিলে। কিন্তু গত ১১ বছরে বর্তমান যে শাসক দল তারা এই ভাবনাটিকেই ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। দেশের নাগরিককে নিরাপত্তা এবং আশ্বাস দেওয়ার বদলে তাকে আশঙ্কা এবং অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার নিরাপত্তা নিয়ে মর্জিমাফিক ছিনিমিনি খেলছে।
এবার আসুন এসআইআর-এর কথায়। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন যে এর আগে হয়নি এমন তো নয়। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন এর আগেও হয়েছে। তখন একটি দীর্ঘ সময় ধরে এই সংশোধনের কাজ চলেছে। শেষ যে নিবিড় সংশোধনের কাজ হয়েছিল, সেই কাজটি সম্পন্ন করতে দুই বছর সময় লেগেছিল। তখন কোনও নাগরিককে আতঙ্কিত করে তোলা হয়নি। কোনও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। কোনও নাগরিককে এনুমারেশন ফর্মও ভর্তি করতে হয়নি। তখন কে ভোটার আর কে ভোটার নয়— তা প্রমাণ করার দায় ছিল কমিশনের। এবারের মতো কমিশন সেই দায় ভোটারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে এমন সব শংসাপত্রের দাবি করেনি, যা দেশের অধিকাংশ দরিদ্র প্রান্তিক গরিব মানুষের কাছে নেই। যে কাজটি সুষ্ঠুভাবে করতে দেড়-দু’বছর সময় লাগার কথা, ভোটের আগে মাত্র ৩ মাসে এই কাজটি সেরে ফেলার এত তাড়া কেন এই কমিশনের— সেটাও স্পষ্ট নয়।
সোজাসাপ্টা ভাষায় বলতে গেলে, এসআইআর-এর নামে যা হচ্ছে, তা শুধু একটি অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড তাই-ই নয়, তা আসলেই খুব পরিকল্পিতভাবে দেশের মানুষের ভোটাধিকারকে খর্ব করে, দেশের গণতান্ত্রিক পরিসরটিকে আরও পঙ্গু করে দেওয়ার চক্রান্ত। এবং এই চক্রান্তটা শুরু হয়েছে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই। একটু ভাল করে ভেবে দেখলেই বুঝবেন, গত ১১ বছরে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এই দেশের সংবিধান স্বীকৃত প্রতিটি স্বাধীন সংস্থাকে হয় বিলোপ করেছে, না হলে কার্যত সেখানে নিজেদের মনোনীত ব্যক্তিদের বসিয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই, এইসব সংস্থাগুলির স্বাধীনতা খর্ব করা। বাদ যায়নি নির্বাচন কমিশনও। এর আগে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বেছে নেওয়ার কমিটিতে থাকতেন তিন জন— প্রধানমন্ত্রী, দেশের প্রধান বিচারপতি এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা। নরেন্দ্র মোদি, বিজেপির প্রধানমন্ত্রী (ইচ্ছে করেই দেশের প্রধানমন্ত্রী বললাম না) এই আইনটাই বদলে দিলেন। বদলে দেওয়ার ফলে যা হল এখন এই কমিটিতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত মন্ত্রিসভার এক সদস্য। হিসেবটা সোজা। প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মনোনীত ব্যক্তিই ঠিক করবেন কে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদে বসবেন। এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আপত্তিও গ্রাহ্য করলেন না নরেন্দ্র মোদি। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের চেয়ারে বসলেন জ্ঞানেশ কুমার। এবং তাঁর আমলেই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগসাজশে ভোটচুরির অভিযোগ উঠল এই দেশে, এই প্রথমবার। লক্ষণীয়, সেই অভিযোগের জবাব দিতে নির্বাচন কমিশনের আগে আসরে নেমে পড়লেন বিজেপি নেতারা। ডালের মধ্যে সত্যিই যে কিছু কালো আছে তা বুঝতে কারও অসুবিধা হল না।
বিজেপি এবং আরএসএস ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পরই অনুপ্রবেশকারী এবং রোহিঙ্গা নিয়ে একটি প্রচারের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়িয়েছে। এই প্রচারের মূল লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গ। যদিও ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা একটি এফিডেভিটে এই কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, এই দেশে অনুপ্রবেশকারীর সঠিক সংখ্যা কত তাদের জানা নেই। তবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা সারা দেশে চল্লিশ হাজারের কিছু বেশি। পশ্চিমবঙ্গে সেই সংখ্যা একশো দুই। লক্ষ্য করবেন, এবার যখন জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে এসআইআর শুরু হল, তখন আওয়াজ তুলে দেওয়া হল অনুপ্রবেশকারী এবং রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়াই নাকি এর মূল উদ্দেশ্য। মজার ব্যাপার হল, বিহারে যে বিপুল সংখ্যক মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে ছেঁটে দেওয়া হল, এদের মধ্যে কতজন অনুপ্রবেশকারী আর কতজনই বা রোহিঙ্গা— তা কিন্তু জানাতে পারেনি কমিশন।
উদ্দেশ্যটা আসলে ভোটার তালিকা সংশোধন নয়। উদ্দেশ্যটা নিজেদের মনোমত একটি ভোটার তালিকা বানানো। যে ভোটারদের বেছে নেবে শাসক দল নিজেই। দেশের সব শ্রেণির সব ধর্মের সব বর্ণের মানুষকে যে ভোটাধিকার দিয়েছিল সংবিধান, সেই অধিকারটিকে হরণ করে একটি স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভারতকে নিয়ে যাওয়া। এই সত্যটি যদি না বুঝি আমরা, ভারতীয় নাগরিকরা, তা হলে স্বাধীনতা সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যে গণতান্ত্রিক ভারতকে আমরা লাভ করেছিলাম, অচিরেই সেই ভারতের সলিল সমাধি ঘটবে।
এই পর্যন্ত এই বাংলায় আমাদের ৩০ জনের বেশি সহনাগরিক মৃত্যুবরণ করেছেন। এঁদের মধ্যে অনেকেই আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। এই আত্মহননের ঘটনাগুলি নিছক মৃত্যু নয়। এগুলিও আসলে প্রতিবাদ। রাষ্ট্রের অমানবিকতার বিরুদ্ধে নিজের প্রাণের বিনিময়ে জানিয়ে যাওয়া নীরব প্রতিবাদ।





