শিক্ষকদের কড়া হুঁশিয়ারি কলকাতা পুরসভার, জনগণনার কাজ না করলে জেল-জরিমানার শাস্তি
স্কুলশিক্ষকদের চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে নজিরবিহীন চিঠি কলকাতা পুরসভার
Truth of Bengal: কলকাতা পুরসভার (KMC) এক নজিরবিহীন ও চরম হুঁশিয়ারিতে এবার তোলপাড় রাজ্যের শিক্ষামহল! ভোটার তালিকার সংশোধন থেকে শুরু করে বিধানসভা নির্বাচনের গুরুদায়িত্ব সামলানোর পর, এবার রাজ্যের স্কুলশিক্ষকদের ঘাড়ে জোরপূর্বক চাপানো হচ্ছে জনগণনা বা সেনসাস (Census)-এর কাজ। আর এই কাজ করতে অস্বীকার করলেই জুটবে আর্থিক জরিমানা কিংবা সোজা ৩ বছরের জেল! বুধবার কলকাতা পুরসভার জনগণনা বিভাগের তরফে জেলা স্কুল পরিদর্শকের (DI) কাছে এই সংক্রান্ত একটি কড়া চিঠি পাঠানো হতেই রাজ্য জুড়ে সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলির অন্দরে চরম ক্ষোভ ও আশঙ্কার কালো মেঘ ঘনিয়েছে।
গত নভেম্বর মাস থেকে একটানা চার মাস ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের কাজ করতে হয়েছে স্কুলশিক্ষকদের। এরপর বিধানসভা নির্বাচনে বিএলও (BLO) হিসেবে বাড়ি বাড়ি ভোটার স্লিপ পৌঁছানো থেকে শুরু করে বুথের ডিউটি, সবই সামলেছেন তাঁরা। সেই ধকল কাটতে না কাটতেই এবার শিক্ষকদের বাধ্যতামূলকভাবে নামতে হচ্ছে জনগণনার কাজে। কলকাতা পুরসভার চিঠি অনুযায়ী, সেনসাসের দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকার করা একটি বড় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেনসাস অ্যাক্ট অনুযায়ী, এর জন্য সর্বোচ্চ ১,০০০ টাকা জরিমানা এবং দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। চিঠিতে জেলা স্কুল পরিদর্শককে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তিনি যেন অবিলম্বে নির্দেশিকা জারি করে সমস্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের এই কড়া আইনের কথা জানিয়ে দেন।
আগস্টে পরীক্ষা আর সেপ্টেম্বরে উচ্চমাধ্যমিকের সেমেস্টার, স্কুল বন্ধের আশঙ্কায় প্রধান শিক্ষকেরা
এই সরকারি নির্দেশের জেরে স্কুলগুলির পঠনপাঠন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ লাটে ওঠার জোগাড় হয়েছে। অভিযোগ, বহু স্কুল থেকে অর্ধেকের বেশি শিক্ষক-শিক্ষিকাকে এই জনগণনার কাজে তুলে নেওয়া হচ্ছে। অথচ, আগামী আগস্ট মাস থেকেই স্কুলগুলিতে শুরু হতে চলেছে দ্বিতীয় পর্বের পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন বা পরীক্ষা এবং সেপ্টেম্বর মাসেই রয়েছে উচ্চ মাধ্যমিকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় সেমেস্টার। এই আবহে শিক্ষকের অভাবে কীভাবে স্কুল চলবে, তা ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছেন না প্রধান শিক্ষকেরা। বহু স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের এই ডিউটি থেকে অব্যাহতি চেয়ে চিঠি দিলেও, পুরসভার এই জেলের হুঁশিয়ারি তাঁদের মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছে।
“শিক্ষার অধিকার খর্ব হচ্ছে”, বেকারদের নিয়োগ না করে শিক্ষকদের বলির পাঁঠা বানানোর প্রতিবাদ
পুরসভার এই স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন। শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক কিঙ্কর অধিকারী ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “বারবার শিক্ষকদের এভাবে অশিক্ষক কাজে যুক্ত করা হলে শিক্ষার অধিকার খর্ব হয়। রাজ্যে এত শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী বসে রয়েছেন, তাঁদের এই কাজে সাময়িক নিয়োগ করতে বাধা কোথায়? অনেক প্রবীণ ও অসুস্থ শিক্ষককে তাঁদের বাড়ি থেকে বহু দূরের এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত অমানবিক।”
একই সুরে সেনসাস কর্মী ঐক্য মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল এবং মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির অনিমেষ হালদার বলেন, “বহুদিন নিয়োগ না হওয়ায় এমনিতেই স্কুলে শিক্ষকের আকাল। তার ওপর সবাইকে সেনসাসে পাঠালে সরকার কি চাইছে সরকারি স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাক? পড়াশোনার গুরুত্বকে এভাবে ছোট করে দেখার আমরা তীব্র বিরোধিতা করছি।” এই হুঁশিয়ারির পর শিক্ষক সমাজ ও পুরসভার সংঘাত কোন পর্যায়ে পৌঁছায়, এখন সেটাই দেখার।






