খেলা

ম্যাচ শেষ হতেই তল্পিতল্পা গোটানোর নির্দেশ! বিশ্বকাপের মাঝেই ইরান দলের সঙ্গে এ কেমন ব্যবহার?

এই হঠাৎ সিদ্ধান্তে পুরো দল বিস্মিত হয়ে পড়ে, আর শুরু হয় নতুন এক চাপের অধ্যায়।

Truth of Bengal: নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ২-২ গোলে লড়াকু ড্র দিয়ে বিশ্বকাপের গ্রুপ জি অভিযান শুরু করেছিল ইরান। মাঠের ভেতরে তারা লড়াই করেছে সমান তালে, কিন্তু মাঠের বাইরে তাদের গল্পটা হয়ে উঠেছে বিশৃঙ্খলা, অনিশ্চয়তা আর ক্লান্তির এক দীর্ঘ যাত্রা। ম্যাচ শেষের পরপরই যা ঘটল, তা ফুটবলের স্বাভাবিক নিয়মকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। ম্যাচ শেষ হতেই ইরানকে জানিয়ে দেওয়া হয়, তাদের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সঙ্গে সঙ্গে মেক্সিকোর তিজুয়ানায় ফিরে যেতে হবে। কোনও বিশ্রাম নয়, কোনও পুনরুদ্ধারের সময় নয়, এমনকি ম্যাচ-পরবর্তী স্বাভাবিক প্রস্তুতির সুযোগও নয়। এই হঠাৎ সিদ্ধান্তে পুরো দল বিস্মিত হয়ে পড়ে, আর শুরু হয় নতুন এক চাপের অধ্যায়।

ইরান কোচ আমির ঘালেনোয়ি এই পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, ম্যাচের পর খেলোয়াড়দের শরীর ও মনকে পুনরুদ্ধারের জন্য যে সময় প্রয়োজন, সেটি না দিয়ে বারবার ভ্রমণে পাঠানো হচ্ছে, যা দলের প্রস্তুতিকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি আরও কঠোর ভাষায় ইরান দলকে ‘বিশ্বকাপের সবচেয়ে নিপীড়িত দল’ হিসাবে বর্ণনা করেন, যেখানে খেলাটার চেয়ে ভোগান্তিই বেশি হয়ে উঠেছে। অধিনায়ক মেহদি তারেমিও পরিস্থিতি নিয়ে ফিফার হস্তক্ষেপ দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, বিষয়টি আর সাধারণ টুর্নামেন্ট ব্যবস্থাপনার মধ্যে নেই, বরং একের পর এক জটিলতার কারণে দলটি স্বাভাবিকভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারছে না। তিনি জানান, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে এসে তাঁদের মানসিকভাবে সমর্থন দিয়েছেন, তবে তাঁর মতে শুধু সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন বাস্তব ও কার্যকর সমাধান।

ইরানের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু থেকেই ছিল জটিলতার ভেতর দিয়ে। মূল পরিকল্পনায় তাদের ক্যাম্প হওয়ার কথা ছিল অ্যারিজোনার টুসনে, কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সেটি পরিবর্তন করে তাদের ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়া হয় মেক্সিকোর তিজুয়ানায়। অথচ গ্রুপ জি’তে তাদের সব ম্যাচই অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে, যা তাদের জন্য তৈরি করছে এক অদ্ভুত ভ্রমণ-চাপের চক্র। লস অ্যাঞ্জেলেসের ইনগলউড স্টেডিয়ামে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ খেলার পর তাদের আবার যেতে হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন শহরে। একই ভেন্যুতে ২১ জুন তারা মুখোমুখি হবে বেলজিয়ামের বিপক্ষে, আর শেষ গ্রুপ ম্যাচ হবে সিয়াটলের লুমেন ফিল্ডে। এই দীর্ঘ ভৌগোলিক ব্যবধান প্রতিটি ম্যাচের আগে তাদের জন্য তৈরি করছে ক্লান্তিকর বিমানযাত্রা ও সীমিত প্রস্তুতির বাস্তবতা। ম্যাচ শেষে হঠাৎ দেশ ছাড়ার নির্দেশে খেলোয়াড়দের মধ্যে তৈরি হয় হতবাক পরিস্থিতি। দীর্ঘ সময় আকাশপথে ভ্রমণ, অল্প বিশ্রাম এবং একের পর এক শহর পরিবর্তন তাদের শরীর ও মানসিক অবস্থাকে ক্রমাগত চাপে ফেলছে। দলের ভেতরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের স্থায়ী অস্থিরতা, যেখানে স্বাভাবিক প্রস্তুতির সুযোগই হয়ে উঠছে বিরল।

তারেমি স্পষ্টভাবেই বলেন, বিশ্রাম ছাড়া কোনও খেলোয়াড়ই সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স দিতে পারে না। অথচ ইরানকে বারবার এমন অবস্থায় ফেলা হচ্ছে, যেখানে প্রস্তুতির মৌলিক শর্তগুলিই অনুপস্থিত। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু কঠিন নয়, বরং পুরোপুরি বিশৃঙ্খল। যদিও যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন নিরাপত্তা, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের কারণে এই কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে ব্যাখ্যা দিয়েছে, বাস্তব চিত্র হল— ইরান এখন এমন এক বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে, যেখানে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি প্রতিদিন তাদের লড়তে হচ্ছে ভ্রমণ, অনিশ্চয়তা আর ক্লান্তির সঙ্গে। সব মিলিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, বিশ্বকাপের এই আসরে ইরানের জন্য সমান সুযোগের ধারণাটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। মাঠে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে প্রতিপক্ষের সঙ্গে, কিন্তু মাঠের বাইরে লড়াই করতে হচ্ছে এক অদৃশ্য ব্যবস্থার সঙ্গে, যেখানে বিশ্রামও যেন হয়ে উঠেছে একটি বিলাসিতা।