শহিদ বেদিতে মাল্যদানই শেষ কথা নয়: মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় নতুন শপথের দিন
সত্যি কথা বলতে, ভাষার মর্যাদা দিতে হয় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে।
সুপ্রভাত লাহিড়ি:
‘মোদের গরব, মোদের আশা,
আ’মরি বাংলা ভাষা’
২১ শে ফেব্রুয়ারি, আমাদের পড়শি একটি ছোট্ট দেশের স্বাধীনতার লড়াই, জাতীয়তার লড়াই, মাতৃভাষার লড়াই এক হয়ে গিয়েছিল। উন্নীত জাতীয় ভাষায় উন্নতি হয় জাতির। বাংলা দেশ মাতৃভাষাকে সামনে রেখে স্বাধীনতাকে কেড়ে নিতে পেরেছিল। ভারত বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতির এক মিলনমেলা, এটা সুখশ্রাব্য হলেও আজ যে বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রকট প্রকাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে আঞ্চলিক ভাষার অযত্নে লালিত হওয়া, যথাযোগ্য মর্যাদা না পাওয়া। সত্যি কথা বলতে, ভাষার মর্যাদা দিতে হয় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে।
ওপার বাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম বিস্ফোরণ বাহান্ন’র একুশে ফেব্রুয়ারি। মাতৃভাষাকে যারা বুকের রক্ত দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন সেই রফিক, জব্বর, সালাম, বরকতদের উত্তরসূরি আমরা এপার বাংলায়। কারণ, একুশের শহিদদের মায়ের মুখের ভাষার সঙ্গে হুবহু মিলে যায় আমাদের মাতৃভাষাও। তাই তো পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা, ঢাকা, খুলনা, ময়মনসিংহর ভাষা সচেতন মানুষ ২১ শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে পালন করেন অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে, নানান উৎসব, অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। শুধুমাত্র শহিদ বেদিতে মাল্যদানই নয়, এই দিনটি ভাষাপ্রেমীদের শপথ নেওয়ার দিনও।
যথাযোগ্য মর্যাদা সহকারে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এই দিনটি পালিত হয় ওপার বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে। শহিদ বেদিতে মাল্যদান, বর্ণাঢ্য মিছিল, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারী…’ গানের মধ্য দিয়ে মানুষ এই দিনটিকে স্মরণ করে। পেট্রাপোল সীমান্ত এদিন দুই দেশের মহামিলনের রূপ নেয়।
এদিন আবার মনে করিয়ে দেয় বরাক উপত্যকায় ভাষা আন্দোলনের শহিদদের কথা। ১৯শে মে, ১৯৬১, এক বিশাল মিছিল যখন বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন শিলচর রেল স্টেশনে, তখন পুলিশ প্রথমে টিয়ার গ্যাস ছোড়ে এবং তার পর পরই নির্বিচারে গুলি ছুড়তে থাকে। একে একে লুটিয়ে পড়েন কমলা ভট্টাচার্য (বাংলা ভাষার জন্য প্রথম মহিলা শহিদ), কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, সত্যেন্দ্র দেব, শচীন্দ্র পাল, হিতেশ বিশ্বাস, সুকুমার পুরকায়স্থ, তরণী দেবনাথ, কুমুদ রঞ্জন দাস, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুনীল সরকার… এই এগারো জনের জীবনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলা ভাষার অধিকার। আবার, ১৯৯৬ সালের ১৬ মার্চ, অসমের করিমগঞ্জে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভাষা স্বীকৃতির দাবিতে আরও একজন শহিদ হন। তিনি হলেন সুদেষ্ণা সিংহ… মাতৃভাষার জন্য ২য় মহিলা শহিদ!
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সমস্ত বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থলের পুরানো ক্ষত খুঁচিয়ে দিল… চিবুক হল আরও সুদৃঢ়। দায়িত্ব আমাদের। আবার শপথ নেওয়ার পালা।






