সম্পাদকীয়

সভ্যতা ও সংস্কৃতির বাতিঘর গ্রন্থাগার

এই গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত বিভিন্ন বই ও তথ্যাদি মানুষকে অগ্রগতির পথ দেখায়।

সুকান্ত পাল: মানব সভ্যতায় শিক্ষা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে গ্রন্থাগার বা পাঠাগারের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীনকাল থেকেই এই গ্রন্থাগার প্রতিটি সভ্যতার ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক বাহক হয়ে এক অপরিসীম দায়িত্ব পালন করে এসেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির উৎকর্ষতা বৃদ্ধি এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার জন্য সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠাগার বা গ্রন্থাগারের যেমন গুরুত্ব আছে, তেমনই প্রতিষ্ঠানের বাইরে বৃহত্তর সামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ‘পাবলিক লাইব্রেরি’ বা সাধারণ গ্রন্থাগার শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশে এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই কারণেই গ্রন্থাগারকে বলা হয় জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়। একটি জাতির অর্জিত জ্ঞান-সম্পদ, তার ইতিহাস, সংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমূহ ধারণ ও সংরক্ষণ করে পরবর্তী প্রজন্মকে পথ দেখায় এ গ্রন্থাগারের রক্ষিত অমূল্য সম্পদ সমূহ।

এই গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত বিভিন্ন বই ও তথ্যাদি মানুষকে অগ্রগতির পথ দেখায়। গ্রন্থাগারের রক্ষিত বই পাঠ করে মানুষ তার জ্ঞানের চাহিদা,  মনের তৃপ্তি এবং চেতনার বিকাশ ঘটায়। এই কারণেই প্রমথ চৌধুরী একসময় বলেছিলেন যে, হাসপাতাল যেমন মানুষের দেহের সুস্থতা প্রদান করে তেমনই গ্রন্থাগার মানুষের মনের সুস্থতা ও জ্ঞানের তৃপ্তি ঘটায়। জ্ঞান চর্চা বা জ্ঞানার্জনের জন্য প্রধান বস্তুটি হল বই। আর বই থাকে গ্রন্থাগারে। তাই বলা যায় জ্ঞানচর্চায় এবং জ্ঞানার্জনের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান হল এই গ্রন্থাগার। সে দিক থেকে গ্রন্থাগার একধারে সভ্যতার ও সংস্কৃতির ধারক এবং অন্য দিক থেকে সেই সভ্যতার ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শকও।

পাঠাগার বা গ্রন্থাগার শব্দটি এসেছে ‘লাইব্রেরি’ থেকে। আবার ‘লাইব্রেরি’ শব্দটি  ল্যাটিন এবং এই শব্দটির অর্থই হল বইয়ের স্থান। আবার বাংলায় গ্রন্থাগার শব্দটিকে ভাঙলে পাই গ্রন্থের আগার। অর্থাৎ বই বা গ্রন্থের সংগ্রহশালা। গ্রন্থাগারের আরেকটি বাংলা শব্দ হল পাঠাগার। অর্থাৎ যেখানে বসে মানুষ পাঠ করে। বিষয়টি কিন্তু একই— জ্ঞান তৃষ্ণা নিবারণের জন্য গ্রন্থাগারের দারস্থ হওয়া। কারণ বইয়ের মধ্যে আমরা সেই আকাঙ্ক্ষিত জগতকে খুঁজে পাই যে জগৎ আমাদের জ্ঞানের রাজ্যে নিয়ে যায়। তাই বই হচ্ছে এক উজ্জ্বলতম আলোর মশাল। বই আমাদের সামনে খুলে দেয় বৃহৎ জগতের রুদ্ধ দ্বার।

অন্ধকার (অজানা) থেকে আলোর (জানা) পথে সে আমাদের যাত্রা করায়। বই আমাদের সামনে খুলে দেয় এক মুক্ত পৃথিবী। একেবারে জ্ঞানের খোলা আকাশের দিকে আমাদের নিয়ে যায়। তাই গ্রন্থাগারের ভূমিকা মানবজীবন এবং সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রসারের ক্ষেত্রে গ্রন্থাগার ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে এসেছে এবং এখনও সে তার সেই পথ থেকে বিচ্যুত হয়নি। সাধারণ মানুষের মধ্যে পাঠাভ্যাস তৈরি করতে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অপরিসীম। একটা সমাজের ক্ষেত্রে গ্রন্থাগার এক বাতিঘর। যে বাতিঘরের আলো মানুষকে, সমাজকে পথ দেখায়, পথ চেনায়।

একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। তা হল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনই কিন্তু যথেষ্ট নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনেক কিছু বাধ্যবাধকতা, নিয়ম-শৃঙ্খলা, সময় ও আইনের অনুশাসনে বাঁধা থাকে। কিন্তু স্বাধীনভাবে এবং সৃজনশীল কাজে গ্রন্থাগার পাঠকের কাছে অনেক সহজভাবে এসে হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। বিচিত্র ধরনের বই পাঠককে যেভাবে সহায়তা দান করে তা কিন্তু কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রের পক্ষে সম্ভব নয়। এর ফলে পাঠক স্বাধীনভাবে তার নিজের রুচি ও পছন্দমতো বই সংগ্রহ করে, পাঠ করে নিজেকে স্বশিক্ষিত করতে পারেন। তাই গ্রন্থাগার সভ্যতার সংস্কৃতির এক দিশারী।

কিন্তু বর্তমান যুগে গ্রন্থাগারের পাঠকের সংখ্যা ভীষণভাবে কমে যাচ্ছে। তার বিভিন্ন কারণও আছে। তবে বেশিরভাগই নেতিবাচক কারণ। এই ছোট নিবন্ধে সে বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনার সুযোগ না থাকলেও দুটি প্রধান কারণ উল্লেখ করে এই নিবন্ধের সমাপ্তি টানব।

প্রথমত, সমগ্র পৃথিবী জুড়ে মানুষের উপর এক প্রবল অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে। যা তাদের ভীষণভাবে দিশাহারা করে তুলেছে। ফলে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম রসদ জোগাতে তার সময় চলে যায়। এর  ফলে অবসর সময় বের করে বই পড়ার সুযোগ তার কাছে থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান ইঁদুর দৌড়ের প্রতিযোগিতায় সফলতার সন্ধান পেতে যুব সমাজ যেমন খেলার মাঠ ভুলেছে তেমনি ইন্টারনেটের সুবিধা থাকায় চট জলদি তার প্রয়োজনীয় ইনফরমেশন সে তার মোবাইলে গুগল, চ্যাটজিপিটি, জেমিনি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে খুব সহজেই পেয়ে যাওয়াতে তারা আর বইয়ের সাহায্য নিচ্ছে না। ফলে বইয়ের সঙ্গে তাদের এক সম্পর্কহীনতার সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাচ্ছে যা একটি সমাজ সভ্যতা ও সংস্কৃতির পক্ষে অত্যন্ত মারাত্মক।

গ্রন্থাগারগুলি পাঠকহীন হওয়ার আরও বহুবিধ কারণ আছে। সেই কারণগুলিকে এখনই যদি দূর করার কোনও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয় তবে সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বাতিঘরকে রক্ষা করা কঠিন হবে।