দু’বার অলিম্পিক জয়ী, জন্মশতবার্ষিকীতে স্মরণে হকির কিংবদন্তী কেশব দত্ত
১৯৪৮ অলিম্পিকে দেশের সোনা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন কেশব দত্ত।
প্রবীর মজুমদার: সাফল্যের বিচারে তিনি ছিলেন শহর কলকাতার অন্যতম সফল ক্রীড়াবিদ। জন্মসূত্রে বাঙালি না হয়েও এই শহরকে ভালোবেসে যিনি নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় শহরে বসবাসের জন্য। যখন তাঁর স্ত্রী এবং সন্তানরা এই শহরের বাস ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি দিয়েছিলেন। দু’টি অলিম্পিক হকি সোনার মালিক কেশব দত্ত জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একাই কাটিয়ে গিয়েছিলেন অজয়নগরের এক আবাসনের ছোট্ট ফ্ল্যাটে । সেখানেই ৯৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয় ২০২১ সালের ৭ই জুলাই।
১৯২৫ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের লাহোরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কেশব দত্ত। সেই হিসাবে এই বছরের ২৯ শে ডিসেম্বর তাঁর জন্মশতবার্ষিকী। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলোর প্রতি দারুণ আগ্রহ ছিল। হকির পাশাপাশি ব্যাডমিন্টন ও অ্যাথলেটিক্স পছন্দ করছেন। পরে অবশ্য হকিকেই বেছে নেন। লাহোরে থাকাকালীনই ভারতীয় দলে সুযোগ পান। ১৯৪৮ অলিম্পিকে দেশের সোনা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন কেশব দত্ত। সেই দলের সেন্টার হাফ ছিলেন কেশব দত্ত। ১৯৫২ হেলসিঙ্কি অলিম্পিকেও সোনাজয়ী ভারতীয় দলের সদস্য ছিলেন। এই অলিম্পিকে তিনি সহ অধিনায়কের দায়িত্বও সামলেছেন। ১৯৫৬ মেলবোর্ন অলিম্পিকে দলে ডাক পেলেও তাঁর কর্মস্থান থেকে ছুটি না পাওয়ায় তৃতীয়বার অলিম্পিক যাওয়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় কেশব দত্ত’র।]
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা ও দেশভাগ রিক্ত করেছে বহু মানুষকে, ছিন্নভিন্ন, রক্তাক্ত করেছে বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশকে। সেই ছিন্নমূল অগণিত মানুষদেরই একজন কেশব দত্ত। প্রিয় শহর লাহোর যখন পরভূমে পরিণত হল, দেশভাগের পর হাজার হাজার পরিবারের মতোই কেশব দত্তের পরিবার শরণার্থী হয়ে স্বাধীন ভারতের বোম্বাই (আজকের মুম্বই) শহরে আশ্রয় পান। সম্পূর্ণ অচেনা জায়গা, অচেনা পরিবেশে শুরু হয় জীবন যুদ্ধ। ভাগ্য অন্বেষণে সেখান থেকে পাড়ি দেন কলকাতায়। কলকাতা মহানগরীকে আপন করে নেন। ১৯৫১ সালে মোহনবাগানে যোগ দেন। তখন থেকেই কলকাতায় থাকতেন। তবে ১৯৫২ সাল থেকে কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। মাঠে দত্ত ছিলেন একজন দুর্দান্ত খেলোয়াড়, যদিও তিনি কখনও খুব বেশি ড্রিবলিং করেননি। তাঁর আদর্শ ছিল খুবই সরল – যদি উইঙ্গারদের ভালোভাবে খাওয়ানো হয়, তাহলে গোল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে। সেই সময়, মোহনবাগান ১০ জন খেলোয়াড় নিয়ে শুরু করত কারণ ব্রিটিশ সংস্থা ব্রুক বন্ডের সাথে কাজ করা কেশব দত্ত তাঁর পেশাদারিত্বের কারণে একটু পরে মাঠে যোগ দিতেন। ১০ বছর মোহনবাগানের হয়ে খেলেছিলেন। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ এবং ১৯৫৭–৫৮ মরশুমে মোহনবাগন হকি দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কেশব দত্ত। মোহনবাগানের জার্সি গায়ে ৬ বার লিগ এবং ৩ বার বেটন কাপ জিতেছিলেন। ২০১৯ সালে ‘মোহনবাগান রত্ন’-এ ভূষিত হয়েছিলেন কেশব দত্ত। ফুটবলের বাইরে তিনিই প্রথম ক্রীড়াবিদ, যিনি এই সম্মান পেয়েছিলেন।
যৌবনের কেশব দত্ত ছিলেন মহিলা ফ্যানদের হার্টথ্রব। সেই সময় তা হয়ে উঠেছিল স্থানীয় ক্রীড়াজগতের রীতিমত আলোচনার বস্তু। সুপুরুষ কেশব শেষে বিয়ে করেছিলেন এক ইউরোপীয় মহিলাকে। সেটা হয়তো তাঁর জীবনে হয়ে উঠেছিল এক মারাত্মক ভুল। তিনি নিজে ছিলেন সম্পূর্ণ ভারতীয় ভাবধারার অনুগামী। পরবর্তীকালে তাঁর স্ত্রী ও পুত্র-কন্যা যখন দেশ ছেড়ে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন তাঁদের সঙ্গে গেলেন না কেশব। একা রয়ে গেলেন কলকাতায়। দীর্ঘায়ু কেশব শেষ কয়েক বছর বড় মানসিক অসুবিধার মধ্যে ছিলেন, সঙ্গীহীন, একাকী। চাকরি ছাড়বার পর বাসস্থান নিয়ে সমস্যায় পড়েছিলেন, শেষ অবধি শহরের এক প্রখ্যাত আইনজীবী তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে অনুরোধ করে শহরের দক্ষিণ প্রান্তে অজয়নগরে একটি ফ্ল্যাট তাঁকে পাইয়ে দেন। শেষ জীবনটা সেখানেই কাটিয়ে গেছেন কেশব। শেষদিকে স্মৃতিভ্রংশ হয়েছিল, শুভানুধ্যায়ীদের কল্যাণে তাঁর দেখাশোনার জন্য একজন সর্বক্ষণের কর্মী ছিলেন। জীবনের অন্তিম সময়ে পরিবারের কেউ তাঁর পাশে ছিলেন না।
এমন এক ব্যক্তিত্ব নিশ্চুপেই পাড়ি দিয়েছিলেন না ফেরার দেশে সাড়ে চার বছর আগের এক বৃষ্টিভেজা দিনে। কোনো আড়ম্বর ছিল না। ছিল না কোনো আলোচনাও। জীবদ্দশাতেই বা কতটুকু সম্মান পেয়েছেন তিনি? অলিম্পিকে ভারতকে দু’বার সোনা এনে দেওয়ার পরও তাঁকে ন্যূনতম কোনো সম্মাননা জানায়নি ভারত সরকার। তবে তা নিয়ে বিন্দুমাত্র ক্ষোভ ছিল না কেশব দত্তের। ছিল না কোনো আকাঙ্ক্ষাও। বরং, ভারত-চিন যুদ্ধের সময় নিজের অলিম্পিকের দুটি স্বর্ণপদকই তিনি দান করে দিয়েছিলেন সেনা ত্রাণে। কলকাতাই বা কতটুকু মনে রেখেছে কিংবদন্তি এই তারকাকে? এই শহরেই তো তিনি কাটিয়েছেন সারাটা জীবন। হয়ে উঠেছিলেন একজন আদ্যপান্ত বাঙালি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্মৃতি আবছা হয়ে যেতে পারে, আমরা অতীতকে জীর্ণ পোশাকের মতো পরিত্যাগ করতে পারি। কিন্তু ইতিহাস কি আমাদের ভোলাতে পারে , যে কেশব ছিলেন এক কিংবদন্তী? অলিম্পিকের আসরে যে সব ম্যাচ তিনি খেলেছেন, তা ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। পরিবর্তে আমরা তাঁকে দিয়েছি অতি সামান্য! যাবার বেলায়, ৯৫ বছরের অসহায় বৃদ্ধকে আমরা, আত্মগর্বিত ক্রীড়াপ্রেমী বাঙালিরা, কি প্রকৃত শ্রদ্ধা দেখাতে পেরেছিলাম? তাঁর শীর্ণ হাতটা চেপে ধরে কি একবারও বলতে পেরেছিলাম, যাচ্ছেন যান, কিন্তু মনে রাখবেন, আমাদের মধ্যে আপনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন, আপনাকে ছাড়া কখনই সম্পূর্ণ হবে না এই শহরের ক্রীড়া ইতিহাস? আমরা কিন্তু ফিরে ফিরে আসব সেই আপনার কাছেই?


