সম্পাদকীয়

টেলিফোনে কি মন ভিজল মতুয়াদের? মোদির সফর তো আসলে হতাশই করল

শনিবারও নরেন্দ্র মোদি এসে বঙ্কিমচন্দ্রের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

সুমন ভট্টাচার্য: আশায় আশায় বসে আছি

ওরে আমার মন

কখন তোমার আসবে টেলিফোন

মতুয়াগড়ের বাঙালিরা, আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে হিন্দু উদ্বাস্তুরা তো ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র এই বিখ্যাত গানের মতো নরেন্দ্র মোদির ফোনের প্রত্যাশায় ছিলেন না। তাঁরা বসেছিলেন কখন ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’ তাঁদের মাঝে এসে নামবেন, তাঁদের নাগরিকত্ব থেকে শুরু করে সমস্ত সমস্যার সমাধান করে দেবেন। কিন্তু হেলিকপ্টার বিভ্রাটে কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যাওয়ায় নরেন্দ্র মোদি আর তাহেরপুরে নামতে পারলেন না। কুয়াশায় কি শুধু তাহেরপুরের হেলিপ্যাড ঢাকা পড়ল? নাকি ২০২৬-এর নির্বাচনে বিজেপির ভাগ্যই ঢাকা পড়ে গেল? যে মতুয়াগড় নিয়ে এত চিন্তা, যে মতুয়াগড়ে একইরকমভাবে হেলিকপ্টার বিভ্রাটে আটকে যাওয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ পর্যন্ত সড়কপথে পৌঁছেছিলেন, সেই বিজেপির দুর্গে শনিবার নরেন্দ্র মোদি যেতে পারলেন না। যাঁরা ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’, ‘বিশ্বগুরু’কে দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁরা শেষ পর্যন্ত দুধের স্বাদ ঘোলে মেটালেন! ঘোলও বলা যাবে কিনা সন্দেহ! এই ঘোল হয়তো মতুয়াদের মাথায় ঢালার ঘোলই, যে ঘোলে বিজেপির ভোটভাগ্যে কতটা চিঁড়ে ভিজবে, তা বলা মুশকিল। নরেন্দ্র মোদির সফর ঘিরে যে তুমুল ‘হাইপ’ বা প্রত্যাশা বিজেপি তৈরি করেছিল, শনিবারের বারবেলায় তা কি একটু মুখ থুবড়ে পড়ল? শমীক ভট্টাচার্য, শুভেন্দু অধিকারীদের মুখ দেখে অন্তত সেরকমই মালুম হচ্ছিল। শুভেন্দু! তাঁর তো শীতের দাপটে আর জেলায় জেলায় ঘুরতে ঘুরতে বোধহয় গলাই ভেঙে গিয়েছে। সেই ভাঙা গলাতে তিনি যতবার চিৎকার করলেন, মতুয়াগড়ে ততটা উল্লাস কি দেখা গেল? তা হলে কি প্রথম রাউন্ডে, অর্থাৎ ২০২৬-এর নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে মতুয়াগড়ে যাওয়ার খেলায় নরেন্দ্র মোদিকে টেক্কা দিয়ে রাখলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?

ভোট আসলে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের বাংলা প্রেম বাড়ে। শনিবারও নরেন্দ্র মোদি এসে বঙ্কিমচন্দ্রের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এদিন অবশ্য সংসদের মতো ‘বঙ্কিম দা’ বলে ‘চায়ে পে চর্চা’-এ বাংলার ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রকে ডাকার সাহস দেখাননি; বরং ফোনে বঙ্কিমবাবু এবং মতুয়াদের বড়মা— এইসব কথা বলে বাঙালির মন জয় করার চেষ্টা করেছেন। নরেন্দ্র মোদি কুশলী রাজনীতিবিদ, এখনও পর্যন্ত বিজেপির সেরা ভোট ক্যাচার, উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে গেলে তিনি ভ্যাটিকানের সঙ্গে নিজের যোগাযোগের কথা বলেন, উত্তরপ্রদেশে গেলে তিনি ‘মর্যাদাপুরুষোত্তম রাম’ হয়ে যান, আর বাংলায় এলে তিনি সোনার বাংলার কথা বলেন।

অবশ্য সোনার বাংলায় এসে বাংলা বলার চেষ্টা করলেও মাঝে মাঝে তিনি পদ্ম বলতে গিয়ে এমন সব শব্দ বলেন, যা বাঙালিকে লজ্জায় ফেলে দেয়। শনিবার অবশ্য তিনি এমনিতেই হয়তো অধোবদন হয়েছিলেন হেলিকপ্টার বিভ্রাটে বিজেপির শক্ত দুর্গ বলে পরিচিত তাহেরপুরে পৌঁছতে না পারার জন্য। শনিবার দিনটা অবশ্য বিজেপির জন্য ভাল ছিল না। মোদির সভায় আসার পথে ট্রেন দুর্ঘটনায় চার জন মারা যান। রেল কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে৷ তাই রাস্তায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বাধা তৈরি করেছে, এরকম অভিযোগ করার সুযোগ বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের নেই। রেলে দুর্ঘটনা থেকে হেলিকপ্টার বিভ্রাট সবই যেন শনিবারের বারবেলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্যের বিজেপিকে তমসায় আচ্ছন্ন করে রাখল। সেই তমসার মাঝে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র মতো নরেন্দ্র মোদির টেলিফোন তাহেরপুরে পৌঁছল বটে, কিন্তু সেই টেলিফোনে সাড়া দেওয়ার জন্য কি সত্যিই মতুয়ারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন? না তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নিজেদের নাগরিকত্বের বিষয়ে স্পষ্ট কোনও সুরাহা চাইছিলেন?

এমনিতে শহুরে বাঙালির ফোন নিয়ে একটা ‘অবসেশন’ আছে। আমাদের প্রজন্মের কত মহিলা বেলা বোস হওয়ার স্বপ্নে কখন আসবে সেই টেলিফোন তার প্রতীক্ষায় ছিল। তারও আগে উত্তম-সুচিত্রার সিনেমায় টেলিফোন নিয়ে অনেক অনেক আবেগ আছে। কিন্তু মতুয়ারা তো নরেন্দ্র মোদির টেলিফোনে বক্তৃতা শোনার অপেক্ষায় ছিলেন না। মোদি যদি বোঝেন, যে ভার্চুয়াল দিয়ে তিনি টাকা ট্রান্সফার করতে পারেন, কিন্তু ভার্চুয়ালি বক্তৃতা দিয়ে মতুয়াগড়ে ভোটারদের প্রভাবিত করাটা মুশকিল। বিশেষ করে যে মতুয়ারা সবচেয়ে সঙ্কটে রয়েছে। এখনও পর্যন্ত রাজ্যে ‘সার’-এর আবহে মতুয়াগড়ে কী হবে সেটা নিয়েই সকলের চিন্তা। কারণ, ‘সার’-এর নিয়মানুযায়ী ২০০২-এর ভোটার লিস্টে যদি নাম না থাকে, তা হলে মতুয়ারা ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়বে। আর সিএএ-তে আবেদন করে অন্তত ২০২৬-এ ভোট দেওয়া যাবে না।

তাহেরপুর থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে বাংলাদেশ সীমান্ত। ওপারের বাংলাদেশে যা ঘটছে, সেই মৌলবাদী তাণ্ডবের সময়ে এপারের উদ্বাস্তু হিন্দুরা হয়তো নরেন্দ্র মোদির কাছে আরও নির্দিষ্ট কিছু শুনতে চেয়েছিলেন। কারণ, তাঁদের বেলা বোসের মতো কোনও প্রেমের প্রতীক্ষা নেই, কিংবা তাঁরা ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র মতো কোনও সুর রিয়ালিস্টিক জগতেও ছিলেন না, যে ঘোর বাস্তবের জগতে তাঁদের ভোটাধিকার, প্যান কার্ড, আধার কার্ড নিয়ে দুশ্চিন্তা, তা মোদির বক্তৃতায় কাটল কোথায়? বরং মতুয়ারা তুলনা করতে শুরু করতেই পারেন, যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো হেলিকপ্টার বিকল হয়ে যাওয়ার পরেও সড়ক পথে এসে তাঁদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগস্থাপন করে তাঁদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আর মোদি তো অন্তরীক্ষ থেকেই হাত নেড়ে দূরাভাষে ‘ভোকাল টনিক’ দিয়ে চলে গেলেন। এই ‘ভোকাল টনিক’ কি শুভেন্দু অধিকারী বা শমীক ভট্টাচার্যদের বিন্দুমাত্র কাজে লাগবে?

২০২৬-এর বিজেপির পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচার বা রণকৌশলে অন্যতম অংশ হচ্ছে ‘সার’। সেই ‘সার’ বা নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশ্যাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ কতটা মতুয়াদের বিপদে ফেলল আর কতটা তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক থেকে তাদের নিশ্চিত ভোট থেকে সরিয়ে নিল, সেই হিসাব এখনও কেউ নিশ্চিত করেই করে উঠতে পারেনি। বিজেপির নীচুতলার যে সংগঠন, তাদের পক্ষে হিসেব করে ফেলাও সম্ভব নয়। এখনও পর্যন্ত খসড়া ভোটার তালিকায় যে সংখ্যক নাম বাদ গিয়েছে, তাতে তৃণমূল যেমন খুব একটা দুশ্চিন্তায় নেই, তেমনই বিজেপির জন্য শঙ্কা বাড়িয়েছে উত্তর ২৪ পরগণার মতুয়াগড়ে প্রায় ৭ লক্ষ ভোট বাদ যাওয়ায়।

এই ৭ লক্ষের মধ্যে কতটা বনগাঁ মহকুমার ৭টি আসনের মধ্যে, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। এবং সেক্ষেত্রে কাদের ক্ষতি বেশি, সেটাও রাজনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা হয়নি। কিন্তু নদিয়াতর শান্তিপুর বা তৎসংলগ্ন অঞ্চলে যথেষ্ট মতুয়া ভোটারদের নাম বাদ গেছে। সেটা অবশ্যই বিজেপির দুর্গে বড় আঘাত। তাই ড্রোন ফুটেজ, সমর্থকদের টি-শার্ট পরে পতাকা নাড়ানো— এই সব দিয়ে কি মতুয়াগড়ে মোদি সেরকম কিছু ঝড় তুলতে পারলেন? এবার অবশ্য এখনও পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা তেমন ডেলি প্যাসেঞ্জারি শুরু করেননি। অনেকেই মনে করছেন, এবার বিজেপির রণকৌশল কিছুটা আলাদা। ততটা শোরগোল না করে তাঁরা ‘সার’-এর মাধ্যমে ভোটব্যাঙ্কে ধস নামিয়ে কেল্লাফতে করতে চান। কিন্তু সেই কেল্লাফতে কি আদৌ হবে? সেই নিয়ে আশা-আশঙ্কার মাঝখানে শনিবার তাহেরপুরে মোদির সভা ভার্চুয়ালে পরিণত হওয়াটা অবশ্যই বিজেপির জন্য, মতুয়া সমর্থকদের জন্য বড় আশাভঙ্গ। যাঁরা সারাদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই টেলিফোনে মোদির বক্তৃতা শুনে খুশি হননি। এর পাল্টা হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার কবে মতুয়াগড়ে পৌঁছে যান, সেই দিকে আমাদের নজর রাখতে হবে।

Related Articles