চন্দ্রমুখীর সাধনা থেকে কালীমন্ত্রের জাগরণ! রাত নামলেই গা ছমছমে অধ্যায়ের কাহিনি জানেন?
Truth Of Bengal: অমাবস্যার রাত। চারদিক নিঝুম। হঠাৎ হাওয়া বইতেই বোলপুর–পালিতপুর রাস্তার ধারে থাকা বঙ্গছত্রের মহাকালী মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি কানে আসে। স্থানীয়দের দাবি—রাত যত গভীর হয়, মন্দির চত্বরে ততই ঘনিয়ে আসে এক অজানা শক্তির উপস্থিতি। তিনশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই গ্রামে চলে আসছে এক তান্ত্রিক প্রথার কালীপুজো (Chandramukhi Kali)—যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রহস্য, ভক্তি আর এক নারীর সাধনার ইতিহাস।
আরও পড়ুনঃ মৃত মৎস্যজীবীর পরিবারের পাশে মন্ত্রী: আর্থিক সাহায্য ও শিক্ষার দায়িত্ব নিল সরকার
গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে ‘উলোসোনা’ পুকুরপাড়েই এই পুজোর সূচনা। কথিত আছে, একসময় গিরিলাল চক্রবর্তীর কন্যা চন্দ্রমুখীদেবী স্বামীর মৃত্যুর পর পিতৃগৃহে ফিরে এসে ব্রতী হন মাতৃসাধনায়। দিনরাত ধ্যান, মন্ত্রোচ্চারণ আর তান্ত্রিক ক্রিয়ায় নিমগ্ন থাকতেন তিনি। গ্রামের প্রবীণরা বলেন, এক অমাবস্যা রাতে চন্দ্রমুখী নাকি দেবীর সাক্ষাৎ পান—তার পর থেকেই শুরু হয় এই মহাকালী আরাধনা।
লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/truthofbengal
আজও সেই পুকুরপাড় ঘিরে আছে ভয় আর ভক্তির অদ্ভুত মিশ্রণ। কেউ কেউ দাবি করেন, পুজোর আগের রাতগুলোয় মন্দির সংলগ্ন বটগাছের তলায় ধূপধুনোর গন্ধ পাওয়া যায়, যদিও তখন মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে। স্থানীয়রা বলেন, “দেবী নাকি নিজেই আসেন পুজোর আয়োজন দেখতে।”
বর্তমান মহাকালী মন্দিরটি বোলপুর –পালিতপুর প্রধান রাস্তায় অবস্থিত। বহু বছর আগে মন্দিরের দায়িত্ব ছিল পাণ্ডা শশিকান্ত মুখোপাধ্যায়ের পরিবারের হাতে। পরে তাঁর ছেলে শ্যামাপদ মুখোপাধ্যায় পুজোর দায়িত্ব তুলে দেন গ্রামবাসীর হাতে, আর সেখান থেকেই এটি রূপ নেয় ‘বঙ্গছত্র সর্বজনীন মহাকালীমাতা পুজো’ হিসাবে। (Chandramukhi Kali)
কমিটির সম্পাদক অমল মণ্ডল বলেন, “আমরা পুজোর ঐতিহ্য আগলে রাখি। এখন পুজো আধুনিক আলোয় মেলে ধরলেও মূল রীতি সেই তান্ত্রিক প্রথাই। পুজো চলে রাত্রির আধঘণ্টার মধ্যেই। ঘট স্থাপন বা বিসর্জনের আগে হয় গোপন মন্ত্রপাঠ—যা শুধুই পাণ্ডা পরিবার জানেন।”
পুজো শেষে পরের দিন হয় দেবীর বিসর্জন। তবে শুধু পুজোই নয়, পুজো ঘিরে চারদিন ধরে চলে সাংস্কৃতিক উৎসব, বাউল সঙ্গীত, কবিগান ও লোকনাট্য। আশেপাশের গ্রাম—নওদা, পালুন্দি, বাসাপাড়া, কুলিয়ার—সব গ্রামের মানুষ অংশ নেন এই উৎসবে। বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু মানুষ এই পুজোর অংশীদার। (Chandramukhi Kali)
কুলিয়ার বাসিন্দা পাঁচু শেখ বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই পুজোতে কাজ করছি। অনুদান তোলা, মঞ্চ সাজানো, আলো লাগানো—সবকিছুই আমরা একসঙ্গে করি। এটা শুধু ধর্ম নয়, আমাদের গ্রামের ঐতিহ্য।”
অমাবস্যার রাত ঘনিয়ে এলে আবার ভিড় জমে মন্দির চত্বরে। আগুনে দীপ, ধূপের ধোঁয়া, শঙ্খধ্বনি আর মন্ত্রপাঠের সুরে এক রহস্যময় আবহে মোড়া থাকে গোটা এলাকা। অনেকের বিশ্বাস, চন্দ্রমুখীর সাধনা আজও বৃথা যায়নি—তিনি নাকি দেবীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছেন এই মন্দিরেই।
ভয়, ভক্তি আর বিশ্বাসের ত্রিবেণীতে মিশে আছে বঙ্গছত্রের এই কালীপুজো। সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে অনেক কিছু, কিন্তু অমাবস্যার রাতে আজও যখন ঢাকের তালে কেঁপে ওঠে বাতাস—গ্রামবাসীদের মনে তখনও ভেসে ওঠে সেই এক নাম—“চন্দ্রমুখী দেবী”। (Chandramukhi Kali)






