সম্পাদকীয়

India-Russia Relations: ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক ছাপিয়ে যাচ্ছে ভারত-সোভিয়েত সম্পর্ককে

সোভিয়েত পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করেই স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা মডেলও।

রাজাগোপাল ধর চক্রবর্ত্তী: স্বাধীনতা লাভের কিছুদিন আগেই ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে ভারত রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে প্রয়োজন ছিল শক্তি ও ইস্পাত উত্পাদন ভিত্তিক ভারী শিল্প। এব্যাপারে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহায়তা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে হয়েছিল। সোভিয়েত পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করেই স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা মডেলও। (India-Russia Relations)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যুদ্ধকালীন জোট ভেঙে যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে কমিউনিজমের মৌলিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পরে এটা ভূ-রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সংগ্রামে রূপ নেয়। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ কোনও না কোনও গোষ্ঠীতে জড়িয়ে যায়। জোট নিরপেক্ষতা ঘোষিত নীতির মধ্যে ভারত ঘেঁষে সোভিয়েত ব্লকে, পাকিস্তান আমেরিকার দিকে। এর ফলও পাওয়া যায়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পশ্চিমী দেশগুলিকে আটকাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন মধ্যস্থতা করে। সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানকে তাসখন্দে (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, বর্তমান উজবেকিস্তান) শান্তি আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানান। ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে তাসখন্দ ঘোষণায় যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং দুই দেশ যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থানে সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে কাশ্মীর ইস্যুতে এবং পর্তুগিজ শাসনের অবসানে ভারতের সমর্থনে সোভিয়েত ইউনিয়ন বেশ কয়েকবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো প্রয়োগ করে। শান্তি প্রক্রিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকায় ভারত এক সত্যিকারের বন্ধু খুঁজে পায়। ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতার চুক্তি স্বাক্ষর করে।(India-Russia Relations)

আরও পড়ুনঃ Horoscope Today: আজকের রাশিফল: সুখ-দুঃখের আগাম বার্তা

ভারত সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি ১৯৭১

১৯৬৯ সালে চিনের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের সঙ্গে বিশ বছরের পারস্পরিক কৌশলগত সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা চুক্তি চুক্তির প্রস্তাব করে। চিন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক করছিল, তাতে ভারতের যথেষ্ট অস্বস্তি ছিল। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিশাল শরণার্থীর প্রবাহ ভারতের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মধ্যে নিয়ে আসে। ন্যাটো যেমন তার গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলিকে বৈদেশিক আক্রমণ থেকে রক্ষা করে, ভারতের প্রয়োজন ছিল এমন শক্তিশালী বৈদেশিক সহায়তার। দেবদূতের মতো এসে হাজির হয় সোভিয়েত আশ্বাস, ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি। ১৯৭১ সালের পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জয়লাভ এবং বাংলাদেশের জন্ম অনেকটাই সম্ভব হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন পাশে থাকায়।

মার্কিন রাষ্ট্রপতি নিক্সন বাংলাদেশ স্বাধীনতা আন্দোলনকে পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসাবে দেখে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন। ভারতকে সম্ভাব্য হুমকি দিতে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস এন্টারপ্রাইজের নেতৃত্বে নৌবাহিনীর টাস্কফোর্স ৭৪ বঙ্গোপসাগরে পাঠায়। মার্কিন নৌবহরের পাশাপাশি লক্ষ্যে ব্রিটিশ বিমানবাহী রণতরী এইচএমএস ঈগল আসে আরব সাগরে ভারতীয় সীমানার কাছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সঙ্গে সঙ্গে ভারত মহাসাগরে পারমাণবিক সশস্ত্র ক্রুজার এবং ডেস্ট্রয়ারের নৌবহর পাঠায়। সোভিয়েত হস্তক্ষেপে আতঙ্কিত এইচএমএস ঈগল এবং ব্রিটিশ নৌবহর আরও দক্ষিণে মাদাগাস্কারের দিকে পালায়। রাষ্ট্রপতি নিক্সনও মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে এই অঞ্চল থেকে সরে আসার নির্দেশ দেন। (India-Russia Relations)

সোভিয়েত পরবর্তী রাশিয়া

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে রাশিয়ান ফেডারেশন সোভিয়েতের উত্তরসূরি হিসাবে উঠে আসতে চায়। তাদের সেই ভাবনা ধরা পড়ে, ১৯৯৩ সালের ভারত ও রাশিয়া বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি আর ১৯৯৪ সালের ভারত ও রাশিয়া সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চুক্তিতে। ২০০০ সালে রাষ্ট্রপতি পুতিনের ভারত সফরের সময় এই সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত হয়েছিল। ২০১০ সালে এই সম্পর্ককে তার সর্বোচ্চ স্তর, বিশেষ এবং সুবিধাপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারিত্বতে নিয়ে যাওয়া হয়।

রাশিয়ার অস্ত্রশস্ত্র

এতকাল সোভিয়েত বা রাশিয়ার অস্ত্র কেবল ভারত কিনতো। গত এক দশকে ভারত সাধারণ ক্রেতা থেকে যৌথ উত্পাদক অথবা লাইসেন্সধারী উত্পাদকের মর্যাদায়। ভারতে এখন রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্রশস্ত্র, যুদ্ধ ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান তৈরি হয় যৌথ অংশীদারিত্বে। ভারতের সীমান্ত আকাশ সুরক্ষিত রয়েছে রাশিয়ার সুরক্ষা ব্যবস্থার ভারতীয় সংস্করণে। ব্রহ্মস এরোস্পেস তৈরি করেছে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র। এটি ভারতের ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ডিআরডিও) এবং রাশিয়ার সংস্থা এনপিও মাশিনোস্ট্রোয়েনিয়ার যৌথ উদ্যোগ। ব্রহ্মস এখন যে কোনও দেশের অস্ত্র ভাণ্ডারের মূল্যবান সংগ্রহ। ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং মধ্যপ্রাচ্য এবং লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশ ব্রহ্মসের জন্য পাগল। ২০২২ সালে ফিলিপাইন উপকূল-ভিত্তিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল সিস্টেমের জন্য ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে।

ভারত-রাশিয়ার আর একটি যৌথ উদ্যোগ, ইন্দো-রাশিয়ান রাইফেলস প্রাইভেট লিমিটেড (আইআরআরপিএল) কালাশনিকভ রাইফেলের উন্নত সংস্করণ, একে-২০৩ তৈরি করছে। আগামী দিনে এটাই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর অত্যাধুনিক রাইফেল। একে-২০৩ এর সঙ্গে সঙ্গে একে-১৯ কারবাইন, পিপিকে-২০ সাব-মেশিনগান উত্পাদনের প্রস্তুতি চলছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য উচ্চ বিস্ফোরক দাহ্য (এইচইআই) গোলাবারুদ উৎপাদন শুরু হতে চলেছে ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড (বিইএল) এবং রসোবোরোন এক্সপোর্ট-এর যৌথ উদ্যোগে।

টি-৯০ ভ্লাদিমির রাশিয়ার প্রধান কার্যকরী যুদ্ধ ট্যাঙ্ক। টি-৯০ ‘ভীষ্ম’ নামে ভারতে লাইসেন্সড উত্পাদন শুরু হয়েছে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান বহরের মেরুদণ্ড, সুখোই এসইউ-৩০এমকেআই (মডার্নাইজিরোভান্নি, কোমারচেস্কি, ইন্ডিস্কি) এখন তৈরি হচ্ছে ভারতের হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড কারখানায়। ইন্দ্র সিরিজ ভারত-রাশিয়া সামরিক মহড়া ভারতকে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে মজবুত রাখছে।

চিন ও পাকিস্তানের হুমকি মোকাবিলায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে ভারতে এসেছে রাশিয়ার এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ভারতীয় সামরিক বাহিনীতে এই সুরক্ষা ব্যবস্থা ‘সুদর্শন চক্র’ নামে পরিচিত। বিগত ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে সুদর্শন চক্র তার দৌরাত্ম্য দেখিয়েছে। আমেরিকা কাউন্টারিং আমেরিকা’স অ্যাডভারসারিজ থ্রু স্যাংশনস অ্যাক্ট প্রয়োগের হুমকি দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আইনে রাশিয়া, ইরান বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য লেনদেনকারী দেশ বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসে।

ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ ও বিমান রাশিয়ার বিধ্বংসী যুদ্ধ জাহাজের সঙ্গে অংশ নেয় এই সময় মাফিক মহড়ায়। সুইডেন ভিত্তিক স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই, সংক্ষেপে শিপরি) তার ২০২৫ সালের রিপোর্টে জানায়, ভারতের অস্ত্র আমদানির সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে রাশিয়া থেকে (৩৬ শতাংশ)। তবে ২০১০-১৪ সালের ৭২ শতাংশ আমদানি থেকে অনেকটাই কম। এক দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকির কারণ, তাই সতর্কতা। শিপরি বলেছে, ২০১৫-১৯ থেকে ২০২০-২৪ সালের মধ্যে ভারতে অস্ত্র আমদানি কমেছে ৯.৩ শতাংশ। নিজস্ব উত্পাদন ক্ষমতা বাড়লে, এটাই হয়।

রাশিয়ান তেল ও জ্বালানি

রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল মিশ্রণ ইউরালস তেল নামে পরিচিত। বিশ্বব্যাপী তেলের বেঞ্চমার্ক, ব্রেন্টের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চ-সালফার যুক্ত, ফলে ইউরালস বিক্রিতে ছাড় না দিলে বিক্রি হয় না। ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হতেই রাশিয়া উল্লেখযোগ্য ছাড় দিতে শুরু করে। ভারতও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে রাশিয়ার তেলে আগ্রহ দেখায়। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের আগে ভারতের মোট আমদানির ২ শতাংশেরও কম আসতো রাশিয়া থেকে, ২০২৪ সালের জুনে সেটা ৪০ শতাংশেরও বেশি গিয়ে দাঁড়ায়। ভারতীয় তেল সংস্থাগুলিও পরিশোধিত রাশিয়ান তেল পণ্য রফতানি করে উপকৃত হয়েছে। পশ্চিমা বাজারেও ভারতের পরিশোধিত তেল বিক্রি হচ্ছে।(India-Russia Relations)

প্রাথমিকভাবে পারমাণবিক পরীক্ষার বিরোধিতা করলেও, আন্তর্জাতিক ছাপ উপেক্ষা করে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের কানাডা নির্মিত চুল্লিগুলির জন্য ভারী জল, তারাপর ফুটন্ত জলের চুল্লিগুলির জন্য জ্বালানি সরবরাহ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনে ভারত ও রাশিয়ার পরমাণু চুক্তির প্রধান প্রকল্প ছয়টি ইউনিটের কুড়ানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (কেকেএনপিপি)। আর একটি অন্য প্রকল্পে আরও ছয়টি অতিরিক্ত চুল্লি নির্মাণের আলোচনা চলছে। কুড়ানকুলাম বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট চালু। পরবর্তী দুটি ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি এবং উপাদান সরবরাহের জন্য ২০২৪ সালে ভারত-রাশিয়ার মধ্যে ১০,৫০০ কোটি টাকার চুক্তি হয়েছে। পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের জন্য রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পারমাণবিক কর্পোরেশন রোসাটমের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে ভারত। ভারতের উপকূলে মোতায়েনের জন্য রাশিয়া ভারতকে তার ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (এফএনপিপি) প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। ক্ষুদ্র মডুলার চুল্লি (এসএমআর) পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পরিচ্ছন্ন শক্তি উত্পাদনে, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়ার সহযোগিতা অব্যাহত।

লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/truthofbengal/

ভারত-রাশিয়া সংযোগ

ইস্টার্ন মেরিটাইম করিডর (ইএমসি) বা চেন্নাই-ভ্লাদিভোস্টক সমুদ্র করিডর ভারতের চেন্নাই বন্দরকে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের ভ্লাদিভোস্টক বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করার একটি কার্যকরী সংযোগ প্রকল্প। এটি ভারতের ‘অ্যাক্ট ফার ইস্ট’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার লক্ষ্য রাশিয়ার সুদূর প্রাচ্য অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো। করিডরটি বঙ্গোপসাগরে ভারতের পূর্ব উপকূলের বন্দরগুলির সঙ্গে মালাক্কা প্রণালী, দক্ষিণ চিন সাগর ও জাপান সাগর মধ্যে দিয়ে রাশিয়ার যোগ করবে। করিডরটি প্রায় ৫,৬০০ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ১০,৩০০ কিলোমিটার) বিস্তৃত, যা মুম্বই এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ৮,৬৭৫ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ১৬,০৬৬ কিলোমিটার) এর চেয়ে অনেক ছোট পথ। রুটটি পণ্যসম্ভারের নিয়ে চল্লিশ দিনের জায়গায় প্রায় চব্বিশ দিনে ভারত থেকে রাশিয়া নিয়ে আসবে। ২০১৯ সালে ভ্লাদিভোস্টকে ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরামে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন এই সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেন। গত বছর নভেম্বরে কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল ঘোষণা করেছিলেন যে, করিডরটি চালু হয়ে গেছে এবং পণ্যবাহী পণ্যবাহী জাহাজগুলি ভারতীয় বন্দরে আসতে শুরু করেছে। আগামী দিনে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলিতে সম্ভাব্য মধ্যবর্তী স্টপ যুক্ত করার ভাবনা চিন্তা চলছে। (India-Russia Relations)

‘উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ করিডর’ আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ করিডর (আইএনএসটিসি)এর সঙ্গে শ্রীনগর-কন্যাকুমারীর সংযোগকারী ভারতের জাতীয় মহাসড়ক উন্নয়ন কর্মসূচির (এনএইচডিপি) সংযোগ। আইএনএসটিসি জাহাজ, রেল এবং সড়ক পথের সংমিশ্রণ ব্যবহার করে ভারতকে ইরান, মধ্য এশিয়া এবং রাশিয়ার মধ্য দিয়ে উত্তর ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত করে একটি মাল্টি-মোডাল নেটওয়ার্ক। পণ্য মুম্বই থেকে সমুদ্র পথে ইরানের চাবাহার বন্দর, তারপর স্থলপথে কাস্পিয়ান সাগরে এবং তারপর রাশিয়া ও ইউরোপে পরিবহণ করা হয়। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য সুয়েজ খাল যাত্রাপথের তুলনায় ট্রানজিটের সময় প্রায় ২০ দিন কমানো। এতে পরিবহণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্পটিতে তিন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য-ভারত, রাশিয়া এবং ইরান থেকে আজ তেরো সদস্য রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত।

ভারত-রাশিয়া বাণিজ্য

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল রেকর্ড ৬৮.৭ বিলিয়ন ডলার। রাশিয়ার সেবার ব্যাঙ্ক এই বাণিজ্য ৭০.৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আভাস দিয়েছে। তেলের দামে রাশিয়া বেশ ভাল ছাড় দেওয়ায় রাশিয়ার তেল আমদানি বাড়ে। অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম সবচেয়ে প্রভাবশালী আমদানি হলেও, রাশিয়া থেকে সার, খনিজ জ্বালানি, মূল্যবান পাথর এবং উদ্ভিজ্জ তেল আসে। তবে অন্যান্য মূল পণ্যগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাশিয়ায় ভারতের রফতানির পরিমাণ ছিল ৪.৮৮ বিলিয়ন ডলার। রফতানি বৈচিত্র্যময় হলেও মূল্যে কম এবং তা ওষুধপত্র, যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, রাসায়নিক, লোহা ও ইস্পাত এবং কৃষি পণ্য ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ। তেল আমদানি বৃদ্ধিতে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল প্রায় ৫৯ বিলিয়ন ডলার। এই ঘাটতি পূরণই এখন ভারতের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভারত-রাশিয়া ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে চায়, কিন্তু কীভাবে সেটা হবে বোঝা না গেলেও ভোগ্যপণ্য ও আইটি পরিষেবাসহ রাশিয়ায় রফতানি বাড়ানোর উপায় অনুসন্ধান করছে ভারত। ভারত-রাশিয়ার পর্যটন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর প্রচেষ্টাও আছে। ভারত ও রাশিয়া প্রধানত তাদের নিজস্ব জাতীয় মুদ্রা রুপি এবং রুবলে বাণিজ্য করে। ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ২০২২ সালে এই ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হয়, এখন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ স্থানীয় মুদ্রায় হয়।(India-Russia Relations)

ভারত-রাশিয়া কূটনীতি

রাশিয়া রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে (ইউএনএসসি) স্থায়ী আসনের জন্য ভারতকে সম্পূর্ণ সমর্থন করে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ মতো রুশ কর্মকর্তারা একাধিকবার ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ প্রতি তাঁদের পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন গত দশকে ১৭ বার বৈঠক করেছেন। ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নয়বার ভারত সফর করেছেন। ২০২৫ সালের শেষের দিকে বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে তাঁর আবার সফরে আসার কথা।

ইউক্রেনে রাশিয়ার কর্মকাণ্ডকে ভারত ক্ষমা বা নিন্দা কোনওটাই করেনি। ভারত সরকার যুদ্ধের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশে সোচ্চার হয়েছে এবং মোদি বলেছেন যে এখন ‘যুদ্ধের যুগ নয়’। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রুশ বিমান হামলায় বিধ্বস্ত একটি শিশু হাসপাতালে বোমা হামলার জন্যও তিনি দুঃখপ্রকাশ করেছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ইউক্রেন সফরের সময় মোদি বলেছিলেন যে, ভারতের অবস্থান নিরপেক্ষ নয়, তবে শান্তির পক্ষে। ইউক্রেন আগ্রাসনে রাশিয়াকে নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত ছিল ভারত। ভারতের জি-২০ প্রেসিডেন্সির অধীনে শেষ হওয়া জি-২০ নেতাদের ঘোষণাপত্রে ইউক্রেনে রাশিয়ার কর্মকাণ্ডের কোনও উল্লেখ ছিল না।

সোভিয়েত সময় কালে রাশিয়া যে ভাবে পাশে ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনে সেটা কোনওভাবেই ব্যাঘাত পায়নি। ট্রাম্পের চোখরাঙানি অনেকটাই উপেক্ষা করতে পারে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীরে নিয়ে গিয়ে। সাড়ে চোদ্দ কোটি মানুষের দেশ রাশিয়া, অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আছে। মার্কিন দেশের হারানো বাজার কিছুটা পাওয়া যাবে রাশিয়া আর তার বন্ধু দেশগুলিতে। এর সঙ্গে যদি চিনকে সঙ্গে নেওয়া যায় ট্রাম্পই তটস্থ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলার ব্যবহার কমলেই আমেরিকার পতন শুরু।