William Carey: বাংলা ভাষা চর্চার অগ্রদূত উইলিয়াম কেরি
উনবিংশ শতকে ভারতবর্ষে নবজাগরণের যে কর্মযজ্ঞ বাংলার মাটিতে শুরু হয়েছিল তার একজন নিষ্ঠাবান পথপ্রদর্শক ছিলেন উইলিয়াম কেরি
রাজু পারাল: আজ আমরা যারা বাংলা গদ্য পড়ি, লিখি, চর্চা করি, বাংলা ভাষা নিয়ে গর্ববোধ করি– তারা সকলেই সেই মানুষটির কর্মকাণ্ডের কাছে ঋণী। বাংলা ভাষার উন্নতির জন্য তাঁর পরিশ্রম ছিল অতুলনীয়। দীর্ঘ একচল্লিশ বছর তিনি ওই কাজে নিযুক্ত ছিলেন এবং তাঁরই উদ্যোগে ও উৎসাহে দেশীয় পণ্ডিতরা বাংলা গদ্যের প্রাথমিক রূপদান করেছিলেন। জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে ভারতে এসে যে মানুষটি এদেশের সাহিত্য, শিক্ষা, সমাজ-সংস্কার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটালেন, এদেশের মাটিকে স্বর্গতুল্য মনে করে দেহ রাখলেন অথচ ভারতবাসীর কাছে যোগ্য প্রতিদান তিনি পেলেন না। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, শিক্ষিত মানুষের দলে উইলিয়াম কেরির নাম জানা লোকের সংখ্যা লজ্জাজনক ভাবে কম। কে ছিলেন এই উইলিয়াম কেরি? এককথায় তাঁর পরিচয় দেওয়া খুব কঠিন। বরং বলা ভালো কী ছিলেন না তিনি। একজন মিশনারি হয়েও ছিলেন বাংলা গদ্যের পৃষ্ঠপোষক, বাংলা পাঠ্য পুস্তকের প্রবর্তক, যাজক, অনুবাদক, সমাজ-সংস্কারক এবং নৃতত্ববিদ। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তিনি শ্রীরামপুর কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা (William Carey)।
উনবিংশ শতকে ভারতবর্ষে নবজাগরণের যে কর্মযজ্ঞ বাংলার মাটিতে শুরু হয়েছিল তার একজন নিষ্ঠাবান পথপ্রদর্শক ছিলেন উইলিয়াম কেরি অর্থনৈতিক সমস্যা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মানুষের অসহযোগিতা সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে বাংলার সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমৃত্যু সংগ্রাম করে অক্ষয় কীর্তি স্থাপন করে গেছেন এই নিষ্ঠাবান কর্মযোগী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জন্মের একশো বছর আগে উইলিয়াম কেরি জন্ম নিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের এক অখ্যাত গ্রামে। মা এলিজাবেথ ও পিতা এডমন্ড কেরির পাঁচ সন্তানের মধ্যে উইলিয়াম কেরি ছিলেন বড়। তাঁর পিতা ও পূর্বপুরুষরা ছিলেন দরিদ্র। অসচ্ছল পরিবারের সন্তান হওয়ায় কেরির প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ সেভাবে ঘটেনি। পিতা এডমন্ড কেরি প্রথমদিকে তাঁত বুনে পরিবারের অন্ন সংস্থান করলেও ওই বৃত্তি ত্যাগ করেন। পরে তিনি স্থানীয় অবৈতনিক এক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষক পিতার সাহচর্যে বালক কেরি অসাধারণ জ্ঞানপিপাসু হয়ে ওঠেন (William Carey)।
আরও পড়ুনঃ Asansol: তৃণমূল বিধায়কের নাবালক নাতির হাতে রাইফেল! ভাইরাল সেই ছবি
এইসময়টায় ইতিহাস, ভূগোল অর্থাৎ বিশ্বের নানা দেশের বিবরণ, ভ্রমণ কাহিনি বিশেষ করে কলম্বাসের জীবন ও ভ্রমণ বৃত্তান্ত বিষয়ে জানার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন কেরি। একই সঙ্গে গ্রিক, হিব্রু, ডা , ইতালিয়ান ও ফরাসি ভাষা শিক্ষা চর্চাও করতে থাকেন। কিছুদিন জুতো তৈরি ও মেরামতের কাজও করেন তিনি। ওই কাজ করতে করতেই ধর্মগ্রন্থের প্রতি তিনি ক্রমাগত আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। সেই টানেই ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে পাকাপাকিভাবে’ ‘পাদরি’ রূপে প্রতিষ্ঠিত হন। কেরির পিতামহ ও পিতা যেহেতু একসময় চার্চের যাজক ও পাদ্রি ছিলেন। তাই চার্চের সঙ্গে কেরির সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ছেলেবেলা থেকেই।১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে জন টমাস নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে উইলিয়াম কেরি ভারতে আসেন ব্যাপটিস্ট মিশনের উদ্যোগে। উদ্দেশ্য খ্রিস্টধর্ম প্রচার করা। দূরদর্শী, নিষ্ঠাবান ও কর্মসাধক উইলিয়াম কেরি বুঝেছিলেন ভারতের সমাজ ও সংস্কৃতিকে না জানলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম প্রচার ফলপ্রসূ হবে না। তাই ভারতীয় সংস্কৃতির ধারক, ‘সংস্কৃত’ ও ‘বাংলাভাষা’ শিক্ষাতে তিনি বিশেষ মনোযোগী হয়ে ওঠেন (William Carey)।
সে সময়ে তাঁর বাংলা ভাষা শিক্ষা ও অনুবাদ কর্মের সহায়ক হয়েছিলেন রামরাম বসু। কেরির চরিতকথা থেকে জানা যায়, মালদার ময়নাবতীর নীলকুঠিতে অবস্থানকালের প্রথম দিকে কেরি বাইবেলের উপদেশ ও খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সে জন্যে তিনি আশপাশের জনপদ ও হাটে গঞ্জে গিয়ে জনসাধারণের মধ্যে খ্রিস্টধর্মের মাহাত্ম্য প্রচারের কাজ শুরুও করেছিলেন। কিন্তু ভাষাগত সমস্যা থাকায় সে কাজ ফলপ্রসূ হয়নি। সে কারণে তিনি ধর্ম প্রচারের কাজকে প্রাধান্য না দিয়ে ভাষা শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। দিন রাত ভাষা শিক্ষা, সংলাপ শিক্ষা, শব্দ সংকলন, অনুবাদ, ছাপাখানার প্রতিষ্ঠা নিয়েই বেশি সচেষ্ট ছিলেন। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলির উদ্যেগে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে উইলিয়াম কেরি ওই কলেজের বাংলা ও সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার শিক্ষক পদে নিযুক্ত হন। নিষ্ঠা ও উদ্যোগ থাকায় কয়েক বছরের মধ্যেই স্থায়ী অধ্যাপক ও অধ্যক্ষের পদও লাভ করেন কেরি। প্রায় এই সময় থেকেই বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশের জন্য স্বাধীন রচনার পাশাপাশি অনুবাদ কর্মেও আত্মনিয়োগ করেন কেরি। নিজের ব্যক্তিগত উদ্যম ও প্রচেষ্টায় ভারতের বিভিন্ন ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ ও দ্রুত সম্পাদন করেন কেরি (William Carey)।
প্রায় চল্লিশটি ভাষায় তিনি বাইবেলের অনুবাদ করিয়েছিলেন। শুধু বাংলা বাইবেলেরই আঠারোটি সংস্করণ করেছিলেন কেরি। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে ‘এ গ্র্যামার অফ বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ নামে বাংলা ভাষায় ব্যকরণ প্রকাশ করার কৃতিত্বও কেরির। পরের দিকে গ্রন্থটির দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চর্তুথ সংস্করণও প্রকাশিত হয়। এছাড়া কেরি তেলেগু এবং কন্নড় ভাষার ব্যাকরণও লিখেছিলেন। একজন মানুষের কতখানি উদ্যম ও কর্মশক্তি থাকলে এত কাজ করা সম্ভব তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। ১৮১৮ সালে জোশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ডের সঙ্গে শ্রীরামপুরের গঙ্গার ধারে এক সুন্দর পরিবেশে ইউরোপীয় ধাঁচে শ্রীরামপুর কলেজের প্রতিষ্ঠা করেন কেরি। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের পর এই কলেজটি দেশের দ্বিতীয় প্রাচীন কলেজ এবং পরবর্তীকালে এশিয়ার প্রথম থিওলজির (ধর্মতত্ত্ব ) বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গণ্য করা হল তখন থেকেই। তৎকালীন সংস্কৃত প্রভাবিত ভারতে সম্ভবত এটিই প্রথম প্রচেষ্টা যেখানে ছাত্ররা মাতৃভাষার মাধ্যমে বিশেষত বাংলা ভাষায় উচ্চতর শিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়েছিল। জাতি, ধর্ম, সম্প্রদায়, দেশ নির্বিশেষে সকলেই এই কলেজে পড়ার অধিকার পেয়েছিল। কলেজ শুরুর প্রারম্ভেই অধ্যক্ষ ছিলেন উইলিয়াম কেরি স্বয়ং (William Carey)।
Truth of Bengal fb page: https://www.facebook.com/share/193NB43TzC/
পরে কলেজের প্রথম বাঙালি অধ্যক্ষ হন মন্মথনাথ বিশ্বাস। দেশীয় পণ্ডিতদের পাশাপাশি শিক্ষকতার দায়িত্বে ছিলেন কেরি, মার্শম্যান, ওয়ার্ড, জন ক্লার্ক, ফেলিক্স কেরি প্রমুখ। তথ্যে মেলে, প্রথমে মাত্র ৩৭ জন ছাত্র নিয়ে শ্রীরামপুর কলেজ শুরু হয়। কুসংস্কারাছন্ন ভারতকে মুক্ত করতে এবং বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ঘটাতে সেই সময়ে কেরি কলেজে অনেক অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির আমদানি করেন। এ থেকে বোঝা যায় শ্রীরামপুর কলেজ সেই সময়েই কত উচ্চ স্থানে পৌঁছে গিয়েছিল। গাছপালা ও বৃক্ষলতা সম্পর্কেও উইলিয়াম কেরির কৌতূহল ছিল বাল্যকাল থেকেই। কাকা পিটার কেরি তাঁকে গাছপালা, কীটপতঙ্গের এই নেশা ধরান। কেরি যেখানে যখন গেছেন সেখানে যাই গাছ থাকুক না কেন, সেই গাছের বিশেষত্ব সন্পর্কে বিশদ খোঁজখবর রাখতেন। নোট বুকে লিখে রাখতেন। উদ্ভিদ বিজ্ঞান চর্চা ছিল তাঁর অন্তরের আজন্ম লালিত বাসনা। এই বাসনা থেকেই তিনি শ্রীরামপুরে পাঁচ একর নিজস্ব জমির উপর তৈরি করেছিলেন একটা ছোটখাটো বোটানিক গার্ডেন, অনেকটা শিবপুরের উদ্যানের মতো। যে উদ্যানে তিনি রোপন করেছিলেন ৪২৭টি প্রজাতির ঔষধিগাছ সহ অন্যান্য উদ্ভিদ। বিচিত্র প্রজাতির ঘাস থেকে শুরু করে মেহগনিসহ কয়েক হাজার বৃক্ষের উপস্থিতি ছিল দেখবার মতো। ভারতে আসার কিছুদিন পরে কেরি বিলেতে বন্ধু ও পরিচিতদের লিখেছিলেন, তিনি হিন্দুদের দেবতার মূর্তি ও অন্যান্য সামগ্রী পাঠাচ্ছেন ব্রিটিশ মিউজিমের জন্য, তাঁরা যেন তাঁকে কিছু টিউলিপ, ডেকোডিলস, লিলি ইত্যাদি ফুলের বীজ ও চারাগাছ পাঠায় (William Carey)।
তিনি পরম আগ্রহে একথাও লেখেন, নিতান্ত আগাছা কিংবা কাঁটাযুক্ত ফুলের গাছের বীজ পাঠালেও সাদরে গ্রহণ করবেন, তবে সেগুলো একেবারে খাঁটি বিলিতি হওয়া চাই। আসলে স্বদেশ ত্যাগ করার পর থেকে দেশজ গাছপালা, ফুল-ফল ইত্যাদি দেখার জন্য মনপ্রাণ ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল তাঁর। শ্রীমতী আমহার্স্ট তাঁর এই আগ্রহকে নিছক পাগলামি বলে উপহাস করলেও একজন উদ্ভিদ-বিশারদ হিসেবে সেসময়ে কেরি অনেক উদ্ভিদ গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন একথা স্বীকার না করে উপায় নেই। তবে কেরি নিজের উদ্যান নিয়েই কেবল মেতে থাকতেন না। সমান তালে শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের সুপারিনটেনডেন্ট রক্সবার্গ এবং তাঁর উত্তরসূরি ওয়ালিচকেও সহযোগিতা করতেন কেরি উদ্যানের উন্নয়নের জন্য। শোনা যায়, ভারতে এগ্রি-হর্টিকালচার সোসাইটি সম্বন্ধে কেরিই প্রথম ভাবনা চিন্তা করেন। সেইমত ১৮২০ সালে কেরি ও মার্শম্যান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘এগ্রিকালচার অ্যান্ড হর্টিকালচার সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া’, যার অস্তিত্ব আজও টিকে আছে।বহুমুখী কর্মণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, বাংলার নবজাগরণের অন্যতম অগ্রদূত, বাংলা ও বাঙালির জন্য সমর্পিত মনপ্রাণ, অসাধারণ এই মানুষটিকে বঙ্গবাসী কুর্নিশ জানাবে চিরকাল ধরে (William Carey)।






