রাজ্যের খবর

শান্ত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর জনপদ কোলাঘাট, রয়েছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বহু নিদর্শন

কলকাতা থেকে ৬০ কিমি দূরে শান্ত এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর একটি জনপদ 'কোলাঘাট'।

রাজু পারাল (বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক): কোনও একটি বিশেষ স্থানের নামের সঙ্গে সেই অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সম্পর্ক থাকে। পূর্ব মেদিনীপুরের ‘কোলাঘাট’ তার বাতিক্রম নয়। কোলাঘাটের আদি পর্বে দেখা যায় স্থানটি পূর্বে অরণ্যে ঢাকা ছিল এবং হাড়ি, ডোম, দুলে, বাগদি, মুচি প্রভৃতি আদি জনগোষ্ঠির বসবাস ছিল।

কলকাতা থেকে ৬০ কিমি দূরে শান্ত এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর একটি জনপদ ‘কোলাঘাট’। ক্রমে ক্রমে হিন্দু, মুসলমান, জৈন, মাড়োয়ারি প্রভৃতি জনগোষ্ঠির মহামিলনে বর্তমান কোলাঘাট জমজমাট। রূপনারায়ণের সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করতে হলে পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাটে আসতে হবে সকলকেই। শহর জীবনের এক ঘেঁয়েমি কাটাতে ‘কোলাঘাটে’ ঘুরে নেওয়া যেতে পারে।

কোলাঘাটের প্রসঙ্গ উঠলেই মনে পড়ে যায় রূপনারায়ণ নদীর কথা। যা অতি প্রাচীন। ঐতিহ্যগতভাবে ইলিশ মাছের জন্য বিখ্যাত এই নদী। এক সময় বর্ষায় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ত এই ‘রুপোলি ফসল’। স্বাদে-গন্ধে রূপনারায়ণের ইলিশের কথা আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে দূষণ, নদীতে পলি জমা এবং অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে মাছের সংখ্যা বহুলাংশে কমে গেছে। চাহিদা থাকলেও আজ ইলিশের যোগান একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। ফলে মৎস্যজীবীরাও আজ বিপাকের মুখে।

কথায় কথায় এসে পড়ে রূপনারায়ণ নদীর উপর রূপনারায়ণ সেতুর প্রসঙ্গ । যা ‘ শরৎ সেতু ‘ নামে সুপরিচিত। সেতুটি অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের চট্টোপাধ্যায়ের নামে উৎস্বর্গ করে নির্মিত। ১৯৬২ সালে তৎকালীন পশ্চিম বঙ্গ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ডা: বিধানচন্দ্র রায় অনেক বাধা বিপত্তি অগ্রাহ্য করে কলকাতা-বোম্বে রোডের সঙ্গে রূপনারায়ণ নদীর ওপর সংযোগকারি সড়ক সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

কোলাঘাট স্থানটিকে আজ ‘ফুলের হাট’ নামে অভিহিত করলেও অত্যুক্তি হয় না। কারণ পশ্চিমবঙ্গের ফুলের বাজারের পঁচাত্তর ভাগই কোলাঘাট স্টেশন থেকে চালান হয়। রাশি রাশি গোলাপ, জুঁই, গাঁদা, অপরাজিতা, টগর, পদ্ম, ডালিয়া, সূর্যমুখী, বেল, রজনী এবং মরশুমি ফুল কোলাঘাট থেকে রেলস্টেশন হয়ে হাওড়ার জগন্নাথ ঘাট, কলকাতার বিভিন্ন বাজারে এবং পশ্চিমবঙ্গের বাইরে পাড়ি দিচ্ছে।

রূপনারায়ণ নদীতে যখন রেল সেতু নির্মিত হয়নি কলকাতা অর্থাৎ আমাদের রাজধানীতে তখন যাবার একমাত্র পথ ছিল কোলাঘাট। মেদিনীপুর জেলায় সে সময় তাম্রলিপ্ত বন্দর ও কোলাঘাট বন্দর চালু থাকায় বড় বড় জাহাজ চলাচল করত। কথিত আছে, কোলাঘাট বন্দর দিয়েই শ্রী চৈতন্যদেব নাকি পুরীর জগন্নাথ দেব দর্শনে নীলাচলে যান। পরে রূপনারায়ণ নদীর উপর দুটি সেতু (একটি সড়ক যোগাযোগ এবং আর একটি রেলওয়ে যোগাযোগ) চালু হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এল।

প্রাচীন জনপদ কোলাঘাটে এলে দেখতে পাওয়া যায় একটি জৈন মন্দির। যা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনকালে, একশো বছরেরও অনেক আগে নির্মিত হয়েছিল। এই জৈন মন্দিরটি বাংলার অনন্য স্থাপত্য শৈলীর একটি অত্যাশ্চর্য রত্ন। মন্দিরটি ভগবান মহাবীরকে উৎস্বর্গ করা হয়েছিল।

কোলাঘাট স্টেশন থেকে উত্তর দিকে যাত্রা করলে মেদিনীপুর জেলার বহু প্রাচীন গ্রাম গোপালনগরে পৌঁছনো যায়। এই গোপালনগরে দর্শন করা যাবে শিবমন্দির। এই মন্দিরে সন্ধান পাওয়া যায় একটি বিষ্ণু মূর্তির। যা অতি বিরল পাথর কেটে নির্মিত। এছাড়াও পাঁশকুড়া থানার অন্তর্গত বিভিন্ন গ্রামে একাধিক মন্দির দেখতে পাওয়া যায়, যার মধ্যে-দেউলি (শিব মন্দির), কুমার হাট (শিব মন্দির), কাশীগড়ি (শীতলা মন্দির), রাধাবললভচক (খরগেশ্বর জীউ মন্দির) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রাচীন গৌরব ও ঐতিহ্যে কোলাঘাট আজও স্মরণীয় জনপথ।

Related Articles